বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
নিহত শিক্ষার্থীর পরিবারকে এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি, আবারও মহাসড়ক অবরোধ
সড়ক দুর্ঘটনায় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইয়াসিন আরাফাত নিহত হওয়ার প্রতিবাদে এবং তাঁর পরিবারকে এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের দাবিতে আজ সোমবার সন্ধ্যায় আবারও বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা।
সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এতে মহাসড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। রাত আটটায় এই প্রতিবেদন লেখার সময় শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে সেখানে অবস্থান করছিলেন।
এর আগে দুপুরে ইয়াসিন আরাফাতের মৃত্যুর ঘটনায় বিভিন্ন দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কার্যালয়ে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। দুর্ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা সময়মতো ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে উপস্থিত না হওয়ায় তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তাঁরা। একই সঙ্গে ইয়াসিনের পরিবারকে এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবিও তোলা হয়।
এর আগে বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে ইয়াসিন আরাফাতের গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইয়াসিনের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এর সঙ্গে সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) পক্ষ থেকে আরও সাত লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়।
তবে শিক্ষার্থীরা ১৭ লাখ টাকার এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁদের দাবি, ইয়াসিনের পরিবারের জন্য এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এই দাবিতে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে তাঁরা বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ শুরু করেন।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলেন, ইয়াসিনের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে দুর্ঘটনার পর প্রক্টরিয়াল বডির দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্ত করে তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে নিহত শিক্ষার্থীর পরিবারকে এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
‘কোনো দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেই’
আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী মো. রাজিব বলেন, ‘আমরা দুপুরে আলোচনা করে ভেবেছিলাম, প্রশাসন আমাদের দাবিগুলো মেনে নেবে। প্রক্টরিয়াল বডির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং নিহতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, দুপুর গড়িয়ে রাত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়নি। আবার নামে মাত্র ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আমরা এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চাই। আমাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।’
এ সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মামুন আর রশিদ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার কথা। তারপরও আমি ১০ লাখ টাকার ব্যবস্থা করেছি। এ ছাড়া বিআরটিসি ও সড়ক ও জনপথ বিভাগ মিলে আরও সাত লাখ টাকা দিতে চেয়েছে।’
শিক্ষার্থীদের মহাসড়ক অবরোধের কারণে বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কের উভয় পাশে বিপুলসংখ্যক যানবাহন আটকা পড়েছে। এতে যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী যানসহ বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রীরা দীর্ঘ সময় সড়কে আটকে থেকে চরম ভোগান্তিতে পড়েন।
শিক্ষার্থীদের মহাসড়ক অবরোধের কারণে বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কের উভয় পাশে বিপুলসংখ্যক যানবাহন আটকা পড়েছে। এতে যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী যানসহ বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রীরা দীর্ঘ সময় সড়কে আটকে থেকে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
রোববার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কের দপদপিয়া সেতুর ঢালে বাস ও থ্রি-হুইলার মাহিন্দ্রার মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মাহিন্দ্রার এক যাত্রী নিহত ও পাঁচজন আহত হন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী ইয়াসিন আরাফাত। তাঁর বাড়ি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ডেরাজান গ্রামে। দুর্ঘটনার পর তাঁকে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
সেখানে চিকিৎসকেরা উন্নত চিকিৎসার জন্য ইয়াসিন আরাফাতকে দ্রুত ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেন বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। ইয়াসিনের সহপাঠী মো. রাজিব বলেন, হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনি একাধিকবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও রেজিস্ট্রারের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রেজিস্ট্রার তাঁকে জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করছে।
কিন্তু দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার কথা জানানোর পরও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দীর্ঘ সময় চলে যায়।
রাজিব বলেন, ‘হাসপাতালে যাওয়ার পর একাধিকবার প্রক্টর ও রেজিস্ট্রার স্যারকে ফোন করেছি। রেজিস্ট্রার স্যার আমাকে বলেছেন, “অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন করছে।” কিন্তু এরপর প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর প্রশাসন হাসপাতালে যায়। আমার ভাইটার জন্য বারবার এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের কথা বলার পরও তারা সেটির ব্যবস্থা করতে পারেনি।’
হাসপাতালে যাওয়ার পর একাধিকবার প্রক্টর ও রেজিস্ট্রার স্যারকে ফোন করেছি। রেজিস্ট্রার স্যার আমাকে বলেছেন, অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন করছে। কিন্তু এরপর প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর প্রশাসন হাসপাতালে যায়।মো. রাজিব, নিহত ইয়াসিনের সহপাঠী
ইয়াসিনকে শেষ পর্যন্ত সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় পাঠানো হয়। পথে রাত সোয়া ১০টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, একটি জরুরি পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলার কোনো সুস্পষ্ট প্রস্তুতি ছিল না। কে সিদ্ধান্ত নেবেন, কে হাসপাতালে যাবেন, কে পরিবহন নিশ্চিত করবেন এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে সমন্বয় করবেন—এসব বিষয়ে কার্যকর সমন্বয় দেখা যায়নি।
ঠাকুরগাঁওয়ে দাফন সম্পন্ন
ইয়াসিন আরাফাতের লাশ রোববার মধ্যরাতে শাহবাগ থানা থেকে গ্রহণ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মেহেদী হাসান। পরে তিনি ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ের উদ্দেশে রওনা হন।
মেহেদী হাসান জানান, আজ দুপুর সাড়ে ১২টায় ইয়াসিনের লাশ নিয়ে তাঁরা গ্রামের বাড়ি ঠাকুরগাঁও সদরের ডেরাজান গ্রামে পৌঁছায়। ইয়াসিন ওই গ্রামের মোহাম্মদ সুলতান মাহমুদ পাভেলের একমাত্র ছেলে।
নিহত ইয়াসিন আরাফাতের বড় চাচা আলমাস হোসেন আজ বিকেলে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ভাইয়ের পরিবার তাঁদের একমাত্র ছেলেটাকে হারিয়ে পাগলপ্রায়। আমাদের সান্ত্বনা দেওয়ার আর কিছু রইল না। বিকেল পাঁচটায় জানাজা শেষে পারিবারিক গোরস্থানে ইয়াসিন আরাফাতের দাফন করা হয়েছে।’