শরীয়তপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে তিন সাংবাদিককে মারধর, অভিযোগ যুবদল নেতার বিরুদ্ধে
শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে তিন সাংবাদিককে মারধর করা হয়েছে। জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আরিফুজ্জামান মোল্লার নেতৃত্বে তাঁর সমর্থকেরা মারধর করেছেন বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী সাংবাদিকেরা।
হামলার শিকার সাংবাদিকেরা হলেন ডেইলি স্টারের সাংবাদিক জাহিদ হাসান, নিউজ টুয়েন্টিফোর টেলিভিশন ও জাগো নিউজের জেলা প্রতিনিধি বিধান মজুমদার ও মানবকণ্ঠের জেলা প্রতিনিধি বরকত মোল্লা।
আজ মঙ্গলবার সকালে ওই তিন সাংবাদিক জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের প্রাঙ্গণে গেলে তাঁদের মারধর করা হয়। শরীয়তপুরের বিএনপির নেতারা তখন সেখানে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করছিলেন।
আহত সাংবাদিক জাহিদ হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘পেশাগত দায়িত্ব পালন করার জন্য আমি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে যাই। সেখানে একটি বিক্ষোভ মিছিল হচ্ছিল। ওই মিছিলের ছবি ও ভিডিও ধারণ করার সময় যুবদল নেতা আরিফ মোল্লা (আরিফুজ্জামান) তাঁর সহযোগীদের নিয়ে আমাকে মারধর করেছেন। তাঁরা আমার ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। স্থানীয় কয়েকজন আইনজীবী আমাকে উদ্ধার করে তাঁদের কার্যালয় নিয়ে যান।’
সাংবাদিক বিধান মজুমদার বলেন, ‘তথ্য সংগ্রহ করার জন্য আমি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যাই। ভবনের নিচতলা থেকে দোতলায় যাচ্ছিলাম। সেখানে যুবদলের নেতা আরিফ মোল্লা ও তাঁর সহযোগীরা আমাকে চড়–থাপ্পড় ও লাথি মেরে ভবন থেকে বের করে দেন। আমি তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেব।’
তিন সাংবাদিককে মারধরের বিষয়ে জানতে যুবদলের সাবেক সভাপতি আরিফুজ্জামান মোল্লাকে কয়েক দফা ফোন করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি।
কয়েকজন সাংবাদিক জানান, শরীয়তপুর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গত শনিবার রাতে প্রেসক্লাবের সীমানাপ্রাচীরের তিনটি দেয়াল ভেঙে দেওয়া হয়। ওই ঘটনা নিয়ে এর প্রতিবাদে সাংবাদিক বি এম ইসরাফিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রেসক্লাব সভাপতি আবুল হোসেন ও জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগমের ছবি দিয়ে প্রতিবাদ করেন। ওই ঘটনার জেরে তাঁর ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। তাতে বি এম ইসরাফিলের ডান হাতের কবজি ভেঙে যায়।
সাংবাদিক ইসরাফিলের ওপর হামলা ও প্রেসক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলার প্রতিবাদে শরীয়তপুরে কর্মরত সাংবাদিকেরা গত রোববার বিকেলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। কর্মসূচি চলাকালে জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম সেখান দিয়ে যেতে চাইলে সাংবাদিকেরা তাঁকে ঘিরে রাখেন। এ সময় সাংবাদিকেরা জেলা প্রশাসকের প্রত্যাহার দাবি করে বিক্ষোভ করতে থাকেন।
ওই ঘটনায় শরীয়তপুরের বিএনপির একটি পক্ষ সাংবাদিকদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়। বিএনপির কর্মীরা শরীয়তপুর প্রেসক্লাব ও কয়েকজন সাংবাদিকের উদ্দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা করেন। তাঁরা সভা করে সাংবাদিকদের বিপক্ষে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে আজ বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করা হয়। ‘শরীয়তপুর জেলার সর্বস্তরের জনগণ’ নামের ব্যানারে জেলা পর্যায়ের বিএনপির কিছু নেতার উপস্থিতিতে কয়েক শ মানুষ কর্মসূচিতে অংশ নেন। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে জেলা প্রশাসককে ঘিরে মব সৃষ্টিকারী কয়েকজন সাংবাদিকের শাস্তি দাবি করে ব্যানার লেখা হয়।
