সেন্ট মার্টিনে রাতের অন্ধকারে কেয়াবন ধ্বংস করছে কারা
সেন্ট মার্টিনের বিভিন্ন সৈকতে রাতের আঁধারে কেয়াবনে আগুন দিয়ে গাছ ধ্বংস করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সমুদ্রের দৃশ্য উন্মুক্ত করে হোটেল-রিসোর্টের ব্যবসা বাড়াতেই প্রভাবশালী চক্র এ কাজ করছে। এতে বালিয়াড়ি ক্ষয়, জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি ও জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়ছে। নতুন করে কেয়াবন সৃজন করা হলেও ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ হচ্ছে না।
সরু ইটের রাস্তা, তার অপর পাশে সমুদ্রসৈকত। দুইয়ের মাঝে দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে আছে দীর্ঘ শিকড় ছড়ানো কেয়াগাছের সারি। প্রাকৃতিক এই দেয়াল ধরে হাঁটতে হাঁটতে এক জায়গায় থমকে দাঁড়াতে হয়। একসঙ্গে বেশ কিছু কেয়াগাছ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সেদিক দিয়ে উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে সৈকত। বড়সড় জানালার মতো তৈরি হওয়া সেই স্থান দিয়ে দেখা যাচ্ছে সাগরের নীল জলরাশি।
৮ আগস্ট কক্সবাজারের টেকনাফের সেন্ট মার্টিন দ্বীপের পূর্বপাড়ার সৈকতে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা গেল। কেবল পূর্বপাড়ায় নয়, গলাচিপা, দক্ষিণপাড়া, কোনারপাড়া ও উত্তরপাড়ায় গিয়েও কেয়াবন ধ্বংসের এমন দৃশ্য দেখা গেছে। বড় ঢেউ কিংবা ঝোড়ো বাতাসের কবল থেকে সৈকতের বেলাভূমিকে আগলে রাখা কেয়াবন ধ্বংসের এই চিত্র এমন এক সময় চোখে পড়ল, যখন সরকার প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে দ্বীপের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের অংশ হিসেবে সৈকতের উন্মুক্ত স্থানে নতুন কেয়াবন সৃজনও হচ্ছে। অথচ এর পাশাপাশি চলছে এমন ধ্বংসযজ্ঞ।
সরকারি তথ্য বাতায়নে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেন্ট মার্টিন দ্বীপের আয়তন ১৩ বর্গকিলোমিটার। তবে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার হিসাবে এর প্রকৃত আয়তন ৯ বর্গকিলোমিটারের কাছাকাছি। অবশ্য জোয়ার–ভাটায় এর হেরফের হয় কিছুটা। স্থানভেদে আধা কিলোমিটার থেকে দেড় কিলোমিটার এর প্রস্থ। দ্বীপের চারপাশ এবং ভেতরের অনেক অংশজুড়েই একসময় কেয়াবন ছিল। তবে পর্যটনের জন্য হোটেল–মোটেল গড়ে ওঠায় কেয়াবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জানা গেছে, বর্তমানে কেয়াবন ধ্বংসের সঙ্গেও একটি প্রভাবশালী চক্র জড়িত। হোটেল–মোটেল থেকে সাগরের দৃশ্য পর্যটকদের দেখার সুযোগ করে দিতেই কেয়াবনে আগুন দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
৮ ও ৯ আগস্ট দ্বীপের সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্ট ঘুরে কেয়াবন ধ্বংসের চিত্র পাওয়া গেছে। পরিবেশবিশেষজ্ঞ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার প্রতিনিধিদের ভাষ্য, সেন্ট মার্টিনের কেয়াবন দ্বীপের প্রাকৃতিক রক্ষাদেয়াল। গত এক দশকে এই প্রাকৃতিক দেয়াল অনেক ছোট হয়ে গেছে। অথচ উপকারী এই কেয়াবনের শিকড় সৈকতের বালুকে শক্তভাবে ধরে রাখে। বন ধ্বংস হওয়ায় বালিয়াড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আগে প্রাকৃতিক বনের বাধা পেরিয়ে ঢেউ উপকূলে পৌঁছাত না। এখন জোয়ারের পানি সরাসরি বসতবাড়িতে আঘাত হানছে। কেয়াবন অসংখ্য পাখি, গিরগিটি ও সামুদ্রিক প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থ ছিল।
একদিকে কোটি টাকার প্রকল্প, অন্যদিকে ধ্বংস
