বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে মাঠের ফসল। যেটুকু ফসল কাটা গেছে, বৃষ্টিতে ভিজে তা–ও যাচ্ছে নষ্ট হয়ে। হাওরে এখন চলছে কৃষকের হাহাকার। বোরো ধানের এই ক্ষতি এখন জাতীয়ভাবে আলোচনার বিষয়। সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসছে কৃষকের দুর্ভোগের খবর, আসছে নানা ছবি-ভিডিও।
এর মধ্যেই একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, পানিতে তলিয়ে যাওয়া পাকা ধানখেতের মধ্যে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ ধান কাটছেন। কোমরসমান পানির মধ্যে কাজ করতে করতে ক্লান্ত শরীর নিয়ে কিছুক্ষণ পরপর ভাত খাচ্ছেন তিনি। পাশে পড়ে আছে ধান কাটার কাস্তে, আর কাঁপতে কাঁপতে খাবার মুখে তুলছেন তিনি।
৩ মে থেকে এই ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন পেজ ও প্রোফাইলে পোস্ট করা ভিডিওগুলোর ক্যাপশন ছিল এ রকম—‘ধান কাটার ফাঁকে ক্ষুধার যন্ত্রণা, তবুও থামে না লড়াই… ঝড়–বৃষ্টি উপেক্ষা করে মাঠে থাকে আমাদের কৃষক—দেশের আসল শক্তি’, ‘ঝড়বৃষ্টি উপেক্ষা করে কাটছে নিজের ক্ষেতের ধান, কাঁপতে কাঁপতে পানিতে দাঁড়িয়ে খাচ্ছে ভাত’, ‘পানিতে দাঁড়িয়ে ভাত খাচ্ছেন, তবুও থামেনি ধান কাটা’।
তার মধ্যেই খেতে বৃষ্টির মধ্যে ভিজে ভিজে ধান কাটার সময় ভাত খাওয়ার ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে। ‘ধান কাটার ফাঁকে ক্ষুধার যন্ত্রণা, ঝড়ের মধ্যেও সংগ্রামে কৃষক!’এই শিরোনামে পোস্ট কর একটি ভিডিও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ৭৪ লাখের বেশি বার দেখা হয়, তাতে প্রতিক্রিয়া পড়েছে ২ লাখ ৩৪ হাজার। মন্তব্য পড়েছে চার হাজার সাতশ এবং শেয়ার হয়েছে ৬ হাজার ৬০০ বার।
লিংক:এখানে
একই ভিডিও ‘পানিতে দাঁড়িয়ে ভাত খেয়ে চলছে ধান কাটা’এই ক্যাপশনে পোস্ট করা আরেকটি ফেসবুক পেজে এখন পর্যন্ত দেখা হয়েছে প্রায় ১০ লাখ বার। প্রতিক্রিয়া পড়েছে ৫০ হাজারের বেশি। পাশাপাশি মন্তব্য পড়েছে প্রায় ১ হাজার এবং শেয়ার হয়েছে প্রায় ৪ হাজার।
লিংক:এখানে
ভিডিও ক্লিপটি ৫০টির বেশি ফেসবুক পেজে পোস্ট করা হয়েছে। পাশাপাশি অনেকের ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকেও শেয়ার করা হয়। ভিডিওর ঘটনাকে সত্য ধরে নিয়ে অনেকে আবেগতাড়িত মন্তব্যও করেন।
যাচাই করে জানা যায়, পানিতে দাঁড়িয়ে কৃষকের ভাত খাওয়ার দৃশ্যের ভিডিওটি বাস্তব কোনো ঘটনার দৃশ্য নয়। প্রকৃতপক্ষে, অভিনয়ের মাধ্যমে তৈরি একটি কনটেন্টকে বাস্তব ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।
আলোচিত ভিডিওটির বিষয়ে অনুসন্ধানে ‘MD Liton Mia’নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টে গত ০২ মে তারিখে একই ভিডিওটি ‘তুফান এর মাজে ধান কাটরাম’(বানান অবিকৃত রাখা হলো) ক্যাপশনে পোস্ট করা হয়। ভিডিওটি ৬০ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে ওই একাউন্ট থেকে।
লিংক: এখানে
এই প্রোফাইল পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সমসাময়িক নানা বিষয়ে লিটন মিয়া নানা কন্টেন্ট তৈরি করে প্রচার করে থাকেন।
এই বিষয়ে লিটন মিয়ার সঙ্গে কথা বলতে মেসেঞ্জারে বার্তা পাঠিয়েও তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে নিশ্চিত হওয়া যায়নি, আসলেই তিনি ধান কেটেছিলেন কি না?
ফেসবুক প্রোফাইল যাচাই করে জানা যায়, তিনি সুনামগঞ্জ জেলার বাসিন্দা। প্রথম আলোর প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লিটন মিয়া একজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটর। তিনি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়নের সালদিকা গ্রামের বাসিন্দা। এলাকায় এবং এলাকার বাইরে গিয়ে তিনি ভিডিও বানান।
লিটনকে মিয়াকে চেনার কথা জানিয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম বকুল প্রথম আলোকে বলেন, এই যুবক টিকটক ভিডিও বানিয়ে ফেসবুকে দিয়ে থাকেন।
লিটন মিয়া খেতে ধান কাটছিলেন, এমন তথ্য কেউ দিতে পারেননি। এটা তিনি ভিডিও কন্টেন্ট তৈরির জন্যও করে থাকতে পারেন।
সুতরাং, পানিতে দাঁড়িয়ে কৃষকের ভাত খাওয়ার বাস্তব দৃশ্য করে প্রচারিত ভিডিওটি বিভ্রান্তিকর।