টেকনাফের ‘সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক’ আলোর মুখ দেখছে না যে কারণে
টেকনাফের সাবরাং ট্যুরিজম পার্কের জন্য ২০১৬ সালে ৯৬৭ একর জমি বরাদ্দ হলেও ১০ বছরেও প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। সাগরভাঙন, অবকাঠামো সংকট ও ধীরগতির কাজ উন্নয়নে বাধা হয়ে আছে। একইভাবে নিরাপত্তার কারণে সীমান্তবর্তী নাফ ট্যুরিজম পার্কের নির্মাণকাজও দুই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে।
বিশ্বের দীর্ঘতম কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত দেখতে প্রতিবছর ৭০ থেকে ৮০ লাখ পর্যটক ছুটে আসেন। কিন্তু বিদেশি পর্যটক থাকেন হাতে গোনা। দেশি-বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের লক্ষ্যে শহর থেকে ৮৪ কিলোমিটার দূরে টেকনাফের সাবরাং পয়েন্টে বিশেষ পর্যটন পল্লি গড়ার উদ্যোগ নেয় সরকার। ‘সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক’ নামের এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। ২০১৬ সালে টেকনাফ সদর ও সাবরাং ইউনিয়ন মৌজার ৯৬৭ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হলেও গত ১০ বছরেও আলোর মুখ দেখেনি এই ট্যুরিজম পার্ক।
কী থাকবে সাবরাং পার্কে
পরিকল্পনা অনুযায়ী এই পার্কে পাঁচ তারকা হোটেল, ইকোট্যুরিজম, মেরিন অ্যাকুয়ারিয়াম, সি-ক্রুজ এবং পানির নিচে রেস্তোরাঁসহ নানা সুবিধা থাকবে এই পার্কে। এটি তৈরি হলে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। দৈনিক পার্ক দেখতে যাবেন দেশি-বিদেশি ৩৯ হাজার পর্যটক।
পার্কের জমিতে হোটেল-রিসোর্ট ও বিনোদনকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ইতিমধ্যে ২৮টি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ১২০ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যার বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে প্রায় ৪৬ কোটি ডলারের। সাগরের ভাঙন রোধে প্রতিরক্ষা বাঁধ ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে এবং সেন্ট মার্টিনগামী পর্যটকদের জন্য ঘড়ি ভাস্কর্যের পাশে স্থায়ী জেটি নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে
সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক প্রকল্পের সহকারী পরিচালক জুলহাজ আহমদ প্রথম আলোকে জানান, পার্কের জমিতে হোটেল-রিসোর্ট ও বিনোদনকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ইতিমধ্যে ২৮টি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ১২০ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যার বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে প্রায় ৪৬ কোটি ডলারের। সাগরের ভাঙন রোধে প্রতিরক্ষা বাঁধ ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে এবং সেন্ট মার্টিনগামী পর্যটকদের জন্য ঘড়ি ভাস্কর্যের পাশে স্থায়ী জেটি নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে।
বর্তমানে বেজার এই কার্যালয়ে মাত্র পাঁচজন জনবল দিয়ে বিশাল প্রকল্পের তদারকি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা গিয়াস উদ্দিন জানান, প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৯০০ জন পর্যটক এলেও অল্পসংখ্যক জনবল দিয়ে তাদের নিরাপত্তা ও তদারক করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
বেজার নির্বাহী সদস্য সালেহ আহমদ জানান, আগামী ১০ বছরের মধ্যে সাবরাং পার্ককে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। জেটি নির্মাণ হলে সাবরাং পয়েন্ট থেকেই পর্যটকেরা সরাসরি সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ করতে পারবেন। দুই বছর ধরে কক্সবাজার শহর থেকে জাহাজে সেন্ট মার্টিন যাচ্ছেন পর্যটকেরা, তাতে অতিরিক্ত সময় ও অর্থের অপচয় হচ্ছে।
অপূর্ব সাবরাং সৈকত
উত্তাল সমুদ্র, সবুজ পাহাড়ঘেরা মেরিন ড্রাইভ আর সৈকতের নির্জন পরিবেশ সাবরাংয়ে আসা পর্যটকদের মুগ্ধ করবে। সেই সঙ্গে এখানে দেখা মিলবে সৈকতের রাস্তার দুই ধারে শত শত রঙিন জেলেনৌকা। টেকনাফ ডিঙিনৌকা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুলতান আহমদ জানান, পর্যটকদের বাড়তি আনন্দ দিতেই এক হাজারের বেশি নৌকা রঙিন করা হয়েছে।
পার্কের অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে প্রতিদিনই শত শত ভ্রমণপিপাসু এখানে ছুটে আসছেন। টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও বিনোদনের ক্ষেত্র তৈরি করা গেলে সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক দেশের পর্যটন খাতে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
