মালিক তাঁরা, রাঁধুনিও তাঁরা, ঘরের খাবারেই জমেছে রেস্তোরাঁ
কম তেল-মসলায় রান্না করা ভাত-তরকারি। সঙ্গে ঘিয়ে ভাজা পাটিসাপটা, পাঁচমিশালি মাছের তরকারি, নানা রকম ভর্তা, পিঠা, শিঙাড়া আর সমুচা। আয়োজনটা একেবারেই ঘরোয়া। নিরিবিলি পরিবেশে আয়েশ করে খেয়ে তৃপ্তি নিয়ে ফিরছেন ভোজনরসিকেরা।
সিলেট নগরের তাঁতীপাড়া এলাকার ‘ফুড ক্লাব স্পাইসি রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড টেকঅ্যাওয়ে’ এখনো খুব পরিচিত হয়ে ওঠেনি। তবে এখানকার খাবারের স্বাদ ও মানের কথা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। বাড়ছে ক্রেতার সংখ্যাও।
রেস্তোরাঁটি চালু হয়েছে প্রায় শতবর্ষী দি এইডেড হাইস্কুলের পাশে ৪ নম্বর বাসায়। ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে চালু থাকা এই রেস্তোরাঁয় এখন ৩৫ ধরনের খাবার পাওয়া যায়। ভাত-তরকারির পাশাপাশি মুখরোচক নানা নাশতার আয়োজনও রয়েছে।
নিজেরাই মালিক, নিজেরাই কর্মী
সম্প্রতি এক সন্ধ্যায় রেস্তোরাঁয় গিয়ে দেখা গেল, ভেতরে কয়েকটি টেবিল-চেয়ার পাতা। চারপাশ বেশ নিরিবিলি। অন্য অনেক রেস্তোরাঁর মতো ভিড় নেই। কেউ ভাত-তরকারি খাচ্ছেন, কেউ খিচুড়ি, কেউবা নাশতা। দুজন তরুণ ঘিয়ে ভাজা পাটিসাপটা ও বিভিন্ন সবজি দিয়ে তৈরি শিঙাড়া খাচ্ছিলেন। কেউ আবার পান করছিলেন ভেষজ উপকরণে তৈরি সোলেমানি চা।
এই রেস্তোরাঁর বিশেষত্ব শুধু খাবারে নয়, পরিচালনাতেও। মালিক থেকে শুরু করে রান্না, বাজারসদাই ও খাবার পরিবেশন—সব কাজই করেন একটি পরিবারের সদস্যরা।
রেস্তোরাঁটির মূল দায়িত্বে আছেন রেহানা ইয়াসমীন (৫১)। তাঁর বড় ভাই খুরশেদুল আলম (৭০) রেস্তোরাঁ পরিচালনার কাজ তদারক করেন। রান্নাবান্নার দায়িত্বে আছেন রেহানার বোন সাবিনা ইয়াসমীন ও ভাবি নাজমা বেগম। বাজারসদাই থেকে খাবার পরিবেশন—সবই সামলান রেহানা।
রেহানা বলেন, ‘আমরাই মালিক, আমরাই কর্মচারী। এখানে ঘরের বাইরের কোনো কর্মী নেই। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও নিরিবিলি পরিবেশে ঘরোয়া আয়োজনের মতোই খাবার পরিবেশন করা হয়। ঘরে যেভাবে আমরা খাবার খাই, সেভাবেই এখানে রান্না করা হয়।’
ভাড়া দেওয়ার জায়গাতেই রেস্তোরাঁ
রেস্তোরাঁটি কীভাবে চালু হলো, সেই গল্পটিও বেশ অন্য রকম। রেহানা ইয়াসমীন, তাঁর ভাই খুরশেদুল আলম ও বোন সাবিনা ইয়াসমীন তাঁতীপাড়ার বাসিন্দা। তাঁদের বাসার সামনের অংশ একসময় দুই ব্যক্তি রেস্তোরাঁ করার জন্য ভাড়া নেন। শর্ত ছিল, রেহানা ও খুরশেদুল শেফদের কাছ থেকে রান্না শিখবেন এবং ব্যবসায় তাঁদেরও অংশীদারত্ব থাকবে। এ কারণে কম টাকায় জায়গাটি ভাড়া দিয়েছিলেন তাঁরা।