আজ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিএনপির নেতা–কর্মী ও সমর্থকেরা যখন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে জড়ো হচ্ছিলেন, তখন সেখানে যান সাংবাদিক জাহিদ হাসান, বিধান মজুমদার ও বরকত মোল্লা। জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আরিফুজ্জামান মোল্লার নেতৃত্বে তাঁর বেশ কয়েকজন সমর্থক ওই তিন সাংবাদিককে মারধর করেন।
বিএনপির পক্ষে করা ওই বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য দেন শরীয়তপুর জেলা বিএনপির সহসভাপতি শাহ মোহাম্মদ আবদুস সালাম, সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি সিরাজুল হক মোল্লা, সাধারণ সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদ প্রমুখ। বিএনপি নেতারা দাবি করেন, জেলা প্রশাসক সরকারের প্রতিনিধি। তাঁর গাড়ি ঘিরে সাংবাদিকেরা মব সৃষ্টি করেছেন। সাংবাদিকেরা সন্ত্রাসী আচরণ করে জেলা প্রশাসকের প্রত্যাহার দাবি করেছেন। সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁরা প্রেসক্লাবের নামে অবৈধভাবে সরকারি জমি দখলে রেখেছেন।
সাংবাদিকতার আড়ালে কিছু সন্ত্রাসী ও ফ্যাসিবাদের দোসররা বিএনপি সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য এমন কাজ করেছেন। এ কারণে আমরা প্রতিবাদ সমাবেশ করেছি। সেখানে কোনো সাংবাদিক নিগৃহীত বা মারধরের শিকার হয়েছেন কি না, তা আমার জানা নেই।শাহ মোহাম্মদ আবদুস সালাম, শরীয়তপুর জেলা বিএনপির সহসভাপতি
বিএনপি নেতা ও প্রেসক্লাবের ভাষ্য
জানতে চাইলে শরীয়তপুর জেলা বিএনপির সহসভাপতি শাহ মোহাম্মদ আবদুস সালাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাংবাদিকেরা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করেছেন। তাঁরা এভাবে তাঁর প্রত্যাহার চাইতে পারেন না। সাংবাদিকতার আড়ালে কিছু সন্ত্রাসী ও ফ্যাসিবাদের দোসররা বিএনপি সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য এমন কাজ করেছেন। এ কারণে আমরা প্রতিবাদ সমাবেশ করেছি। সেখানে কোনো সাংবাদিক নিগৃহীত বা মারধরের শিকার হয়েছেন কি না, তা আমার জানা নেই।’
শরীয়তপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘জেলা প্রশাসক কোনো নোটিশ ছাড়া প্রেসক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে দিয়েছেন। ওই ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে সময় টিভির সাংবাদিক সন্ত্রাসী হামলার শিকারের পর আহত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সাংবাদিকেরা মানববন্ধন করেছেন এবং জেলা প্রশাসকের প্রত্যাহার দাবি করেছেন। এমন একটি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আজ যুবদলের এক নেতা তিন সাংবাদিককে মারধর করেছেন, যা অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত। আমরা প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে এ ঘটনার আইনগত পদক্ষেপ নেব।’
জেলা প্রশাসক কোনো নোটিশ ছাড়া প্রেসক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে দিয়েছেন। ওই ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে সময় টিভির সাংবাদিক সন্ত্রাসী হামলার শিকারের পর আহত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সাংবাদিকেরা মানববন্ধন করেছেন এবং জেলা প্রশাসকের প্রত্যাহার দাবি করেছেন।নুরুল আমিন, শরীয়তপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক
বিষয়টি জানার জন্য শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগমকে কয়েক দফা ফোন করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি। সাংবাদিকদের মারধরের বিষয়টি জানতে শরীয়তপুরের পুলিশ সুপার রওনক জাহান ও পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহ আলমকে কয়েক দফা ফোন করা হয়। তাঁরাও ফোন ধরেননি। ওই দুজনকে খুদে বার্তা দিলেও কোনো জবাব দেননি।