সরকারি জমি ‘দখল বিক্রির’ সুযোগে আস্তানা গড়ে ‘ইমাম মাহমুদের কাফেলা’
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের পূর্ব টাট্রিউলি এলাকার প্রায় সব জমিই সরকারি খাস শ্রেণির। স্থানটি মুরইছড়া মৌজায় পড়েছে। নির্জন পাহাড়ি ওই এলাকায় লোকজন খাসজমি দখল করে বসতি স্থাপন করেছেন। কেউ কেউ সেই জমি বিক্রিও করেন। স্থানীয়ভাবে যাকে বলা হয় ‘দখল বিক্রি’।
অবৈধ এই কর্মকাণ্ডের সুযোগ নেন নতুন জঙ্গি সংগঠন ‘ইমাম মাহমুদের কাফেলার’ সদস্যরা। তাঁরা স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছ থেকে জমি কিনে সেখানে আস্তানা গড়েন। দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় সরকারি জমি দখল, দখল বেচাকেনা চললেও জমি উদ্ধার কিংবা অবৈধ দখলদার উচ্ছেদে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
মৌলভীবাজারের জেলা পুলিশের সহায়তায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের সোয়াত দল গত শনিবার পূর্ব টাট্রিউলি এলাকায় একটি বাড়িতে প্রায় চার ঘণ্টা অভিযান চালায়। ‘অপারেশন হিলসাইড’ নামের এই অভিযানে ১০ জন নারী-পুরুষকে গ্রেপ্তার হন। তাঁদের সঙ্গে তিন জন শিশুও ছিল। সিটিটিসি বলছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা ‘ইমাম মাহমুদের কাফেলা’ নামের নতুন একটি জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত।
এ বিষয়ে কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান খোন্দকার প্রথম আলোকে বলেন, জঙ্গিরা কীভাবে সরকারি জমি কিনলেন, তা তদন্তের জন্য সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন পেলে বিস্তারিত জানা যাবে। প্রতিবেদনের আলোকে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরেজমিন গত রোববার দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, পূর্ব টাট্রিউলিতে যে টিলায় জঙ্গিরা থাকতেন সেটির প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রবেশপথে বাঁশের প্রতিবন্ধক। ভেতরে টিলা কেটে সমান করা জমিতে টিন-বাঁশের তৈরি পাশাপাশি তিনটি ঘর। আশপাশের টিলায় লোকজনের বসতি।
ওই টিলার পাশেই রেজিয়া বেগমদের বসতঘর। তাঁর স্বামী আবদুর রাজ্জাক দিনমজুর। নতুন ঘরগুলো দেখিয়ে রেজিয়া বললেন, ‘দুই মাস আগে তাঁরা আইলো। টিলা কটিয়া ঘর বানাইল। পুরুষ ২০-২৫ জন, মহিলা ছয়জন আর তিনটা বাচ্চা থাকত। নদী নাকি তাঁরার বাড়িঘর নিয়া গেছে। তাই, এইখানে আইছে।’
রেজিয়া বলেন, ওই বাড়ির বাসিন্দারা ঘরের মেঝেতে ঘুমাতেন। ঘরের কোনে কয়েকটি ট্রাঙ্ক ছিল। নারী পর্দাশীল ছিলেন। তাঁরা কিছু বইপত্র পড়তেন, তেলাওয়াত করতেন। চিকিৎসকের স্ত্রী বলতেন, আয়–রোজগার করতে তাঁর স্বামী স্থানীয় জুগিটিলা বাজারে ওষুধের দোকান খুলবেন। তখন আর অভাব থাকবে না।
এলাকাবাসী বলেন, সহজে জমি কেনার সুযোগ পেয়ে জঙ্গিরা প্রায় দুই মাস আগে পূর্ব টাট্রিউলির বাসিন্দা রাশিদ আলীর কাছ থেকে ৫০ শতক জমি সাত লাখ টাকা দিয়ে কিনেন। রাশিদ কাতারে থাকেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে ছোট ভাই রফিক মিয়ার সঙ্গে জঙ্গিদের টাকা লেনদেন হয়। সম্প্রতি রফিকও দুবাইয়ে পাড়ি জমান।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্থানীয় কিছু লোক অবৈধভাবে জমি দখল করে রেখেছেন। কেউ কেউ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থান থেকে আসা লোকজনের কাছে জমি বিক্রি করেছেন। জমির দলিল হিসেবে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ব্যবহার করা হয়। পূর্ব টাট্রিউলিতে বর্তমানে ৩০০ পরিবার থাকে। এসব পরিবারের লোকজন জমি কিনে বসবাস করছেন। সব বাড়িতেই পল্লী বিদ্যুতের আওতায় সংযোগ রয়েছে।
বাড়িতে গিয়ে খোঁজ করে রাশিদ আলীর পরিবারের কোনো পুরুষ সদস্যকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তাঁদের বড় ভাই রশিদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুনছি রাশিদ ৫০ শতক জমি বিক্রি করছে। রফিক লেনদেনের সময় ছিল। এইখানে তো অনেকেই এটা করেন। পুলিশ যাদের ধরছে, তাঁরা যে খারাপ—এইটা তো আগে কারও জানা ছিল না।’
কর্মধা ও পার্শ্ববর্তী পৃথিমপাশা ইউনিয়নের ভূমিবিষয়ক কার্যক্রম স্থানীয় রবির বাজার ভূমি কার্যালয়ে সম্পাদন হয়। কার্যালয়ের দায়িত্বে থাকা ভূমি সহকারী কর্মকর্তা রকিব আহমদ মুঠোফোনে বলেন, তিনি ঢাকায় প্রশিক্ষণে রয়েছেন। আগামী রোববার ফিরবেন। মুরইছড়া মৌজা অথবা পূর্ব টাট্রিউলি এলাকায় কী পরিমাণ খাসজমি, কী অবস্থায় আছে, তা নথি না দেখে বলা সম্ভব নয়।
কর্মধা ইউনিয়ন পরিষদের স্থানীয় ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবদুল কাদির বলেন, পূর্ব টাট্রিউলির সব টিলা জমিই সরকারি খাস। স্ট্যাম্পে জমি কেনাবেচা হয়। তবে শনিবারের ঘটনায় সবাই ভয় পেয়েছেন। জমি বিক্রির আগে সবাইকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।