‘একে তো পানিয়ে মারিয়া গেল, অখন মারের বৃষ্টিয়ে’
নৌকায় করে আনা বোরো ধানের আঁটি মাথায় করে নিয়ে সড়কের পাশে স্তূপ করে রাখছিলেন কৃষক রাসেল মিয়া। ভেজা শরীরে ঠক ঠক করে কাঁপছিলেন। হাওরের কইয়েরকোনা বিলের কাছে আড়াই বিঘা জমিতে বোরোর আবাদ করেছিলেন তিনি। শনিবার বিকেলে হাকালুকি হাওরপাড়ের জুড়ী-দাসেরবাজার সড়কের কালনীগড় এলাকায় আলাপকালে রাসেল মিয়া বলেন, ‘পানির নিচ থাকি এই ধান কাটিয়া আনছি। এক কিয়ারোর বেশি জমিন অখনো রইছে। বৃষ্টি থামের না। কামলাও পাইয়ার না। কিতা করতাম। ইটার আশাই ছাড়ি দিছি।’
রাসেলের সঙ্গে কথা বলার একপর্যায়ে জাহাঙ্গীর আলম নামের এক বর্গাচাষি এক রকম জোর করেই তাঁর বাড়িতে নিয়ে গেলেন। বসতঘরের কয়েকটি বস্তায় ধান ভরে রাখা। একটি বস্তা থেকে কিছু ধান হাতে নিয়ে দেখিয়ে জাহাঙ্গীর বললেন, ‘অউ দেখউক্কা, ধানে গেরা আইছে (অঙ্কুরিত হয়ে পড়েছে)। সপ্তাহ দিন ধরি রইদ (রোদ) নাই। ধান শুকানির উপায় নাই। একে তো পানিয়ে মারিয়া গেল, অখন মারের (ক্ষতি করে) বৃষ্টিয়ে।’ তিনি জানান, হাওরে তাঁর পাঁচ বিঘা জমির মধ্যে দুই বিঘার ধান কেটে আনা সম্ভব হয়েছে। বাকিটা পানির নিচে।
মৌলভীবাজারের জুড়ী ও কুলাউড়া উপজেলায় হাকালুকি হাওরপারের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের প্রায় একই দশা। তাঁদের ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে কয়েক দফা ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দুটি উপজেলায় হাওর ও নিচু জমিতে পানি বেড়ে অনেক জমির ফসল তলিয়ে গেছে। বৃষ্টি ও ঢলের আগে কম্বাইন হারভেস্টার যন্ত্র ও শ্রমিকদের দিয়ে কিছু জমির ধান কাটা হয়েছিল। পরে বৃষ্টিতে জমিতে পানি ঢোকায় যন্ত্রে কাটানো কঠিন হয়ে পড়ে। বজ্রপাতের ভয়ে অনেক শ্রমিক কাজেও বের হননি। এতে শ্রমিকসংকট দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কৃষকদের অনেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়েই ফসল রক্ষায় নেমেছেন।
জুড়ীর কালনীগড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রের নিচে পাকার মেঝেতে ধান ছড়িয়ে রাখছিলেন স্থানীয় খাকটেকা গ্রামের বর্গাচাষি বাবুলাল দাস। তিনি বলেন, ১০ বিঘা জমিতে বোরোর আবাদ করেন। সব ধান আগেই কাটান। বিঘাপ্রতি ১২ থেকে ১৪ মণ ধান পাওয়া গেছে। কিন্তু বাড়ির উঠান, রাস্তা বৃষ্টিতে ভেজা। বাতাসে যাতে ধান কিছুটা শুকায়, সে জন্য এখানে কিছু ছড়িয়ে দিয়েছেন।
বেলাগাঁও, সোনাপুর ও দেবের বন এলাকায় ৪০ থেকে ৫০ জন শ্রমিক পানির নিচ থেকে ধান কেটে নৌকায় তুলছিলেন। কেউ কেউ আগে ধান কেটে আঁটি বেঁধে পানিতে ভাসিয়ে রাখেন। সেগুলোও নৌকায় তোলা হচ্ছিল। বেলাগাঁও গ্রামের বাসিন্দা নূরুল ইসলাম বললেন, ‘এইবার ভালা ফসল হইছিল। মানুষে ফসল ঘরো তোলার সময় পাইছে না। অত লম্বা বৃষ্টি হইব, কেউ ভাবছে না।’
রোববার সকালে জুড়ী উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম খান বলেন, উপজেলার ৬ হাজার ১৭০ হেক্টর জমিতে এবার বোরো ধানের আবাদ হয়। হাকালুকি হাওরের কয়েকটি এলাকার ফসল ডুবে গেছে। কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর থেকে এখানকার ক্ষতিগ্রস্ত ২ হাজার ২৫০ জন কৃষককে সহায়তা দেওয়া হবে। তালিকা তৈরির কাজ চলছে। তবে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে, তা চূড়ান্ত হয়নি।
কুলাউড়ায় এবার ৮ হাজার ৭২০ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়। এর মধ্যে ৩৮০ হেক্টরের ধান তলিয়ে গেছে বলে জানান উপজেলাটির কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন। সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত ২ হাজার ৮০০ জন কৃষককে সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে। সেই তালিকা তৈরি হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলীদ মুঠোফোনে বলেন, বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় হাওর এলাকায় পানি বাড়ছে।