যশোরে দুই বন্ধু ক্রিকেট খেলেন, পাশাপাশি গড়েছেন ব্যাট মেরামতের প্রতিষ্ঠান

দুই ক্রিকেটার বন্ধু রফিকুল ইসলাম ও আজমান হোসেন পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যাট মেরামতের প্রতিষ্ঠান গড়েছেনছবি: প্রথম আলো

রফিকুল ইসলাম (রাব্বি) ও আজমান হোসেন দুই বন্ধু। দুজনই স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ও ক্রিকেট খেলোয়াড়। তাঁরা এক বেলা লেখাপড়া করেন, অন্য বেলা ক্রিকেটের ব্যাটের গঠন ও মেরামতকাজ করে নিজেদের খরচ চালান। ‘ব্যাট এক্সপার্ট যশোর’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন তাঁরা। ক্রিকেটাররা স্বল্প খরচে এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যাট মেরামত ও গঠন পরিবর্তন করে নেওয়ার সুযোগ পান।

যশোর শহরে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ক্রিকেট প্রশিক্ষণের তিনটি একাডেমি আছে। এসব প্রতিষ্ঠানে অন্তত ৩০০ শিক্ষার্থী ক্রিকেট খেলার প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। এ ছাড়া শহর ও গ্রামের পাড়া–মহল্লায় অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে অসংখ্য ক্রিকেট খেলোয়াড় আছেন, যাঁদের বেশির ভাগ টেপ টেনিস বলে ক্রিকেট খেলে থাকেন। ক্রিকেট ব্যাটের যেকোনো সমস্যায় খেলোয়াড়দের বড় আস্থার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে রফিকুল-আজমানের প্রতিষ্ঠান ব্যাট এক্সপার্ট যশোর।

এ বিষয়ে যশোর শহরের ক্লেমন আছিয়া ক্রিকেট ইনস্টিটিউটের পরিচালক এহসানুল হক (সুমন) বলেন, খেলতে খেলতে অনেক সময় ব্যাট ফেটে যায়, হাতল নড়ে যায় কিংবা ব্যাটের ওজন বেশি বলে মনে হলে কমিয়ে নেওয়ার দরকার হয়। একটি ব্যাটের দাম ৩ থেকে ৩০ হাজার টাকা। নতুন ব্যাট কেনার সামর্থ্য ও সুযোগ সবার থাকে না। ক্রিকেট খেলোয়াড়দের জন্য এই জাতীয় (ব্যাট মেরামত) প্রতিষ্ঠান থাকা খুব দরকার।

রফিকুল যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়াবিজ্ঞান (পিইএসএস) বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি যশোরের চৌগাছা উপজেলার সলুয়া গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবা কৃষক। মা–বাবা ছাড়াও পাঁচ ভাইবোনের বড় সংসার রফিকুলদের। এ কারণে মাসের খরচ বহন করা তাঁর পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য নেই।
রফিকুল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শহীদ মশিয়ূর রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী। প্রতিদিন ক্লাস শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে করে বিকেলে যশোর শহরে চলে আসেন। কাজ শেষে রাত নয়টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস ধরে আবার ক্যাম্পাসে ফিরে যান। ২০২২ সালে যশোর জেলা ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় ছিলেন রফিকুল। তখন মাঠে অনুশীলনের সময় রায়হান রশিদ নামে আরেকজন ক্রিকেট খেলোয়াড়ের সঙ্গে পরিচয় হয় রফিকুলের। রায়হান রশিদ তখন ক্রিকেটের নতুন ব্যাটের গঠন ও মেরামতকাজ করতেন।

যশোর শহরের স্টেডিয়ামপাড়ায় পৌর হকার্স মার্কেটে রায়হানের খেলাধুলা সরঞ্জামের একটি দোকান আছে। তাঁর সঙ্গে যোগ দিয়ে রফিকুল কাজটি শিখে নেন। যদিও আগে থেকেই ইউটিউব দেখে নিজের ব্যবহৃত ব্যাটের পছন্দমতো গঠন নিজেই করতেন। সেই আগ্রহ থেকেই রায়হানের কাছ থেকে বাকি কাজটা শিখে নেন রফিকুল।

