‘ধার শোধ হওয়ার আগে আরেকটি নিষেধাজ্ঞা’

কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর ফিশারিঘাটে পড়ে আছে মাছ ধরার ট্রলার। গত বৃহস্পতিবার দুপুরেছবি: প্রথম আলো

কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর ধারে ফিশারিঘাটে নোঙর করা নৌকায় বসে দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন কয়েকজন জেলে। নৌকার পাটাতনে গোল হয়ে বসা জেলেদের সঙ্গে আলাপ জমে ওঠে। ডাল, ভাত, সবজির তরকারি ছিল খাবারের তালিকায়। জেলে আনোয়ার জানালেন গত এক সপ্তাহ সাগরে গিয়েও প্রায় খালি হাতে ফিরেছেন তারা। কিছু ছোট মাছ পেলেও সেগুলো বিক্রি করে দিয়েছেন। অন্য সময় ভালো মাছ ধরা পড়লে তারা খাওয়ার জন্য কিছু রেখে দেন। এবার তা মাছ রাখা যায়নি। তাই সবজি আর ডাল দিয়ে খেতে হচ্ছে।

তবে খাবার নিয়ে কোনো আক্ষেপ দেখা গেল না কারও মধ্যে। জেলেরা জানালেন, নিজেদের নিয়ে ভাবনা নেই তাদের। পরিবার নিয়ে সামনের কয়েক মাস কীভাবে চলবেন সে নিয়েই দুর্ভাবনা। আনোয়ার হোসেন (২৫) বললেন, গত পাঁচ মাস ধরে ধার-দেনা করে সংসার চালাচ্ছেন। এই মৌসুমে মাছ বিক্রি করে শোধ দেবেন ভেবেছিলেন। কিন্তু মৌসুম শেষ হতে চলেছে। আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে ৫৮ দিন অর্থাৎ প্রায় দুই মাসের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা শুরু হবে।

আনোয়ারের কথার পিঠে সঙ্গী এক জেলের ফোড়ন কাটায় সবাই হেসে উঠলেন। হাসিঠাট্টা আর রসিকতার মাঝেও কঠোর বাস্তবতার কথাগুলো উঠে আসছিল তাদের কথা। জেলে খলিল উল্লাহ (৪৫) ভাত খেতে খেতে বলেন, ‘আঁরা সাগরর ৭০-৮০ কিলোমিটার দূরে যাই জাল ফেলি, কিন্তু মাছর দেহা ন পাই। আঁরা চইল্লুম ক্যান গরি ? আঁরার দুঃখ হনিক্যায় (কেউ) ন বুঝে।’

কক্সবাজার জেলায় অন্তত এক লাখ জেলে ও কয়েক হাজার ট্রলারমালিক রয়েছেন বলে ফিশিং বোট মালিক সমিতির সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে মাত্র ২৫০টি ট্রলার এখন সাগরে আছে। ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, সদর, পেকুয়া, চকরিয়াসহ জেলাতে ৯টি উপজেলাতে মাছ ধরার ট্রলার রয়েছে ৫ হাজার ২৫০টি। জ্বালানি সংকটের কারণে ৯৫ শতাংশ ট্রলার দুই সপ্তাহ ধরে ঘাটে পড়ে আছে।

কক্সবাজারের বাঁকখালী নদীর তীরের ফিশারিঘাটে কয়েক শ জেলে নৌকা পাশাপাশি নোঙর করে রাখা। মাছ ধরার মৌসুমে ট্রলারগুলোর এখন সাগরে ব্যস্ত সময় কাটানোর কথা। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে ফিশারিঘাটের কয়েকটি ট্রলারের মাঝিমাল্লার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বারবার খালি হাতে ফিরে আসার মালিক সাগরে পাঠাতে চান না। অনেকে লোকসানের বোঝা টানতে পারছেন না।

জেলারা বললেন, অনেক সময় দু-একটি ট্রলারে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ মাছ ধরা পড়ে। আবার অনেক সময় দিনের পর দিন সাগরে কাটিয়েও মাছ মেলে না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ইরান যুদ্ধ। যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি তেল নিতে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। অনেকে প্রয়োজনমতো তেল পাননি।

জেলে মো. আলমগীর (৪৫) বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে ১২ দিন ধরে তাঁরা মাছ ধরতে সাগরে যেতে পারছেন না। প্রতি দফায় ( ট্রিপে) ৫-৬ লাখ টাকা করে লোকসান গোনার পর সাগরে ট্রলার পাঠাতে মালিক অনীহা প্রকাশ করছেন। তাই ট্রলার ঘাটে পড়ে আছে। তিনি ট্রলার পাহারা দিচ্ছেন, অপর ১৯ জেলেরা বাড়িতে বেকার সময় কাটাচ্ছেন।

