রংপুর নগরের শহীদ জররেজ মার্কেটের একটি দোকানে বসেন ওমর শরীফ। দোকানটি তাঁর না। অন্যের দোকানে ভাগেজোকে বসেন। দোকানজুড়ে বইয়ের স্তূপ। বেশির ভাগ বই বাংলা সাহিত্যের প্রধান লেখকদের। রয়েছে বিদেশি লেখকদের বইও। গল্পসমগ্র, উপন্যাস, কবিতা ও আত্মজীবনীমূলক বইও রয়েছে তাঁর সংগ্রহে। এসব বইয়ের অধিকাংশ ওমর শরীফের পড়া।

ওমর শরীফ জানালেন, ২০০১ সাল থেকে নিজের বই পড়ার আগ্রহটা অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পুরোনো বই সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। রংপুরে কম দামি বইয়ের মার্কেটে তাঁর দীর্ঘদিনের পরিচিত এক ব্যক্তি রহুল আমিন নিজের দোকানের একটি অংশ ছেড়ে দেন। তা-ও আবার বিনা মূল্যে। সেখানেই তিনি গড়ে তুলেছেন পুরোনো বইয়ের ভান্ডার।

এরপর শুরু হয় পাঠকের সঙ্গে তাঁর বই লেনদেনের সম্পর্ক। রংপুর সিটি করপোরেশনের উল্টো দিকে শহীদ জররেজ মার্কেটে ঢুকলেই হাতের ডান দিকে চোখে পড়বে কম দামি বইমেলা নামের দোকান। দোকানের ভেতরে এককোণে বইয়ের মধ্যে ওমর শরীফ বসে থাকেন। মাথার চুল ধবধবে সাদা। এই বয়সেও তিনি প্রতিদিন পাঠকের মধ্যে সামান্য টাকায় ভাড়ার বিনিময়ে জ্ঞানের আলোকশিখা বিলিয়ে চলেছেন।

বইপ্রেমী ওমর শরীফের ভান্ডারে প্রায় পাঁচ হাজার বই রয়েছে। শুরুতে মাত্র দুই টাকা ভাড়ার বিনিময়ে বই পাঠে উদ্বুদ্ধ করতে নেমে পড়েন। বইয়ের ভাড়া প্রকারভেদে ১০ থেকে ৫০ টাকা করা হয়েছে এখন। কিশোর, তরুণ থেকে শুরু করে সব বয়সের পাঠকই তাঁর কাছ থেকে বই নিয়ে পড়েন। তবে আগের মতো দোকানে পাঠকের ভিড় নেই। তথ্যপ্রযুক্তির প্রবাহে পাঠকের হাতের মুঠোয় বই পৌঁছালেও, হতাশ নন ওমর শরীফ।

শৈশবে তিনি রংপুর শহরের মুলাটোল পাঠশালায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়েছেন। এরপর জিলা স্কুলে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর আর স্কুলে যাওয়া হয়নি। ওমর শরীফ বলেন, জীবিকার প্রয়োজনে শুরুতে কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেছিলেন। কিন্তু অর্থসংকটে তা বেশি দিন চালিয়ে নিতে পারেননি। এরপর কাজ নেন পণ্য উৎপাদনকারী একটি প্রতিষ্ঠানে।

চাকরি করা অবস্থায় বইয়ের নেশায় পুরোনো বই সংগ্রহের পেছনে ছুটতে গিয়ে চাকরিটা খোয়ান। আবার ফিরে আসেন বইয়ের জগতে। বর্তমানে মুলাটোল এলাকাতেই পরিবার নিয়ে আছেন ওমর। স্ত্রী ও দুই ছেলে রয়েছে। এর মধ্যে একজন ব্যাংকে চাকরি করেন। অন্যজন বাড়িতে থাকেন। বইভাড়া আর বিক্রি থেকে সামান্য যে আয় হয়, তাতেই কোনোরকমে সংসার চলছে।