দ্বীপের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ‘সেন্ট মার্টিন দ্বীপের জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজন প্রকল্প’ নামে ৮ কোটি ৯০ লাখ ২৫ হাজার টাকার একটি প্রকল্পের কাজ চলছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের আওতায় দ্বীপে কেয়াবনের আকার বাড়াতে নতুন করে চারা রোপণ করা হচ্ছে। চলতি মৌসুমে সৈকততীর ও বালিয়াড়িতে আড়াই হাজার কেয়া চারা রোপণ করা হয়েছে এবং আরও তিন হাজার চারা রোপণের কাজ চলছে।
প্রকল্পের পরিচালক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা কামরুল হাসান বলেন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে বালিয়াড়িকে রক্ষা করার একমাত্র প্রাকৃতিক ঢাল হলো কেয়াবন। এর শিকড় মাটির গভীরে ছড়িয়ে বালুকে শক্তভাবে আটকে রাখে। অতীতে হোটেল-রিসোর্ট নির্মাণের কারণে কেয়াবন বিলুপ্ত হলেও সরকার এখন বিলুপ্ত ও বিরান ভূমিতে নতুন করে কেয়াবন সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছে।
দ্বীপের পূর্ব সৈকতের গলাচিপা এলাকায় একসময় ২০-২৫ ফুট উঁচু কয়েক কিলোমিটার কেয়াবন ছিল। ৯ আগস্ট সেখানে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় এক কিলোমিটার কেয়াবন নেই এবং পাশের আধা কিলোমিটার বনের অন্তত ৩০০ কেয়াগাছ আগুন দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে, সেখানে কঙ্কালসার শতাধিক গাছ দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, রাতে কয়েকজন লোক কেয়াবনে আগুন দেয়, যার ফলে মুহূর্তেই শত শত গাছ পুড়ে যায়। দ্বীপের দক্ষিণপাড়া, দিয়ারমাথা, পশ্চিমপাড়া সৈকত ও কোনারপাড়ায় একই চিত্র দেখা গেছে।
অন্যদিকে দ্বীপের পূর্ব সৈকতের গলাচিপা এলাকায় একসময় ২০-২৫ ফুট উঁচু কয়েক কিলোমিটার কেয়াবন ছিল। ৯ আগস্ট সেখানে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় এক কিলোমিটার কেয়াবন নেই এবং পাশের আধা কিলোমিটার বনের অন্তত ৩০০ কেয়াগাছ আগুন দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে, সেখানে কঙ্কালসার শতাধিক গাছ দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, রাতে কয়েকজন লোক কেয়াবনে আগুন দেয়, যার ফলে মুহূর্তেই শত শত গাছ পুড়ে যায়। দ্বীপের দক্ষিণপাড়া, দিয়ারমাথা, পশ্চিমপাড়া সৈকত ও কোনারপাড়ায় একই চিত্র দেখা গেছে।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৫ জানুয়ারি প্রথম আলোতে ‘সেন্ট মার্টিনে উজাড় হচ্ছে কেয়াবন, জেনেও চুপ প্রশাসন’ শিরোনামে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। এরপর কেয়াবন পুড়িয়ে ধ্বংস ও কেয়াগাছ নিধনে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। পরিবেশ অধিদপ্তর কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করলেও কেয়াবন পুড়িয়ে ধ্বংসের ঘটনা বন্ধ হয়নি। সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের (ভারপ্রাপ্ত) চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, পূর্ব সৈকতসহ বিভিন্ন স্থানে হোটেল-রিসোর্ট বা গেস্টহাউস থেকে সরাসরি সমুদ্র দেখার সুযোগ তৈরি করতেই রাতের আঁধারে কেয়াবনগুলো পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। কেয়াবন রক্ষার দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরের।
সেন্ট মার্টিন দ্বীপে অবস্থিত একমাত্র পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল্লাহ আল নোমান এ বিষয়ে পুলিশের তেমন করার কিছু নেই বলে জানান। তিনি বলেন, কেয়াবনে আগুন ও গাছ কাটার ঘটনা ঘটলেও পুলিশের করার কিছু থাকে না। পরিবেশ অধিদপ্তর মামলা করলে পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, জনবলসংকট এবং বঙ্গোপসাগর উত্তাল থাকায় অনেক সময় কর্মকর্তাদের পক্ষে সেন্ট মার্টিনে যাওয়া কঠিন হয়। তবে কেয়াগাছ কর্তন ও সৈকত দখলের অভিযোগে ইতিমধ্যে ১৪টি রিসোর্টের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে এবং কেফায়েত উল্লাহ নামের এক রিসোর্টমালিকের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে। আগামী ১ নভেম্বর পর্যটন মৌসুম শুরু হলে ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুনে পুড়িয়ে কেয়াবন ধ্বংসকারী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে।
