দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের ছবিসংবলিত বিলবোর্ড ঘিরে বিতর্ক, সরানোর দাবিতে অবস্থান

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের ছবি সম্বলিত বিলবোর্ড সরানোর দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি। রোববার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনের সামনেছবি : প্রথম আলো

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিতদের ছবিসংবলিত একটি বিলবোর্ড টাঙানোকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। গত শুক্রবার ‘নভোকালচার’ নামের একটি সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম থেকে ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ নামে বিলবোর্ডটি টাঙানো হয়। প্ল্যাটফর্মটির পরিচালক হিসেবে আছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আম্মার।

এদিকে প্যারিস রোড থেকে বিলবোর্ডটি অপসারণের দাবিতে আজ রোববার বিকেলে প্রশাসন ভবনের সামনে অবস্থান নিয়েছেন একদল শিক্ষার্থী। রাত পৌনে আটটা পর্যন্ত তাঁরা সেখানে ছিলেন। পরে তাঁরা প্রক্টর কার্যালয়ে যান।  

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, জুলাই গণ–অভ্যুত্থান স্মরণে গত ৩১ জুলাই থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত ‘জুলাই চিরন্তন’ নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার মুক্তমঞ্চে বিভিন্ন পোস্টার প্রদর্শন করা হয়। একই সময়ে নভোকালচারের উদ্যোগে প্যারিস রোডে বেশ কয়েকটি বিলবোর্ড টানানো হয়। সেখানেই আলোচিত ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ বা বিচারিক হত্যার শিকার নামে একটি বিলবোর্ড আছে৷

ওই বিলবোর্ডে থাকা ছবির মধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সাবেক সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ছাড়া বাকি সবাই জামায়াতে ইসলামীর নেতা। তাঁরা হলেন—জামায়াতের সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামী, নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর ছবি প্রদর্শন করা হয়েছে। এ ছাড়া শেখ মুজিবুর রহমান হত্যায় জড়িত মেজর (অব.) বজলুল হুদার ছবি রাখা আছে। ছবির নিচে লেখা হয়েছে, ‘জেলখানায় ফাঁসির নামে বজলুল হুদাকে হাসিনা নিজে জবাই করে।’ এ ছাড়া বিচার চলাকালে সাক্ষী সুখরঞ্জন বালীর নিখোঁজ হওয়া ও বিচারপতি মানিক মিয়ার ছবি আছে।

‘বিচারিক হত্যার’ শিকার হিসেবে উপস্থাপন করায় পোস্টারটি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের রায়কে ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ হিসেবে উপস্থাপনের মাধ্যমে কী বার্তা দেওয়া হচ্ছে।

আপন রায় নামের এক শিক্ষার্থী ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘প্রমাণিত ইতিহাসের বিরুদ্ধে কিছু প্রতিষ্ঠা করতে গেলে অবশ্যই প্রমাণ দ্বারাই সেটা করতে হবে। ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ শব্দটি আপত্তিকর। যতক্ষণ না আপনারা আইন-সাক্ষী-বিচার দ্বারা প্রমাণ করতে পারছেন ওনারা যুদ্ধাপরাধী বা রাজাকার ছিলেন না। স্পষ্টত এটা বাংলাদেশের আইনানুসারে অপরাধ। ২৪ ঘটেছে বলেই যদি মনে করেন, ‘আপনারা সবকিছুর বৈধতা পেয়ে গেছেন, তাহলে নিশ্চিত থাকুন, বোকার স্বর্গেই আছেন।’

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি মেহেদী হাসান বলেন, ‘১৯৭১ সালে আল-বদর ও রাজাকার বাহিনীর চিহ্নিত সদস্যদের আমরা ঘৃণাভরে স্মরণ করি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রতিষ্ঠানে যুদ্ধাপরাধের মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তিদের ছবি প্রদর্শন বা তাদের ঘিরে বিতর্কিত ন্যারেটিভ তৈরি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের ছবি সম্বলিত বিলবোর্ড টাঙানো হয়েছে। আজ রোববার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোডে
ছবি : প্রথম আলো
একদল শিক্ষার্থী বিলবোর্ডটি সরানোর দাবি করেছেন। আবার আরেক দল শিক্ষার্থী বিলবোর্ডটি লাগানোর পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। যার যার যুক্তি তার তার কাছে থাকুক। যেসব বিষয় নিয়ে মনোমালিন্য তৈরি হয়, আমরা সেসব বিষয় থেকে বিরত থাকতে চাই।
অধ্যাপক মাহবুবর, প্রক্টর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে

এদিকে বিলবোর্ড সরাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির কাছে দাবি জানিয়েছেন  বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী। তাঁরা প্রশাসন ভবনের ফটকে অবস্থান নিয়েছেন৷ তাঁদের একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল। তিনি বলেন, ‘প্রক্টরিয়াল বডি ছবি সরানো নিয়ে কোনো নিশ্চয়তা প্রদান করতে পারেনি। প্রক্টর স্যার দুই ঘণ্টা সময় চেয়েছেন। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি এই ২ ঘণ্টা প্রশাসনিক ভবনের সামনেই অবস্থান কর্মসূচি পালন করব। রাজাকাদের চিহ্ন ক্যাম্পাস থেকে নিশ্চিত তবেই ঘরে ফিরব।’

বিলবোর্ড টানানোর বিষয়ে নভোকালচারের পরিচালক ও রাকসু জিএস সালাউদ্দিন আম্মারের মুঠোফোনে কল করা হলে অপর পাশ থেকে ফোন রিসিভ করে আম্মার মিটিংয়ে ব্যস্ত আছেন বলে জানান। তবে এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘ওই নেতাদের মধ্যে কাউকে নিয়ে বিতর্ক বা প্রশ্ন থাকতেই পারে। বিলবোর্ডের মূল বিষয় ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ অর্থাৎ রাজনৈতিক প্রভাবে পরিচালিত বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের প্রশ্নটি তুলে ধরা হয়েছে। শুধু ছবি দেখে পুরো বিষয়টি বিচার করলে উদ্দেশ্য বোঝা যাবে না। শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম, খুন, আয়নাঘর, শাপলা হত্যাকাণ্ড এবং বিচারব্যবস্থা নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, সেই সব প্রেক্ষাপটেই বিলবোর্ডগুলো তৈরি করা হয়েছে।’

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘একদল শিক্ষার্থী বিলবোর্ডটি সরানোর দাবি করেছেন। আবার আরেক দল শিক্ষার্থী বিলবোর্ডটি লাগানোর পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। যার যার যুক্তি তার তার কাছে থাকুক। যেসব বিষয় নিয়ে মনোমালিন্য তৈরি হয়, আমরা সেসব বিষয় থেকে বিরত থাকতে চাই। বিলবোর্ডটি সরিয়ে নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। দেখা যাক, কী হয়।’