বইভাড়া দেওয়ার কার্যক্রমের শুরুটা নিয়ে ওমর শরীফ বলেন, শুরুতে পুরোনো বইভাড়ার বিষয়টি ছিল রমরমা। কিন্তু এখন অনেকখানি ভাটা পড়েছে। পুরোনো এসব বইয়ের দাম মূল্যতালিকা থেকে অর্ধেক ধরা হয়। এই অর্ধেক টাকা জামানত হিসেবে জমা দিয়ে যে কেউ বই নিয়ে যেতে পারেন। বইটি ফেরত দেওয়ার সময় জামানতের পুরো টাকাই ফেরত দেওয়া হয় পাঠককে।

তাঁর কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া বই কেউ ফেরত দেননি, এমন ঘটনা খুব কমই হয়েছে। অধিকাংশ পাঠকই ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে বই ফেরত দিয়ে নতুন করে বই নিয়ে যান বলে জানালেন তিনি।

বই সংগ্রহের বিষয়ে ওমর শরীফ জানালেন, একসময় রংপুর শহরের প্রধান প্রধান বইয়ের দোকানের সামনে ঘুরতেন। সেখানে পাঠ্যপুস্তকের বাইরে বইপ্রেমী কেউ এলে পুরোনো বই বিক্রি করবেন কি না, জানতে চাইতেন। কোথাও সন্ধান পেলে ছুটে যেতেন। কম দামে বই কিনে আনতেন। আবার পুরোনো কাগজ বিক্রেতা বা ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকেও বই কিনতেন। এভাবে সংগ্রহ করতে করতে বইয়ের এই ভান্ডার গড়ে তোলেন।

শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ ভাড়ার বিনিময়ে তাঁর বইয়ের পাঠক। আগে দিনে ৫০-৬০ জনের মতো পাঠক মিললেও, এখন তা কমে এসেছে। বর্তমানে প্রতিদিন ১৫-২০ জন পাঠক বই আদান-প্রদান করেন। কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থী আলী আহসান বলেন, কয়েক বছর ধরে তাঁর কাছ থেকে বই নিয়ে পড়ছেন। বইয়ের অর্ধেক মূল্য জমা দিয়ে ভাড়ার বিনিময়ে বই নিয়ে আসেন। এক সপ্তাহ পর আবার ফেরত দিয়ে নতুন বই নেন।

যাঁর সহযোগিতায় শহীদ জররেজ মার্কেটে ওমর শরীফের ঠাঁই হয়েছে, তিনি কম দামি বইমেলা দোকানের মালিক রুহুল আমিন। সম্প্রতি তিনি মারা গেছেন। এখন তাঁর ছেলেরা বইয়ের ব্যবসা সামলান। তাঁদের একজন রাজু আহমেদ। তিনি বলেন, ‘বই পড়ার আগ্রহ দেখে আমার বাবা তাঁকে দোকানের একটি অংশ বিনা মূল্যে দিয়েছেন। সেখানে তিনি নিজে বই পড়েন এবং ভাড়াও দেন। প্রতিদিনই সেখানে পাঠক আসছেন। ভালো বই সম্পর্কে জানেন এবং সেগুলো পড়তে উৎসাহিত করেন।’

রংপুরের সংস্কৃতিকর্মী মাহমুদ নাসির বলেন, ‘দীর্ঘদিন থেকে দেখে আসছি ভাড়ার বিনিময়ে বিভিন্ন লেখকের বই পাঠকের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন তিনি। এটি একটি মহৎ উদ্যোগ। এমন কাজ কজনই বা করেন? তাঁর কাছ থেকে আমিও অনেক বই পড়েছি। অনেক দুর্লভ বইও তাঁর কাছে পাওয়া গেছে। ডিজিটাল যুগে মানুষের বই পড়ার অভ্যাস কমে গেলেও তিনি এখনো এই কাজটি করেই চলেছেন।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন