বাগেরহাটের চিতলমারীতে দুই পক্ষের সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর থেকে ওই এলাকার পরিস্থিতি থমথমে। আবার পাল্টাপাল্টি হামলার আশঙ্কায় মচন্দপুর গ্রামের বাড়িঘর থেকে মালামাল ও গবাদিপশু সরিয়ে নিচ্ছেন বাসিন্দারা। অনেকে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্ত শেখ পরিবারের বাড়িতে নেই অধিকাংশ পুরুষ। অন্যদিকে প্রায় পুরুষশূন্য বিশ্বাস বংশের পরিবারগুলো।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে চিতলমারীতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় চিংগড়ী গ্রামের রাজিব শেখ (২৫) নিহত হন। আহত হন আরও অন্তত ২৫ জন। ৪০টি বসতঘর ও দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২৫টি বাড়ি আগুনে পুড়ে গেছে। পরে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনায় একজনকে আটক করেছে পুলিশ। আটক সৌরভ বিশ্বাস (১৮) মচন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা।
চিতলমারী-নালুয়া-পাটগাতী সড়কের পূর্ব পাশে চিংগড়ী আর পশ্চিম পাশের মচন্দপুর গ্রাম। আজ শুক্রবার সকালেও সেখানে সড়কের ওপর দেখা যায়, ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে সংঘর্ষের সময়কার ইটের টুকরা। আশপাশ থেকে দল বেঁধে মানুষ আসছেন। দাঁড়াতেই নাকে ভেসে আসে পোড়া গন্ধ। চিংগড়ী গ্রামে ঢুকতেই দেখা যায় পোড়া বাড়িঘর। টিন ও কাঠের ঘরগুলোর পাশাপাশি গোয়ালঘরে পুড়ে গেছে গবাদিপশু, ছাই হয়ে গেছে ঘরের মালপত্র। কোথাও রান্না করা খাবার পুড়ে গেছে, কোনো ঘরের চাল পুড়ে গেছে। পুড়ে যাওয়া বসতঘরগুলো শেখ বংশের লোকদের। বসতঘর ছাড়াও রান্নাঘর ও খড়ের গাদাসহ সবকিছু পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আগুন দেওয়া হয়েছে দুটি দোতলা ও চারটি একতলা বাড়িতেও। শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন বাসিন্দারা। একবেলা খাবারের ব্যবস্থা নেই বেশির ভাগ ঘরে।
‘সব নিয়ে গেছে লুট করে’
হামলায় নিহত রাজিব শেখের বাড়ির পেছনে সবার জন্য একসঙ্গে খাবার রান্না হচ্ছে। আর শেখ পরিবারের বেশির ভাগ সদস্য পুড়ে যাওয়া ঘরের সামনে অসহায় বসে আছেন। তাঁদের অভিযোগ, বিশ্বাস বংশের লোকজন হামলা করে তাঁদের প্রতিটি বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। পরে সব বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়।
সকালে পুড়ে যাওয়া বাড়ির উঠানে বসে কাঁদছিলেন মানিক শেখের স্ত্রী সুফিয়া বেগম। তিনি বলেন, ‘আমরা যে এখন কী খাব, কোহানে থাকব, কিচ্ছু নাই। কাইলকে রোজা ছিল, এট্টু পানিও খাতি পারিনি আমরা। সব নিয়ে গেছে লুট করে।’
শেখ বংশের মো. তরিকুল ও রিয়াদুল ইসলাম বলেন, বৃহস্পতিবার বিকেলে আরিফ শেখ নামে তাঁদের এক ভাইয়ের ছেলে মোটরসাইকেলে যাচ্ছিলেন। সে সময় বিশ্বাস পরিবারের লোকজন তাঁকে ফুলকুচি (লোহার তৈরি একধরনের মাছ ধরার অস্ত্র) দিয়ে আঘাত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁর গায়ে আঘাত লাগেনি। পরে তিনি চিৎকার দিলে শেখ বংশের লোকজন সেখানে আসেন। দুপক্ষের মধ্যে এ নিয়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল ছোড়া শুরু হয়। এর মধ্যে সন্ধ্যা হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। পুলিশ শেখদের বাড়িতে ঢুকতে বলে। তাঁরা বাড়িতে ফিরতে শুরু করলে বিশ্বাস বংশের লোকজন দল বেঁধে এসে হামলা চালান। পরে পেট্রল ও পিচ (বিটুমিন) ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন।
