জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ১ বছর
‘এত রোগী আসবেন ভাবতে পারিনি, চারদিকে কেবল চিৎকার-আহাজারি’
বেলা সাড়ে ১১টা থেকে চমেক হাসপাতালে আহত ব্যক্তিদের আনা শুরু হয়। কেউ মাথায়, কেউ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে আসেন। কেউ আসেন অজ্ঞান অবস্থায়।
‘আন্দোলনে আহত ব্যক্তিদের ১৬ জুলাই থেকে হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি ওয়ার্ডে সেবা দিচ্ছিলাম। যখনই বেশি হতাহত আসছিলেন, আমরা ওই ওয়ার্ডে গিয়ে কাজ করেছি। তবে ৪ আগস্ট একটা ভয়াবহ দিন। ওই দিন এত রোগী আসবেন ভাবতে পারিনি, চারদিকে কেবল চিৎকার-আহাজারি। এর মধ্যে সেবা দিতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খেয়েছি আমরা।’
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগে এফসিপিএস কোর্সে অধ্যয়নরত চিকিৎসক মো. মিজানুর রহমান এভাবেই গত বছরের ৪ আগস্টের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন।
সরকার পতনের এক দফা দাবিতে গত বছরের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে চট্টগ্রাম নগরের নিউমার্কেটে ছাত্র-জনতার কর্মসূচি ছিল। আগে থেকে এই কর্মসূচি ঠেকানোর ঘোষণা দিয়েছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলো। একটি সংঘর্ষ আসন্ন ছিল, তা নগরবাসী টের পেয়েছিলেন আগেই।
সকাল থেকেই হাজার হাজার ছাত্র-জনতা সেখানে জড়ো হন। তাঁদের হটাতে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরাও বলপ্রয়োগ শুরু করেন। বেলা ১১টার পর থেকে প্রচণ্ড গোলাগুলি শুরু হয়। সেই সঙ্গে উভয় পক্ষে পাথর নিক্ষেপ চলতে থাকে। কেউ গুলি, কেউবা পাথরে আহত হয়ে পড়ে যান। কেউবা প্রাণভয়ে ছুটতে শুরু করেন।
সকাল থেকেই হাজার হাজার ছাত্র-জনতা সেখানে জড়ো হন। তাঁদের হটাতে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনীর পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরাও বলপ্রয়োগ শুরু করেন। বেলা ১১টার পর থেকে প্রচণ্ড গোলাগুলি শুরু হয়। সেই সঙ্গে উভয় পক্ষে পাথর নিক্ষেপ চলতে থাকে। কেউ গুলি, কেউবা পাথরে আহত হয়ে পড়ে যান। কেউবা প্রাণভয়ে ছুটতে শুরু করেন।
বেলা সাড়ে ১১টা থেকে চমেক হাসপাতালে আহত ব্যক্তিদের নিয়ে আসা শুরু হয়। কেউ মাথায়, কেউ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে আসেন। কাউকে আনা হয় অজ্ঞান অবস্থায়। চিকিৎসক মিজানুর রহমান ওই দিন সকাল থেকে চমেক হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি বিভাগে ছিলেন।
মিজানুর রহমান বলেন, ‘আহত ব্যক্তিরা হাসপাতালের ওসেক (ওয়ান–স্টপ ইমার্জেন্সি কেয়ার) হয়ে ক্যাজুয়ালটিতে চলে আসেন। একের পর এক আহত ব্যক্তি আসতে থাকেন। প্রাথমিক কাজ ছিল তাঁদের ইনজুরি শনাক্ত করে সেই অনুযায়ী সেবা দেওয়া। সঙ্গে সঙ্গে ওয়ার্ডের অস্ত্রোপচার কক্ষে তাঁদের ঢোকানো হচ্ছিল। যাঁদের ফ্র্যাকচার ছিল, তাঁদের প্লাস্টার দেওয়া, কাউকে সেলাই দেওয়া, আবার কারও জরুরি অস্ত্রোপচার চলছিল সমানতালে।’
মিজানুর রহমান বলেন, ‘রোগীর চাহিদা অনুযায়ী সেখান থেকে অর্থোপেডিক, নিউরো সার্জারি ও জেনারেল সার্জারি বিভাগেও পাঠানো হচ্ছিল। মেঝেতেও ছিলেন রোগী। রোগীর পাশাপাশি তাঁদের স্বজন ও বন্ধুবান্ধবে ভর্তি ছিল পুরো হাসপাতাল। সবাই আহত ব্যক্তিদের সেবায় এগিয়ে আসছিলেন।’
এত রোগীর কারণে সরকারিভাবে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যান্ডেজ ও ওষুধপত্র দেওয়া অসম্ভব ছিল। ফলে আমরা চিকিৎসকেরা তাৎক্ষণিকভাবে বাইরে থেকে ওষুধপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী কিনে আনতে আহত ব্যক্তিদের সহযোগিতা করি; কিন্তু বেলা চারটার দিকে আওয়ামী লীগের বাহিনী এসে আমাদের ওয়ার্ড থেকে বের করে দেয়মো. মিজানুর রহমান, চিকিৎসক
হাসপাতাল সূত্র জানায়, সেদিন আহত প্রায় ২০০ জনকে সেবা দেওয়া হয়। তবে তাঁদের অনেকের তথ্য নিবন্ধনও করা যায়নি। প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন অনেকে। যাঁরা বুলেটে আহত হন; কিংবা হাত–পা ভেঙেছে, তাঁদের দীর্ঘ চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। মাথায় আঘাতপ্রাপ্তদেরও হাসপাতালে দীর্ঘদিন থাকতে হয়।
সেদিনের স্মৃতিচারণা করে মিজানুর রহমান বলেন, ‘এ পরিস্থিতি ছিল একেবারে অপ্রত্যাশিত। তাই এত রোগীর কারণে সরকারিভাবে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যান্ডেজ-ওষুধপত্র দেওয়া অসম্ভব ছিল। ফলে আমরা চিকিৎসকেরা তাৎক্ষণিকভাবে বাইরে থেকে ওষুধপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী কিনে আনতে আহত ব্যক্তিদের সহযোগিতা করি; কিন্তু বেলা চারটার দিকে আওয়ামী লীগের বাহিনী এসে আমাদের ওয়ার্ড থেকে বের করে দেয়।’
দিনটি নিদারুণ অভিজ্ঞতার জানিয়ে মিজানুর রহমান বলেন, হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ডবয় থেকে শুরু করে সব কর্মী আহত ব্যক্তিদের সেবা দিতে সচেষ্ট ছিলেন। সবার সহযোগিতায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
মিজানুর রহমান বলেন, সেদিন ক্যাজুয়ালটি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ঋভুরাজ চক্রবর্তী, সহকর্মী দিদারুল আলম, মিনহাজুল ইসলাম, রিয়াজুল, মইনসহ হাসপাতালে কর্মরত অনেক চিকিৎসক আহত ব্যক্তিদের সেবায় এগিয়ে এসেছিলেন।