সাগর থেকে আহরণ করা ছোট মাছ। টেকনাফ সৈকতে। সম্প্রতি তোলা
ছবি: প্রথম আলো

চার সংকটে জেলেরা

ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, চার সংকটে ভুগছেন কক্সবাজারের জেলারা। এগুলো হলো জ্বালানিসংকট, সাগরে মাছের আকাল, জলদস্যুদের লুটপাট এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

জেলায় অন্তত এক লাখ জেলে ও কয়েক হাজার ট্রলারমালিক রয়েছেন বলে ফিশিং বোট মালিক সমিতির সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে মাত্র ২৫০টি ট্রলার এখন সাগরে আছে বলে জানান ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, সদর, পেকুয়া, চকরিয়াসহ জেলাতে ৯টি উপজেলাতে মাছ ধরার ট্রলার রয়েছে ৫ হাজার ২৫০টি। জ্বালানি সংকটের কারণে ৯৫ শতাংশ ট্রলার দুই সপ্তাহ ধরে ঘাটে পড়ে আছে। ২৫০টি ট্রলার মাছ ধরতে সাগরে নামলেও বেশির ভাগ ট্রলারের জালে মাছ ধরা পড়ছে না। কিছু ট্রলারের জালে মাছ ধরা পড়লেও জলদস্যুরা তা লুটপাট করে নিয়ে যাচ্ছে। যে কারণে অন্তত ১ লাখ জেলে শ্রমিক বেকার জীবন কাটাচ্ছেন। ১৫ এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে সাগরে মাছ আহরণে ওপর ৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা। তখন জেলে পরিবারে বিপর্যয় নেমে আসবে। জেলায় জেলে শ্রমিকের সংখ্যা ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি।

এ প্রসঙ্গে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা প্রথম আলোকে বলেন, ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞায় মৎস্য বিভাগের নিবন্ধিত ৬৪ হাজার ২৩ জন জেলেকে ৭৭ দশমিক ৩৩ কেজি করে চাল দেওয়া হবে। অনিবন্ধিত জেলেরা এ সহায়তা পাবে না।

কয়েকজন জেলে জানান, জেলার ৪৫টির বেশি জেলে পল্লিতে এখন তীব্র খাদ্য সংকট চলছে। মাছ ধরা ছাড়া জেলে শ্রমিকদের অন্য কোনো আয়ের উৎস না থাকায় বহু পরিবার অনাহারে-অর্ধাহারে থাকছে। হাটবাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও খাবারের দাম দিন দিন বেড়ে যাওয়ায় ধুঁকছে পরিবারগুলো।

দুর্যোগ আর জলদস্যুদের উৎপাত

ট্রলার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন বলেন, গত বছর কক্সবাজার উপকূলে একটি ঘূর্ণিঝড় ও ১৫টির মতো লঘুচাপ, নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়েছিল। এর প্রভাবে সাগর প্রচণ্ড উত্তাল হয়ে পড়া এবং বৈরী পরিবেশে অন্তত ২০০ দিন জেলেরা সাগরে মাছ ধরতে পারেননি। চলতি সালের তিন মাসে চারটির মতো নিম্নচাপ-নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়েছে। আবার মাছ আহরণের ওপর ২২ ও ৫৮ দিনের ( আগে ছিল ৬৫ দিন) সরকারি নিষেধাজ্ঞা জেলেদের মেনে চলতে হয়েছে। আবার বছরের অবশিষ্ট সময় সাগরের পরিবেশ ঠিক থাকলেও মাছ পাওয়া যাচ্ছে না।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি যোগ হয়েছে জলদস্যুদের উৎপাতও। কক্সবাজার ফিশিংবোট মালিক সমিতির তথ্য মতে, গত ১৫-২০ দিনে বঙ্গোপসাগরে ১৫টির বেশি ট্রলার জলদস্যুদের লুটপাটের শিকার হয়েছে। একাধিক ট্রলার নিয়ে জলদস্যুরা সাগরে নেমে অপেক্ষায় থাকে-কখন গভীর সাগর থেকে মাছ ধরে ট্রলার ঘাটে ফিরছে। তখন মাছ ধরার ট্রলার ও জেলেদের জিম্মি করে আহরিত মাছ, জাল-জ্বালানি ও ইঞ্জিন লুট করে জেলেদের সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। দস্যুদের গুলি ও পিটুনিতে আহত হন ২৮ জন জেলে। গত দুই সপ্তাহে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড পৃথক অভিযান চালিয়ে অন্তত ৪৫ জন জেলেকে উদ্ধার করেছে।

ফিশিংবোট মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক আহমদ বলেন, ২০২৩ সালের মার্চ মাসে সাগরে ডাকাতি করতে গিয়ে ১০ জলদস্যুর মৃত্যু ঘটে। এরপর কয়েক মাস জলদস্যুদের তৎপরতা বন্ধ ছিল। বর্তমানে কক্সবাজার, টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া উপকূলে লুটপাটে জড়ায় সাতটি দস্যু বাহিনী।