ঝড়ে ভেঙে পড়েছে ঘর, তবু লেখাপড়া থামায়নি অদম্য তিন কন্যা

জন্ম থেকেই এক চোখে দেখতে পান না রোকেয়া বেগম (৪০)। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তাঁর স্বামী দিল মোহাম্মদও (৬৭) পাঁচ বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় একটি পা হারিয়েছেন। সম্প্রতি টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে তাঁদের মাটির ঘরের দেয়াল ধসে পড়েছে। ছেঁড়া পলিথিনে ঘেরা সেই ভাঙা ঘরেই এখন চার মেয়েকে নিয়ে মানবেতর জীবন কাটছে এই দম্পতির। তবে হার মানতে নারাজ মেয়েরা। এমন পরিস্থিতিতেও লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে তারা।

বন্যায় ধসে পড়া ঘরের সামনে চার মেয়েসহ রোকেয়া বেগম। গতকাল দুপুরে কক্সবাজারের রামুতেছবি-প্রথম আলো

জন্ম থেকেই এক চোখে দেখতে পান না রোকেয়া বেগম (৪০)। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তাঁর স্বামী দিল মোহাম্মদও (৬৭) পাঁচ বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় একটি পা হারিয়েছেন। সম্প্রতি টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে তাঁদের মাটির ঘরের দেয়াল ধসে পড়েছে। ছেঁড়া পলিথিনে ঘেরা সেই ভাঙা ঘরেই এখন চার মেয়েকে নিয়ে মানবেতর জীবন কাটছে এই দম্পতির।

রোকেয়া ও দিল মোহাম্মদ দম্পতি কক্সবাজারের রামু উপজেলার গর্জনিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা। ৪ জুলাই থেকে টানা ১০ দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বাঁকখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে রামু উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের ২৩টি গ্রাম প্লাবিত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হন অন্তত ৭০ হাজার মানুষ। ওই সময় পাহাড়সংলগ্ন সরকারি খাসজমিতে নির্মিত রোকেয়া বেগমের মাটির ঘরের তিন পাশের দেয়াল ধসে পড়ে।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিন দেখা যায়, ঘরের তিন পাশের মাটির দেয়াল ধসে পড়ে রয়েছে। ছেঁড়া পলিথিনের ছাউনি দিয়ে টপটপ করে বৃষ্টির পানি পড়ছে। ভেতরে ভেজা কাপড়, বই-খাতা আর অল্প কিছু আসবাবপত্র গাদাগাদি করে রাখা। রান্না করার মতো শুকনা জায়গা নেই। বৃষ্টি থামলে মেয়েরা উঠানে পলিথিন বিছিয়ে পড়ার চেষ্টা করে।

‘পঙ্গু হয়ে ঘরের কোণে পড়ে থাকি। মেয়েরা পড়তে চায়; কিন্তু বাবা হিসেবে কিছুই করতে পারছি না।’
দিল মোহাম্মদ, বাসিন্দা, রামু, কক্সবাজার,

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দিল মোহাম্মদ অটোরিকশাচালক ছিলেন। পাঁচ বছর আগে তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় পা হারান। এখন তিনি চলাচল করতে পারেন না। রোকেয়া বেগমের আয় দিয়েই মূলত সংসার চলে। তিনি মানুষের খেতখামারে কাজ করে দৈনিক ৫০০ টাকা আয় করেন। এ টাকা দিয়েই মেয়েদের পড়ালেখার খরচসহ সংসার চালান। তবে চলতি মাসে তিনি তেমন কাজ করতে পারেননি।

ঘর ধসে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাইরে পাটি বিছিয়ে পড়তে বসেছে রোকেয়া বেগমের মেয়েরা
ছবি: প্রথম আলো

রোকেয়া বেগম প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের ছয় মেয়ের মধ্যে বড় দুজন বিয়ে করে আলাদা থাকেন। বন্যার পর গর্জনিয়া ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পাঁচ কেজি চাল, ডাল, তেল, আলু, পেঁয়াজসহ নগদ পাঁচ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এরপরও অনেকের থেকে কিছু আর্থিক সহযোগিতা পেয়েছেন। তবে এ টাকায় স্থায়ী একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই হচ্ছে না।

রোকেয়ার এক মেয়ে উম্মে হাবিবা এখন স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। আর বাকি তিন মেয়ের মধ্যে উম্মে সালমা (৯) পঞ্চম ও জান্নাতুল মাওয়া (৬) নার্সারিতে পড়ে। সবার ছোট মেয়ে আঁখি আক্তারের বয়স এখন চার বছর। পরিস্থিতি যেমনই হোক, তিন মেয়ে বই নিয়ে বসে প্রতিদিন।

রোকেয়ার এক মেয়ে উম্মে হাবিবা এখন স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। আর বাকি তিন মেয়ের মধ্যে উম্মে সালমা (৯) পঞ্চম ও জান্নাতুল মাওয়া (৬) নার্সারিতে পড়ে। সবার ছোট মেয়ে আঁখি আক্তারের বয়স এখন চার বছর।

মেয়েদের দিকে তাকিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে রোকেয়া বেগম বলেন, ‘জন্ম থেকে আমার এক চোখ নষ্ট, রোদে গেলে ভালো চোখেও ঝাপসা দেখি। তাতে আফসোস নেই। কিন্তু মা হয়ে ছোট মেয়েদের দুঃখকষ্ট সহ্য করতে পারি না। মেয়েরা পড়তে চায়। নিজ থেকেই পড়ে। আমি বইও কিনে দিতে পারি না। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়।’

স্বামী দিল মোহাম্মদ বলেন, ‘পঙ্গু হয়ে ঘরের কোণে পড়ে থাকি। মেয়েরা পড়তে চায়; কিন্তু বাবা হিসেবে কিছুই করতে পারছি না।’

জানতে চাইলে রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিল্লুর রহমান বলেন, ‘রোকেয়া বেগমের পরিবারটির বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে। প্রতিবন্ধী ভাতা, নিরাপদ বাসস্থান ও মেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আশা করি দ্রুত সমাধান হবে।’