পানিতে ডুবে সাত মাসে প্রাণ গেল ৭২ শিশুর

জেলার ৯ উপজেলায় পানিতে ডোবার ১৯৩টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় মারা গেছে ৭২ শিশু।

পানিতে ডুবে মৃত্যুপ্রতীকী ছবি

নোয়াখালী জেলা আদালতের আইনজীবী আবদুর রহিম। দুই মেয়ের পর তাঁর সংসারে জন্ম হয়েছিল এক ছেলের। এ কারণে আনন্দের কোনো কমতি ছিল না তাঁদের। তবে সেই ছেলের প্রাণ গেল পানিতে ডুবে। গত শুক্রবার বাড়ির পুকুরেই এ ঘটনা ঘটে।

আবদুর রহিম নোয়াখালী সদর উপজেলার নেয়াজপুর ইউনিয়নের দেবীপুর গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর আড়াই বছর বয়সী ছেলে ইলহাম নূর ফালাক যখন পুকুরে ডুবে যায়, তখন তাঁর স্ত্রী রান্নার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। আর তিনি ছিলেন জুমার নামাজে।

আবদুর রহিম জানান, মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট শিশুটি মায়ের নজরের বাইরে ছিল। এর মধ্যে সে বাড়ির পুকুরঘাটের দিকে যায়। পরে তাকে খুঁজতে গিয়ে পুকুরঘাটে জুতা দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা। এরপর পুকুরে তল্লাশি চালিয়ে অচেতন অবস্থায় ইলহামকে উদ্ধার করা হয়। সেখান থেকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

অবশ্য শুধু শিশু ইলহাম নয়। উপকূলীয় জেলা নোয়াখালীতে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জেলার ৯ উপজেলায় পানিতে ডোবার ১৯৩টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় মারা গেছে ৭২ শিশু। তবে আগস্ট ও সেপ্টেম্ববের তথ্য গতকাল শনিবার পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এ তথ্য পাওয়া গেলে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়বে। মৃত্যুর ঘটনা সবচেয়ে বেশি উপকূলীয় উপজেলা হাতিয়ায়। সেখানে ৫৬টি পানিতে ডোবার ঘটনায় মারা গেছে ৪৩ শিশু। এ ছাড়া কোম্পানীগঞ্জে ৩৮টি ঘটনায় ১৪ শিশু, কবিরহাটে ২৩টি ঘটনায় ১১ শিশু ও সেনবাগে ৩৭টি ঘটনায় ৪ শিশু মারা গেছে। অন্যদিকে চাটখিলে ৩১টি, বেগমগঞ্জে ১৮টি, সুবর্ণচরে ৮টি ও সোনাইমুড়ীতে ১টি পানিতে ডোবার ঘটনা রেকর্ড হলেও এসব উপজেলায় কোনো প্রাণহানি ঘটেনি।

যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

জেলা সিভিল সার্জন মো. আনোয়ার হোসেন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে বরাবরই সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হয়। কিন্তু এটি স্বাস্থ্য বিভাগের একা বিষয় নয়, এটা যুব উন্নয়নসহ আমাদের স্থানীয় সরকার ও জেলা প্রশাসনের একটি যৌথ কাজ।’

মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, শিশুর বাবা যখন কর্মক্ষেত্রে চলে যায়, অনেক মা তখন নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন। দেখা যায়, শিশুরা হাঁটাহাঁটি করতে গিয়ে পানিতে ডুবে যাচ্ছে। ওই সময়ে যদি ডে-কেয়ার সেন্টার কিংবা নির্ভরযোগ্য কারও কাছে রাখা যায়, তাহলে শিশুমৃত্যু কমে আসবে।

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহনাজ আক্তার বলেন, নদী ও জলাশয়বেষ্টিত নোয়াখালী অঞ্চলে প্রতিটি বসতবাড়ির সামনে উন্মুক্ত পুকুর থাকায় শিশুমৃত্যুর মাত্রা বেশি। এ নীরব মহামারি প্রতিরোধে অভিভাবকদের সচেতন করার পাশাপাশি শিশুদের দ্রুত সাঁতার শেখানো আবশ্যক।