রেস্তোরাঁ চালুর প্রস্তুতি অনেকটা এগোলেও এক পর্যায়ে ভাড়া নেওয়া ব্যক্তিরা আর এগোননি। পরে বাসার সামনের ভাঙাচোরা অংশটিকে রেস্তোরাঁর উপযোগী করে রেহানা ও খুরশেদুল নিজেরাই ব্যবসা শুরু করার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু রেস্তোরাঁর রান্নাবান্নায় তাঁদের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। শেষ পর্যন্ত ঘরের রান্নার ওপর ভরসা করেই রেস্তোরাঁয় রান্না শুরু করেন তাঁরা। সেই ঘরোয়া স্বাদই ধীরে ধীরে তাঁদের পরিচিতি এনে দিয়েছে।
ঘরের খাবারের স্বাদে ফিরছেন ক্রেতারা
শহরের কালীবাড়ি এলাকার বাসিন্দা অর্পণ তালুকদার একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করেন। প্রায় এক বছর আগে রেস্তোরাঁটি তাঁর চোখে পড়ে। নিরিবিলি পরিবেশ দেখে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে সেখানে এসেছিলেন। খাবারের আয়োজন ও স্বাদ ভালো লাগায় তিনি বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রায়ই এখানে খেতে আসেন।
রেস্তোরাঁ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ জন এখানে খাবার খান। কোনো কোনো দিন এই সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে যায়। পাশের দি এইডেড হাইস্কুলে পরীক্ষা বা চাকরির পরীক্ষা থাকলে ক্রেতার সংখ্যা আরও বেড়ে যায়।
পাঁচমিশালি মাছ থেকে পাটিসাপটা
এখানে ভাতের সঙ্গে পাঁচমিশালি মাছ, করলাভাজি, নানা ধরনের ভর্তা, ডাল, মুরগি, গরুর মাংসসহ বিভিন্ন পদের খাবার পাওয়া যায়। আছে খিচুড়িও। নাশতায় রয়েছে রুটি-সবজি, পিঠা, শিঙাড়া ও সমুচা। চায়েরও আলাদা কদর তৈরি হয়েছে।
দেয়ালে টাঙানো ফেস্টুনে খাবারের দামও লেখা রয়েছে। বিফ খিচুড়ি ১৪০ টাকা, চিকেন খিচুড়ি ১২০ টাকা, ভুনা খিচুড়ি ও ডিম ফ্রাই ৮৫ টাকা। চালের রুটি ও গরুর মাংস ২২০ টাকা, চালের রুটি ও চিকেন ২০০ টাকা। ভাত, মাছ, সবজি ও ডালের দাম ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা। গরুর মাংস, ভাত, ডাল ও সবজি ২৪০ টাকা এবং গরুর কলিজা, ভাত, ডাল ও সবজি ৩৫০ টাকা।
নাশতার মধ্যে চালের রুটি ১৫ টাকা, ভাপা পিঠা ৩০ টাকা, পাটিসাপটা ৩০ টাকা, সমুচা ১৫ টাকা, শিঙাড়া ১০ টাকা ও নকশি পিঠা ৩০ টাকা। কফি ৮০ টাকা, দুধ চা ৩০ টাকা ও সোলেমানি চা ১৫ টাকা।
রেহানা ইয়াসমীনের ভাষায়, ব্যবসার শুরুতে বড় কোনো পরিকল্পনা ছিল না। নিজেরা রান্না করে মানুষকে খাওয়াবেন—এটুকুই ছিল ভাবনা। এখন সেই ঘরের রান্নার স্বাদই তাঁদের রেস্তোরাঁর পরিচয় হয়ে উঠছে।
শুক্রবার রেস্তোরাঁটি বন্ধ থাকে। বাকি ছয় দিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলে রান্না, খাবার পরিবেশন আর ভোজনরসিকদের আনাগোনা। মালিক, কর্মী ও রাঁধুনি—তিন ভূমিকাতেই পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের ঘরের রান্নার স্বাদেই ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠছে ছোট এই রেস্তোরাঁ।