মাস ছয়েক আগে রায়হান রশিদের কাছ থেকে রফিকুল আলাদা হয়ে আসেন। এরপর তিনি ‘ব্যাট এক্সপার্ট যশোর’ নামের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। এবার রফিকুলের উদ্যোগের অংশীজন হন তাঁরই বন্ধু আজমান হোসেন। এখন দুই বন্ধু মিলে পৌর হকার্স মার্কেটে একটি দোকান নিয়েছেন। প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত তাঁরা এখানে কাজ করেন।

রফিকুল ইসলাম ও আজমান হোসেন ‘ব্যাট এক্সপার্ট যশোর’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন
ছবি: প্রথম আলো

সম্প্রতি ব্যাট এক্সপার্ট যশোরে গিয়ে দেখা গেল, রফিকুল ছোট্ট একটি দোকানের ভেতরে বসে নতুন ব্যাটের গঠন পরিবর্তনে কাজ করছেন। পাশে বসে আজমান আরেকটি ব্যাটের হাতলে সুতা জড়ানোর কাজ করছেন। এভাবেই চলছে দুই বন্ধুর উদ্যোগ।

রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘২০২২ সাল থেকে আমি ব্যাটের গঠন ও মেরামতের কাজ করছি। তবে নিজেই প্রতিষ্ঠান করেছি এই প্রথম। এর আগে রায়হান রশিদ নামে এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে এই কাজ করেছি। এখন যশোর জেলা ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় আমার বন্ধু আজমান হোসেনকে নিয়ে যৌথ উদ্যোগ নিয়েছি। আমাদের স্বপ্ন আছে নতুন ব্যাট তৈরির কারখানা স্থাপন করার।’

আজমান হোসেন যশোর জেলা ক্রিকেট দলের অলরাউন্ডার। তিনি উপশহর ডিগ্রি কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। তাঁর বাড়ি ঝিকরগাছা উপজেলায়। শহরের চাঁচড়া ডালমিল এলাকায় তিনি একটি ছাত্রাবাসে থাকেন। তাঁর লেখাপড়ার খরচ বহন করার সামর্থ্য পরিবারের নেই। এ কারণে খেলাধুলা ও লেখাপড়ার পাশাপাশি নিজেদের খরচ চালানোর জন্য এ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন।

আজমান হোসেন বলেন, ‘আমি ক্রিকেট খেলোয়াড়। ক্রিকেটে কী ধরনের খেলার জন্য কী ধরনের ব্যাটের প্রয়োজন, সেটা আমি জানি। কিন্তু ব্যাট কাস্টমাইজ করার কাজটি আমি জানতাম না। আমার বন্ধু রফিকুলের কাছ থেকে এ কাজ আমি শিখে নিয়েছি। এখন নতুন ব্যাটের ওজন কমানো, ভাঙা ব্যাট মেরামত করাসহ সব ধরনের কাজ পারি।’

কথায় কথায় জানা গেল দুই বন্ধু ৬০ হাজার টাকা দিয়ে এ উদ্যোগ শুরু করেন। সেই টাকা দিয়ে যন্ত্রপাতিসহ অন্যান্য সরঞ্জাম ক্রয় করেছেন। সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি—ছয় মাস পর্যন্ত ক্রিকেট খেলার ভরা মৌসুম। এ সময়ে ব্যাটের কাজের চাপও বাড়ে।

রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ক্রিকেট মূলত বছরের ছয় মাসের খেলা। এ সময়ে আমাদের ব্যাট কাস্টমাইজের কাজ বাড়ে। এ সময়ে প্রতি মাসে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আমাদের প্রতিষ্ঠানের পেজ আছে। ওই পেজের মাধ্যমে বেশি কাজ আসে।’

ছোট পরিসরে শুরু করলেও রফিকুল ও আজমানের স্বপ্ন বড়। নতুন ব্যাট তৈরির কারখানা স্থাপন করতে চান তাঁরা।