আইন আছে, প্রয়োগ নেই
১৯৯৯ সালে সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ (ইসিএ) ঘোষণা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। সর্বশেষ ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে সেন্ট মার্টিনসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের ১ হাজার ৭৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা হয়।
ইসিএ আইন অনুযায়ী, সেন্ট মার্টিনে মাটির পরিবর্তন, যেকোনো ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ, কেয়াবন ধ্বংস, গাছ ও ফল কাটা, প্রবাল-পাথর উত্তোলন এবং পরিবেশদূষণকারী বর্জ্য ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আইন অমান্য করলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
তবে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে পর্যটক যাতায়াত সীমিত করায় এবং নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাস দৈনিক দুই হাজার পর্যটক নির্ধারণ করলেও পর্যটন মৌসুমের বাইরের ৯ মাস দ্বীপটি ফাঁকা থাকার সুযোগ নেন প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। গত আড়াই বছরের মধ্যে দ্বীপের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে ৮০টির বেশি অবৈধ রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁ। পরিবেশ অধিদপ্তরের চোখ ফাঁকি দিয়ে এসব রিসোর্টের বেশির ভাগই পাকা কাঠামোতে তৈরি করা হয়েছে।
সেন্ট মার্টিনের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান নুর আহমদ বলেন, কেয়াবন ধ্বংস হওয়ায় সৈকতের বালিয়াড়ি ধসে পড়ছে এবং নারকেলগাছগুলো গোড়ার মাটি সরে উপড়ে পড়ছে। জোয়ারের পানি সরাসরি বসতবাড়িতে আঘাত হানছে। দ্বীপের উত্তরাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের ৮ কিলোমিটার কেয়াবনের কিছু অংশ নিধন হচ্ছে। বাইরের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা প্রথমে জমি কিনে গাছ পুড়িয়ে বা কেটে সেখানে পাকা অবকাঠামো তুলছেন। অথচ নিয়মানুযায়ী দ্বীপে পাকা স্থাপনা তৈরির সামগ্রী আনারই কথা নয়।
সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান বলেন, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে এই কেয়াবন দ্বীপের মানুষ ও প্রকৃতিকে রক্ষা করত। পুরো দ্বীপে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রায় ছয় হাজার নারকেলগাছ এখন অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে, যা এক দশক আগেও ছিল দ্বিগুণ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকার সেন্ট মার্টিনে পর্যটকের যাতায়াত সীমিত করে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাস প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক দ্বীপ ভ্রমণে যেতে পারছেন। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে রাতযাপনের সুযোগ থাকলেও নভেম্বরে দিনে গিয়ে দিনে ফিরে আসতে হয়। গত দুই মৌসুমে ২ লাখ ৩৭ হাজার পর্যটক সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ করেছেন, যা তিন বছর আগের তুলনায় অর্ধেকের কম। তাতে পরিবেশের কিছুটা উন্নতি ঘটলেও কেয়াবন রক্ষা করা যাচ্ছে না।
৮ আগস্ট পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম সেন্ট মার্টিন দ্বীপ সফরের সময় কেয়াবন পুড়িয়ে ধ্বংস ও অবৈধভাবে হোটেল–রিসোর্ট নির্মাণের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এসব বিষয়ে কঠোর হতে তিনি পরিবেশ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেন।