কক্সবাজারে উচ্ছেদ অভিযান
ঈদের ছুটিতে সৈকতের নতুন রূপ দেখবেন পর্যটকেরা
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত তিন দিনে উচ্ছেদ হয়েছে ৬৩০টি দোকান-প্রতিষ্ঠান। অবৈধ স্থাপনা না থাকায় খোলামেলা চেহারা পাচ্ছে সৈকত। এতে সৈকতের হারানো সৌন্দর্য যেমন পুনরুদ্ধার হচ্ছে, তেমনি ফিরছে পরিবেশের ভারসাম্য।
কক্সবাজার সৈকত দখল করে গড়ে ওঠা ভাসমান দোকান, স্থাপনা উচ্ছেদ শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে সৈকতের অনেক এলাকার চেহারা পাল্টে গেছে। ভাসমান দোকান সরে যাওয়ায় সড়ক থেকে দৃষ্টিগোচর হচ্ছে সৈকতের বালিয়াড়ি, আছড়ে পড়া নীল ঢেউ। সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে এবার মাঝপথে অভিযান বন্ধের সুযোগ নেই। ঈদের ছুটিতে তাই পর্যটকেরা সৈকতের নতুন রূপ দেখতে পাবেন বলে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশা প্রকাশ করেছেন।
সুগন্ধা পয়েন্টের মসজিদ থেকে দক্ষিণ দিকে ৭০০ থেকে ৮০০ মিটার এলাকায় সৈকতের মুখেই ছিল অবৈধ দোকানপাট। এ কারণে সৈকতটি ঘিঞ্জি হয়ে পড়েছিল। গতকাল রোববার বিকেলে গিয়ে দেখা যায়, সৈকতের ওই এলাকা খোলামেলা চেহারা পেয়েছে। নেই কোনো দোকানপাট।
কক্সবাজার হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, প্রতিবছর কক্সবাজারে ঘুরতে আসেন আসেন ৬০-৭০ লাখ পর্যটক। বেশির ভাগ পর্যটক একবারের জন্য হলেও সৈকতে আসেন। পর্যটকেরা সৈকতে নামার সময় বালিয়াড়িতে ঝুপড়ি দোকানের বস্তি দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। সেখানে নানা অপরাধও ঘটে। ঝুপড়ি মুক্ত হওয়ায় এখন সৈকতের চেহারা পাল্টে গেছে। এতে পর্যটকেরা নতুন রূপ দেখতে পাবেন কক্সবাজারের। পাশাপাশি সমুদ্রের দূষণও কমবে।
তিন দিনে ৬৩০ দোকান উচ্ছেদ
কক্সবাজার সৈকতের সুগন্ধ পয়েন্টের বালিয়াড়িতে স্থাপিত অন্তত ৫০০ দোকানসহ স্থাপনা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। গতকাল রোববার বেলা তিনটার আগে দখলদারেরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে দোকানপাট ও মালামাল সরিয়ে নেন। এর আগের দুই দিনে উচ্ছেদ করা হয় ১৩০টি স্থাপনা।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়ি দখল করে ঝুপড়ি দোকান ও নানা অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ অনেক বছরের পুরোনো সমস্যা। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দখলদারদের তৎপরতা বাড়ে, নতুন নতুন দোকান নির্মিত হয়। মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চলে। তা একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায়। এভাবে বছরের পর বছর সৈকতে কোটি টাকার বাণিজ্য চললেও পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির বিষয়টি উপেক্ষিতই থেকে যায়।
অবৈধ স্থাপনাসহ মালামাল নিজ উদ্যোগে সরিয়ে নিতে জেলা প্রশাসন দখলদার ব্যবসায়ীদের গতকাল সকাল ১০টা পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের নির্দেশনা ছিল এক সপ্তাহের মধ্যে সৈকতে বালিয়াড়িতে স্থাপিত দোকানপাটসহ সব স্থাপনা উচ্ছেদ করার। নির্দেশনা অনুযায়ী বৃহস্পতিবার থেকে জেলা প্রশাসন অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে।
প্রথম দিন বৃহস্পতিবার সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে ৩৩টি দোকান উচ্ছেদ করা হয়। দ্বিতীয় দিন শুক্রবার সুগন্ধা সৈকত ও আশপাশের জায়গা থেকে আরও ৯৭টিসহ মোট ১৩০টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। তৃতীয় দিন শনিবার দুপুরে সুগন্ধা পয়েন্টে অভিযানে নামে জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে যৌথ বাহিনী। এ সময় কয়েক শ নারী-পুরুষ উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন। শুরুতেই মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়ায় ব্যবসায়ী ও প্রশাসন। এ সময় দোকানপাটের বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। বিকেলে দখলদারদের অনুরোধে বালিয়াড়ির সব স্থাপনা নিজ উদ্যোগে সরিয়ে নেওয়ার শর্তে উচ্ছেদ অভিযান স্থগিত করা হয়।
গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে জেলা প্রশাসনের লোকজন উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার জন্য সুগন্ধ সৈকতে গেলে দখলদার ব্যবসায়ীরা জড়ো হয়ে কার্যক্রম ঠেকানোর চেষ্টা চালান এবং বালিয়াড়িতে স্থাপিত স্থাপনা রেখে দেওয়ার পাঁয়তারা শুরু করেন। দুপুর ১২টার দিকে জেলা প্রশাসনের আরও কর্মকর্তা, সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও আনসারের সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন এবং স্থাপনা সরিয়ে নিতে অনুরোধ জানিয়ে মাইকিং করা হয়। এরপর দৃশ্যপট পাল্টে যায়। দখলদার ব্যবসায়ীরা নিজ উদ্যোগে দোকানপাটসহ অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নিতে রাজি হন। বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত বালিয়াড়ি থেকে পাঁচ শতাধিক দোকান সরিয়ে নেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পর্যটন শাখার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনজু বিন আফগান বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনায় পরিচালিত তিন দিনের অভিযানে মোট ৬৩০টি দোকানপাটসহ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া বালিয়াড়িতে আবার স্থাপনা নির্মাণ করতে দেওয়া হবে না।
