দৃষ্টিনন্দন ঝিনুক আকৃতির টার্মিনালের কার্যক্রম শুরু, একসঙ্গে নামতে পারবেন ৫০০ যাত্রী

কক্সবাজার বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনাল চালু হয়েছে পরীক্ষামূলকভাবেছবি সংগৃহীত

বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশির ঠিক পাশেই বিশাল ঝিনুকের আকৃতির স্থাপনা। ভবনের ছাদেও সেই নকশারই প্রতিফলন। সাগরের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা কক্সবাজার বিমানবন্দরে আজ সোমবার চালু হয়েছে দেশের প্রথম ঝিনুক আকৃতির প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে কক্সবাজার বিমানবন্দরে ২৬৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা ব্যয়ে ঝিনুক টার্মিনাল নির্মাণ শুরু হয়। সম্প্রতি নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। এই টার্মিনাল দিয়ে একসঙ্গে ৫০০ যাত্রী দেশের বাইরে এবং ৫০০ জন যাত্রী আসতে পারবেন।

কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. ইউনুস ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, আজ থেকে নতুন টার্মিনালের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আগামী অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্বোধন করবেন। এখন তার প্রস্তুতি চলছে।

বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষেই কক্সবাজার বিমানবন্দরের অবস্থান। রানওয়ের দৈর্ঘ্য ১০ হাজার ৭০০ ফুট। এর মধ্যে ১ হাজার ৭০০ ফুট নির্মাণ করা হয়েছে সাগরবক্ষের ওপর। যে কারণে এটি আকর্ষণীয় রানওয়েতে পরিণত হয়েছে। অক্টোবরে সমুদ্রের জল ছুঁয়ে দিন–রাত ২৪ ঘণ্টা সুপরিসর বিমানের উড্ডয়ন-অবতরণ শুরু হলে পর্যটকদের ভ্রমণে ভিন্নমাত্রা যোগ হবে।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, ঝিনুক টার্মিনাল চালু করার মধ্য দিয়ে কক্সবাজার বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে ওঠার পথে এক ধাপ এগিয়ে গেল। আগামী অক্টোবর মাসের শেষ দিকে এই বিমানবন্দর দিয়ে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার প্রস্তুতি চলছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের পর কক্সবাজার বিমানবন্দর দেশের চতুর্থ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মর্যাদা লাভ করবে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলে একদিকে পর্যটন ও বাণিজ্য খাতে নতুন দিগন্তের সূচনা ঘটবে, অন্যদিকে ‘কক্সবাজার’ হয়ে উঠবে আন্তর্জাতিক ট্রানজিট ও ফুয়েলিং হাব। কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কক্সবাজার বড় সুবিধার জায়গা।

আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলে বিদেশি পর্যটকদের জন্য কক্সবাজার ভ্রমণ অনেক সহজ ও আকর্ষণীয় হবে। বর্তমানে বিদেশি পর্যটকদের ঢাকা বা চট্টগ্রামে নেমে তারপর কক্সবাজার যেতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ এবং অতিরিক্ত খরচও বাড়ায়। সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলে এই বাধা দূর হবে। এর ফলে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে, তাতে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও স্থানীয় হস্তশিল্প ব্যবসায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। পর্যটন খাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতির ভিত্তি আরও মজবুত হবে।

নতুন টার্মিনালে একসঙ্গে ৫০০ যাত্রী বিদেশে যেতে পারবেন এবং ৫০০ যাত্রী দেশে আসতে পারবেন
ছবি: সংগৃহীত

নতুন ব্যবস্থাপনায় খুশি যাত্রীরা

সকালে ঢাকা থেকে কক্সবাজার বিমানবন্দরে অবতরণ করে ইউএস বাংলার একটি উড়োজাহাজ। রানওয়ে থেকে নতুন টার্মিনাল দিয়ে বেরিয়ে এসে বিমানের যাত্রী রাজধানীর ফতুল্লার ব্যবসায়ী ইলিয়াছ মাতাব্বর বলেন, মেঘ আর সমুদ্রের মিতালিতে ঘেরা এই রানওয়েতে যখন বিমান অবতরণ করছিল, তখন মনে হলো বিমানটি সমুদ্রের বুকেই নামছে। দূর থেকে তিনতলা ভবনের টার্মিনালটি ঝিনুকের মতো দেখা যায়। প্রকৌশলবিদ্যা আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সংমিশ্রণে তৈরি এই টার্মিনাল কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পকে আরেক ধাপ এগিয়ে নেবে।

কক্সবাজার বিমানবন্দরের পরিচালক মো. গোলাম মোর্তজা হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, আজ সকাল সাতটা থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ঝিনুক টার্মিনালের কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত চারটি বিমান পরিবহনের (বাংলাদেশ বিমান, ইউএস বাংলা, এয়ারস্ট্রা ও নভোএয়ার) ৫০টি ফ্লাইট ঢাকা-কক্সবাজার রুটে আসা–যাওয়া করেছে। গতকাল ছিল ৫৪টি ফ্লাইট। প্রাথমিকভাবে সেবা দেওয়া হচ্ছে অভ্যন্তরীণ রুটের যাত্রীদের। নতুন টার্মিনালের আধুনিক ব্যবস্থাপনায় সন্তুষ্ট পর্যটক ও যাত্রীরা।

দুপুরে নতুন টার্মিনালে গিয়ে দেখা গেছে, যাত্রীরা লাইনে দাঁড়িয়ে বিমানে ওঠার কার্যক্রম সম্পন্ন করছেন। কেউ মুঠোফোনে ছবি তুলছেন, কেউ চেয়ারে বসে আড্ডা জমিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক বহির্গমনের জন্য চারটি এবং আগমনে ছয়টি ইমিগ্রেশন কাউন্টার রাখা হয়েছে। লাগেজ পরিবহনে রয়েছে দুটি বেল্ট। সঙ্গে পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেম, ফ্লাইট ইনফরমেশন ডিসপ্লে, সিসিটিভি ও ভারী হ্যান্ডব্যাগ স্ক্যানিংয়ের সুবিধা রয়েছে।

যাত্রীদের স্বচ্ছন্দ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে রাখা হয়েছে আধুনিক নানা ব্যবস্থা। রয়েছে লিফট, এস্কেলেটর ও চেক-ইন কাউন্টার। আগমন ও বহির্গমনের জন্য রয়েছে আলাদা ইমিগ্রেশন কাউন্টার ও লাউঞ্জ।

ঢাকার বাসিন্দা কামরুল ইসলাম বলেন, ‘তিন দিনের ভ্রমণে বৃহস্পতিবার ট্রেনে কক্সবাজার এসেছিলাম। আজ ফিরছি বিমানে। নতুন টার্মিনাল দেখে ভালো লাগছে। দেখতেও অনেকে সুন্দর-আকর্ষণীয়। বিমানবন্দরে চেক-ইন, নিরাপত্তাতল্লাশি, ইমিগ্রেশন, বোর্ডিংসহ নানা ধরনের কার্যক্রম ঠিকমতো চলছে।’