ভৈরবে ৬৮ বছরেও সিদ্ধান্ত হয়নি, বর্জ্য কোথায় ফেলা হবে
প্রতিদিন ভৈরব শহরের ৩০ টন বর্জ্য প্রধান সড়কের পাশসহ কয়েকটি উন্মুক্ত স্থানে ফেলতে হচ্ছে।
কিশোরগঞ্জের ভৈরব পৌরসভা প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ৬৮ বছর আগে। এই সময়ে কাঁচা সড়ক পাকা হয়েছে, সরু রাস্তা হয়েছে প্রশস্ত, গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন, বেড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনসংখ্যা। তবে নাগরিক সেবার অন্যতম মৌলিক অবকাঠামো বর্জ্য ফেলার জন্য একটি স্থায়ী বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র (ডাম্পিং স্টেশন) এখনো নির্মিত হয়নি।
শহরের দুই লাখের বেশি মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাত্রা থেকে উৎপন্ন প্রায় ৩০ টন বর্জ্য প্রধান সড়কের পাশসহ কয়েকটি উন্মুক্ত স্থানে ফেলতে হচ্ছে। বছরের পর বছর সেখানে বর্জ্যের স্তূপ জমে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। পথচারী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিদিন সেই দুর্গন্ধের মধ্য দিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে। পরিবেশদূষণের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ।
ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা কিশোর কুমার ধর প্রথম আলোকে বলেন, এ ধরনের উন্মুক্ত বর্জ্যের স্তূপে নানা ধরনের রোগজীবাণু থাকে। মাছি, মশা, কুকুরসহ বিভিন্ন প্রাণী এসব বর্জ্যের সংস্পর্শে আসে। অনেক সময় গবাদিপশুকেও এসব ভাগাড় থেকে খাদ্য সংগ্রহ করতে দেখা যায়। মাছি ও মশার মাধ্যমে জীবাণু আশপাশের বসতবাড়ি ও খাবারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েডসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
একদিকে সবাই পরিচ্ছন্ন শহর চান, অন্যদিকে নিজের এলাকার কাছে ডাম্পিং স্টেশনও চান না। এই মানসিকতা পরিবর্তন না হলে স্থায়ী সমাধান কঠিন হবে।
পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, কয়েক বছর আগে উপজেলার কালিকাপ্রসাদ এলাকায় প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়া যায়। কিন্তু স্থান নির্ধারণের পর স্থানীয় লোকজনের তীব্র বিরোধিতার মুখে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা যায়নি। পরে আরও কয়েকটি সম্ভাব্য স্থান বিবেচনায় আনা হলেও প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্থানীয় লোকজনের প্রতিরোধের মুখে উদ্যোগ থেমে যায়।
ভৈরব পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফারুক দুঃখ করে বলেন, একদিকে সবাই পরিচ্ছন্ন শহর চান, অন্যদিকে নিজের এলাকার কাছে ডাম্পিং স্টেশনও চান না। এই মানসিকতা পরিবর্তন না হলে স্থায়ী সমাধান কঠিন হবে।
বর্তমানে শহরের স্টেশন সড়ক, রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান শহর রক্ষা বাঁধ সড়ক, গাছতলাঘাট সেতু ও চণ্ডীবের-কালিপুর সেতুসহ অন্তত চারটি স্থানে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এর বাইরে আরও কয়েকটি স্থানে বর্জ্য ফেলা হয়।
ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণের বিষয়ে আমাদের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই। ইচ্ছা আছে, চেষ্টা আছে এবং বাস্তবায়নের প্রস্তুতিও আছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো উপযুক্ত জায়গা পাওয়া।
গত শনিবার সকালে স্টেশন সড়ক এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সরকারি খাসজমির একটি বড় পুকুর প্রায় পুরোপুরি আবর্জনায় ভরাট হয়ে গেছে। পচা বর্জ্যের স্তূপে খাবারের খোঁজে ঘুরছে কুকুর, চারদিকে মাছি-মশার উপদ্রব। দুর্গন্ধ এতটাই তীব্র যে আশপাশে তেমন কোনো দোকানপাট গড়ে ওঠেনি। সেখানে পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ভ্যানে করে বর্জ্য এনে ফেলছিলেন।
পরিচ্ছন্নতাকর্মী রাকিব খান বলেন, ‘আর কোথাও ফেলার জায়গা নেই। এই কারণে এখানেই ফেলি। কিন্তু লোকজন বকা দেয়, অনেক সময় মারতে আসে। তাই আমরা ভোরবেলায় এসে দ্রুত বর্জ্য ফেলে চলে যাই।’
শহরের সবচেয়ে বড় এই উন্মুক্ত ভাগাড়ের পাশেই আছে দ্য নর্থ সাউথ স্কুল অ্যান্ড প্রাইমারি এডুকেশন নামে একটি বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘দুর্গন্ধ ঠেকাতে স্কুলের চারপাশে বেড়া দিয়েছি। কিন্তু বেড়া দিয়ে তো আর দুর্গন্ধ আটকানো যায় না। এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে পৌর প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। মানববন্ধনও করেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমাধান হয়নি।’
বর্তমানে শহরের স্টেশন সড়ক, রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান শহর রক্ষা বাঁধ সড়ক, গাছতলাঘাট সেতু ও চণ্ডীবের-কালিপুর সেতুসহ অন্তত চারটি স্থানে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে।
সম্প্রতি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ডাম্পিং স্টেশনবিহীন পৌরসভাগুলোকে সরকারি খাসজমি ইজারা দিয়ে ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণে সহযোগিতা করতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দিয়েছে। সেই নির্দেশনার আলোকে ভৈরবেও বিকল্প জমির খোঁজ চলছে বলে জানিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ।
পৌর প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম মামুনুর রশিদ বলেন, ‘ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণের বিষয়ে আমাদের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই। ইচ্ছা আছে, চেষ্টা আছে এবং বাস্তবায়নের প্রস্তুতিও আছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো উপযুক্ত জায়গা পাওয়া। পাওয়া গেলে আবার সেখান থেকেই স্থানীয়ভাবে আপত্তি আসছে। এত বড় সমস্যা সমাধানে নাগরিকদের সহযোগিতা না পাওয়া গেলে হয়তো নগরের বর্জ্য সড়কের কাঁধেই থাকবে।’