শেখ বংশের মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী প্যারালাইজড (পক্ষাঘাতগ্রস্ত)। বিছানায় শোয়া। মারামারির ভয়ে ছোট ছেলেকে ঢাকায় পাঠিয়েছি, আর বড় ছেলে ভ্যান চালায়। ঋণ করে ছয় মাসের ধান কিনে রাখছিলাম ঘরে। তা–ও পুড়ে গেছে। কী খাব? মাথা গোঁজার কোনো জায়গায়ও থাকল না।’
আব্দুর গণি শেখের স্ত্রী জয়নব বেগম বলেন, ‘ঘর ঠিক করার জন্য ৫০ হাজার টাকা ঋণ করেছিলাম। তা নিয়ে গেছে। একটা ছাগল ও কয়েকটা হাঁস ছিল, তা–ও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কীভাবে বাঁচব জানি না।’
পুড়ে যাওয়া একটি দোতলা ভবনের মালিক ইদ্রিস শেখের ছেলে নুরু শেখ বলেন, ‘আমার দুই ভাই বিদেশে থাকে। অনেক কষ্ট করে দোতলা ঘর করছিলাম। গতকাল সব শেষ করে দিয়েছে। ঘরে যে মালামাল ছিল, সব লুটে নিয়ে গেছে। আমাদের ঘর থেকে স্বর্ণ ও মালামালসহ অন্তত দেড় কোটি টাকার মালামাল নিয়ে গেছে।’
‘ভয়ে আমরা সব মালামাল অন্যত্র পাঠাচ্ছি’
শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মচন্দপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, হামলার আশঙ্কায় বিশ্বাস বংশের লোকজন বাড়ি থেকে টিভি, ফ্রিজ, খাটসহ বিভিন্ন মূল্যবান মালামাল ভ্যান, নছিমন ও পিকআপে সরিয়ে নিচ্ছেন। নারীরা কাঁধে, কোমরে ও মাথায় করে সরাচ্ছেন মালপত্র। কেউ বাগানের পথ ধরে, আবার কেউ গ্রামের পেছনের মরা খাল পার হয়ে অন্য গ্রামে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে মালামাল সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। মূল রাস্তা দিয়ে সরাতে গিয়ে শেখ পরিবারের সদস্যদের বাধার মুখে পড়ে কয়েকটি ভ্যান ও একটি পিকআপ।
ফারুক বিশ্বাসের স্ত্রী রহিমা খানম বলেন, ‘আগেরবার আমাদের সবকিছু লুট করে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। তখন আমরা কিচ্ছু সরাতে পারিনি। এখন আবার হুমকি দিচ্ছে। আমার স্বামী বিদেশে থাকে। একটা বাচ্চা খাল পার করে পরানপুর গ্রামে রেখে আসছি।’
পান্না বিশ্বাসের স্ত্রী সালমা বেগম বলেন, ‘কয়েক বছর আগে আমার স্বামীকে মেরে পঙ্গু করে দিয়েছে শেখ পরিবারের লোকজন। তাদের ভয়ে আমরা সব মালামাল অন্যত্র পাঠাচ্ছি। আমাদের তো বাঁচতে হবে। ওরা হুমকি দিয়েছে, সবকিছু পুড়িয়ে দেবে।’
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের চিতলমারীর স্টেশন কর্মকর্তা আবদুল ওয়াদুদ বলেন, ‘বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে আমরা খবর পাই। দ্রুত ঘটনাস্থলে আসি। তবে বাধা দেওয়ায় আগুন নেভানোর কাজ শুরু করতে কিছুটা দেরি হয়। আনুমানিক ২০-২৫টি বসতঘর পুড়ে গেছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি, চারটি ইউনিট একযোগে প্রায় তিন ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নেভাতে সক্ষম হই।’
বাগেরহাটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) শামীম হোসেন বলেন, নিহত রাজিবের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ অপরাধীদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করেছে। সংঘাত এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।