আবার দখলের আশঙ্কা
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়ি দখল করে ঝুপড়ি দোকান ও নানা অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ অনেক বছরের পুরোনো সমস্যা। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দখলদারদের তৎপরতা বাড়ে, নতুন নতুন দোকান নির্মিত হয়। মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চলে। তা একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায়। এভাবে বছরের পর বছর সৈকতে কোটি টাকার বাণিজ্য চললেও পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির বিষয়টি উপেক্ষিতই থেকে যায়। এমনকি আইন ও আদালতের নির্দেশনাও মানা হয় না। পরিবেশকর্মীরা বলছেন, এবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কঠোর নির্দেশের কারণে এই অভিযান শুরু করেছে জেলা প্রশাসন। তবে প্রশাসন শিথিলতা দেখালে আবারও অবৈধ দোকানপাট বসবে।
বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের তথ্যমতে, শহরের নাজিরারটেক থেকে টেকনাফ পর্যন্ত প্রায় ৯০ কিলোমিটার সৈকতের ৩৫টি পয়েন্টে অবৈধ দখল–বাণিজ্য চলে। এসব অবৈধ দোকান–প্রতিষ্ঠান উচ্ছেদ করলেও আবার বসে যায়।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি এইচ এম এরশাদ ও সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ বলেন, তিন দশক ধরে সুগন্ধা, লাবণী ও কলাতলী পয়েন্টের বালিয়াড়ি দখল করে পাঁচ শতাধিক দোকানপাট নির্মাণ করে কোটি টাকার বাণিজ্য করা হচ্ছে। সরকার পরিবর্তন হলে দোকানপাটের মালিকানাও পরিবর্তন হয়। উচ্ছেদও হয়। কিন্তু আবার সৈকত দখল করে দোকান গড়ে ওঠে। প্রতিবেশ সংকটাপন্ন সৈকতে নির্মিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা আছে। সে কারণে ভবিষ্যতে কোনো দখলদারকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।
‘কার্ড বাণিজ্যের’ অভিযোগ
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তিন দশক আগে ‘বিচ ম্যানেজমেন্ট’ কমিটি গঠন করা হয়। পদাধিকার বলে কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক। সরকার পরিবর্তন হলে কমিটির কিছু সদস্য পরিবর্তন হয়। মূলত ক্ষমতাসীন দলের নেতারা কমিটিতে যুক্ত হন। এবার কমিটি এখনো পুনর্গঠন করা হয়নি।
আওয়ামী লীগের আমলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের নামে পাঁচ শতাধিক ‘কার্ড’ (পরিচয়পত্র) দিয়েছিল বিট ম্যানেজমেন্ট কমিটি। অভিযোগ রয়েছে, কার্ডধারীদের বেশির ভাগ বহিরাগত। স্থানীয় বাসিন্দারা সে কার্ড ভাড়া নিয়ে সৈকতে দোকান খুলে ব্যবসা করেন। প্রতিবছর ১০ হাজার টাকার জমা দিয়ে ওই ‘কার্ড’ নবায়ন করতে হয়। কিন্তু কার্ডধারীরা তা অন্যদের কাছে ভাড়া দেন ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে।
কার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে ১৪টি শর্ত বেঁধে দিয়েছে বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি। উল্লেখযোগ্য শর্তগুলো হচ্ছে, কার্ড বা পরিচয়পত্র হস্তান্তর করা যাবে না। নির্ধারিত স্থান ছাড়া অন্য কোথাও ব্যবসা পরিচালনা করা যাবে না। পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না। কিন্তু এসব শর্তের বেশির ভাগ দোকানিরা মানেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইব্রাহিম খলিল মামুন বলেন, প্রতিবছর কার্ড বাণিজ্য থেকে পাওয়া যায় অন্তত ২৫ কোটি টাকা। এই টাকা কোথায় ব্যয় হয়, তা কেউ জানে না। বিভিন্ন সময় হিসাব চেয়েও পাওয়া যায়নি। তবে বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি সূত্র জানায়, সৈকত রক্ষণাবেক্ষণ, আলোকায়নসহ নানা কাজে এই অর্থ ব্যয় হয়।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী সুগন্ধা পয়েন্টে স্থাপনাসমূহ উচ্ছেদ করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে টেকনাফ পর্যন্ত ১২০ কিলোমিটার সৈকতের সব স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে।
পরিবেশবিষয়ক সংগঠন সেভ দ্য কক্সবাজার সভাপতি তৌহিদ বেলাল বলেন, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে একটি চক্র কার্ড বাণিজ্যে নেমেছে। চিহ্নিত দখলবাজ চক্র উচ্ছেদের বিরোধিতা করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চক্রান্ত চালাচ্ছে। সমুদ্র পরিবেশ রক্ষা করতে হলে কার্ড বাণিজ্য বিলুপ্ত করতে হবে।