ডেঙ্গু নিয়েই পরীক্ষায় বসেছিল সাবরিন, পেয়েছে জিপিএ–৫
এসএসসি পরীক্ষার দুই দিন আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় সাবরিন সুলতানা মিথি। মেয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান মা–বাবা। শেষ পর্যন্ত জ্বর নিয়ে পরীক্ষা দিয়েই জিপিএ-৫ পেয়েছে সাবরিন। আজ শুক্রবার মাদারীপুরে শিখো–প্রথম আলো জিপিএ–৫ কৃতী শিক্ষার্থী সংবর্ধনায় সেই কঠিন সময়ের অভিজ্ঞতার কথা জানাল সে।
মেয়েকে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে নিয়ে এসেছিলেন বাবা গোলাম রসুল। সাবরিন বলল, ‘এই ফলের পেছনে সবচেয়ে বড় প্রেরণা আমার বাবা। ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে পরীক্ষা দিতে পারব কি না, তা নিয়ে চিন্তা ছিল। মা–বাবা দুজনই আমাকে সাহস দিয়েছেন।’
প্রথম আলোর আয়োজনে ও শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত হচ্ছে জিপিএ–৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনা। ‘স্বপ্ন দেখো জীবন গড়ো’ স্লোগান নিয়ে সারা দেশে ২০২৬ সালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ–৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের ৬৪ জেলায় এ সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে।
আয়োজনটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ এবং সহযোগিতায় থাকছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা–গ্রি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও প্রথম আলো বন্ধুসভা।
সংবর্ধনার মাদারীপুর পর্ব আয়োজন করা হয় সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তন প্রাঙ্গণ। সকাল সাড়ে আটটা বাজার আগেই সাবরিনের মতো কৃতী শিক্ষার্থীদের পদচারণে মুখর হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল। তাদের হইহুল্লোড়ে তৈরি হয় উৎসবের আমেজ। ছোট ছোট দলে চলে আড্ডা। স্কুলজীবনের কাছের বন্ধু ও সহপাঠীদের দেখে কেউ কেউ জড়িয়ে ধরছিল। কেউ আবার মুঠোফোনে সেলফি তুলে ধরে রাখছিল স্মৃতি।
চতুর্থ শ্রেণি থেকে একসঙ্গে পড়াশোনা করে আসা দুই বান্ধবী উম্মে হানি ও মিমি রহমান সেলফি তুলছিল। এ সময় মিমি রহমান বলে, ‘আমার দুই বান্ধবী ক্লাস ফোর থেকে একসঙ্গে আছি। এখনো কলেজে একসঙ্গেই। আবার একই সঙ্গে সংবর্ধনা নিতে পারছি। বিষয়টা খুব আনন্দের।’
মেয়েকে নিয়ে ৪০ কিলোমিটার দূরের শিবচর থেকে সংবর্ধনা নিতে আসেন রেজাউল করিম। তিনি বলেন, ‘প্রথম আলোর এই সংবর্ধনার আয়োজনের কথা আগেই জানতাম। ইচ্ছে ছিল মেয়েকে নিয়ে এমন একটি অনুষ্ঠানে আসতে পারি। সেই ইচ্ছে আজ পূরণ হয়েছে। খুব সকাল সকাল বাড়ি থেকে বের হয়েছি, যেন মিস না হয়।’
সকাল সোয়া ১০টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। জেলা বন্ধুসভার পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক কামরুল হাসানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর মাদারীপুর প্রতিনিধি অজয় কুন্ডু।
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের সহযোগী অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, ‘এটা তোমাদের জীবনের প্রথম বড় সাফল্য। তবে এই সাফল্য ধরে রাখতে হলে তোমাদের আরও বেশি পরিশ্রম করতে হবে। আগামীর বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে তোমরাই। নিজেদের সেভাবে যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তোলো।’
অনুষ্ঠানে কৃতী শিক্ষার্থীদের মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থকে ‘না’ বলতে শপথ পড়ান মস্তফাপুর বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ নবাবজান। এ সময় তিনি বলেন, ‘তোমরা নিঃসন্দেহে অনেক মেধাবী। তবে একজন মেধাবী মানুষ হওয়ার চেয়ে সৎ মানুষ হওয়াটা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তোমাদের আগামী গড়ে উঠুক মেধা ও সততার মিশেলে।’
ডনোভান সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক বিকাশ চন্দ্র রায় শিক্ষার্থীদের ডাক্তার, প্রকৌশলী বা কোনো বিশেষ পেশার প্রতি আলাদা নজর না দিয়ে গুণগত শিক্ষার দিকে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, যে পেশাতেই যাওয়া হোক না কেন, সেই পেশায় সফল হলে মা–বাবা ও দেশের মুখ উজ্জ্বল করা সম্ভব।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রথম আলোর খুলনার নিজস্ব প্রতিবেদক উত্তম মণ্ডল বলেন, জীবনের নতুন একটি অধ্যায়ে পা রাখার এই সময়ে বন্ধু নির্বাচনে সচেতন থাকতে হবে। সত্যিকারের বন্ধু তাদের স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলবে, এগিয়ে যাওয়ার সাহস দেবে এবং কঠিন সময়ে পাশে থাকবে। অন্যদিকে ভুল সঙ্গ মনোবল দুর্বল করে দিতে পারে, লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারে এবং স্বপ্নকে ধূসর করে দিতে পারে।
অভিভাবকদের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন আলমগীর হোসেন। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘মা, মাটি, মানুষকে ভালোবাসতে হবে। সোনার দেশ গড়তে হবে। তোমাদের সেরা অভিভাবক তোমাদের শিক্ষক। তোমরা শিক্ষকদের শ্রদ্ধা ও সম্মান করবে।’
এরপর কুইজ বিজয়ী ১০ জন কৃতী শিক্ষার্থীর হাতে পুরস্কার তুলে দেন অতিথিরা।
কৃতী শিক্ষার্থী উজ্জয়িনী মজুমদার ও নূর ফাতেমার গান অনুষ্ঠানে অন্য রকম আবহ তৈরি করে। এ ছাড়া কানিজ ফাতিমা দিয়া, জানাত আশু মিম, অর্পা ইসলাম, জয়িতা ও তুবা দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে। স্বাপ্নিক নৃত্য বিকাশের শিক্ষার্থীরাও নৃত্য পরিবেশন করে। সংগীত পরিবেশন করেন পৃথি মণ্ডল, সাইফ, কাজী মাহাবুব ও শান্ত কুমার।
মাদারীপুর বন্ধুসভার সভাপতি আঞ্জুমান জুলিয়া ও সাধারণ সম্পাদক এইচ এম হাবিবুর রহমানের ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে এই মিলনমেলা শেষ হয়।