যা দেখা গেল
কক্সবাজার শহর থেকে ৮৪ কিলোমিটার দূরে মেরিন ড্রাইভের শেষ প্রান্তে অবস্থিত সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক। গত মঙ্গলবার দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বৃষ্টি উপেক্ষা করে কয়েক শ পর্যটক সৈকতে ছবি তুলছেন, কেউ দাঁড়িয়ে উত্তাল সমুদ্রের রূপ উপভোগ করছেন।
বিকেলে সৈকততীরে নির্মিত ঘড়ি ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিলেন কয়েকজন পর্যটক। দীর্ঘদিন অকেজো থাকায় ঘড়ির কাঁটা বেলা ১১টা ৫ মিনিটে আটকে ছিল। তা দেখে পর্যটকেরা অসন্তোষ প্রকাশ করেন। ঘড়ি ভাস্কর্যের উল্টো দিকে কয়েকটি ঝুপড়ি দোকানে চা-কফি ও দুপুরের খাবার পাওয়া গেলেও কোথাও জরুরি প্রয়োজনের কোনো শৌচাগার বা যাত্রীছাউনি নেই। মোড়টি ৪০-৫০টি খোলা জিপগাড়ির টার্মিনালে পরিণত হয়েছে।
বেলা দুইটার দিকে খোলা জিপগাড়িতে চড়ে সাবরাং পার্ক–সংলগ্ন সমুদ্রসৈকতে নামেন ঢাকার একদল পর্যটক। তাঁদের একজন কলেজপড়ুয়া ছাত্রী অর্পিতা দাশ বলেন, কক্সবাজার থেকে দৃষ্টিনন্দন মেরিন ড্রাইভে সাবরাং পর্যন্ত আসতে মন সতেজ হয়ে যায়। মেরিন ড্রাইভের পশ্চিম পাশে উত্তাল সমুদ্র আর পূর্ব পাশে সবুজ গাছপালার সারিবদ্ধ পাহাড়-ঝরনা, চোখধাঁধানো এমন দৃশ্য আনন্দ বাড়িয়ে দেয়। আর সাবরাং সৈকতের শত শত রঙিন নৌকা, নির্জন পরিবেশ ও সাগরলতা মুগ্ধ করে সবাইকে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী এই পার্কে পাঁচ তারকা হোটেল, ইকোট্যুরিজম, মেরিন অ্যাকুয়ারিয়াম, সি-ক্রুজ এবং পানির নিচে রেস্তোরাঁসহ নানা সুবিধা তৈরি হলে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। দৈনিক পার্ক দেখতে যাবেন দেশি-বিদেশি ৩৯ হাজার পর্যটক।
আরেক পর্যটক কুমিল্লার দাউদ আহমদ বলেন, ‘দুই বছর আগেও পরিবার নিয়ে সাবরাং পার্ক দেখতে এসেছিলাম। পার্কের উন্নয়ন তখন যতটুকু দেখেছিলাম, এখনো ততটুকুতেই থেমে আছে। এখানে শিশুপার্ক, উন্নত মানের কফিশপ, সামুদ্রিক মাছের অ্যাকুয়ারিয়ামসহ বিনোদনের ক্ষেত্র তৈরি করা গেলে পর্যটকের সমাগম আর বাড়ত।’
সাবরাং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবদুস সালাম জানান, ২০২২ সালের শেষ দিকে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নদী থেকে বালু তুলে নিচু জমি ভরাট করেছিল। কয়েক বছর আগে ভরাট জমিতে তিনতলা বেজা কার্যালয় নির্মাণ করা হয়। পশ্চিম অংশে জিও ব্যাগের প্রতিরক্ষা বাঁধ দেওয়া হয়। গত ১০ বছরে পার্কের উন্নয়ন বলতে এতটুকুই।
টেকনাফ সদর ইউপি চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান বলেন, দুই বছর ধরে জোয়ারের ধাক্কায় সেই জিও ব্যাগের বাঁধও বিলীন হচ্ছে। বর্তমানে নতুন করে সীমানাপ্রাচীর ও প্রতিরক্ষা বাঁধের কাজ চলছে।
কক্সবাজার হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, প্রতিবছর কোটি টাকা আয়ের সুযোগ থাকলেও প্রকল্পের ধীরগতির কারণে বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করা যাচ্ছে না। ভূমি উন্নয়ন ও প্রাথমিক কাজ হলেও সাগরের ভাঙন ঠেকানোর দীর্ঘসূত্রতায় পর্যটনশিল্পের কাঙ্ক্ষিত উন্নতি ঘটছে না।
বন্ধ নাফ ট্যুরিজম পার্কের কাজ
বেজার তথ্যমতে, ২০২০ সালে নাফ ট্যুরিজম পার্কের মহাপরিকল্পনা অনুমোদন পায়। পার্কের জন্য বরাদ্দ করা হয় নাফ নদীর বুকে জেগে ওঠা জালিয়ারদিয়ার ২৭১ একর জমি। সেখানে হোটেল, ইকো কটেজ, কেব্ল কার, ঝুলন্ত সেতু ও ভাসমান জেটি নির্মাণের পাশাপাশি শিশুপার্ক, পানির নিচে রেস্তোরাঁ, ভাসমান রেস্তোরাঁসহ নানা পর্যটন স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। ২০২৩ সালের মাঝামাঝিতে জালিয়ারদিয়ায় মাটি ভরাট, দ্বীপে যাতায়াতের জন্য নদীর ওপর সেতু নির্মাণ ও নিরাপত্তা চৌকি স্থাপন করা হয়। দুই বছর ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ।
জালিয়ারদিয়ার পূর্ব পাশে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য, দক্ষিণ ও পশ্চিম পাশে টেকনাফের নেটং পাহাড়। বেজার কর্মকর্তা বলছেন, সীমান্তবর্তী অবস্থান, রাখাইন রাজ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং নিরাপত্তা বিবেচনা করে পার্কের উন্নয়নকাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। এটি দেশের প্রথম দ্বীপভিত্তিক ট্যুরিজম পার্ক।