৬৫ বছর বয়সে তেলের লাইনে পৌনে সাত ঘণ্টা অপেক্ষা

জ্বালানি তেলের জন্য দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। আজ সোমবার সকালে রাজশাহী নগরের সাগরপাড়া এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

আলতাফ হোসেনের বয়স ৬৫ বছর। তাঁর এখন কোনো পেশা নেই। সারা দিনের কাজ হলো নাতিকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া–আসা। তিনি সেই কাজ মোটরসাইকেলেই করেন। কিন্তু মোটরসাইকেলের জ্বালানি তেল শেষ। তেল নিতে রাত পৌনে তিনটার দিকে রাজশাহী নগরের সাগরপাড়া এলাকার মেসার্স আফরিন ফিলিং স্টেশনের পাশে লাইনে দাঁড়ান। সকাল সাড়ে নয়টার দিকে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তিনি তখন পাম্পের প্রায় কাছাকাছি এসেছেন এবং নিশ্চিত হয়েছেন ৫০০ টাকার তেল পাবেন।

রাজশাহী নগরের পেট্রলপাম্পগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণ পেট্রল ও অকটেন সরবরাহ না থাকায় এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। মেসার্স আফরিন ফিলিং স্টেশনে গতকাল রোববার সকাল আটটা থেকে তেল দেওয়া হচ্ছে। পাম্পের পেট্রল শেষ হয়ে গেছে, শুধু অকটেন দেওয়া হচ্ছে। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, একপাশে মোটরসাইকেল, অপর পাশে মাইক্রোবাসের দীর্ঘ সারি। আজ সোমবার সকালে এই পাম্পের সামনে মোটরসাইকেলের সারি প্রায় দেড় কিলোমিটার লম্বা হয়েছিল।

মোটরসাইকেলের সারিতে ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী বুলবুল আহমেদ। তিনি দাঁড়িয়ে আছেন রাত তিনটা থেকে। সকাল সাড়ে নয়টার দিকে তাঁর সামনে অন্তত ৫০টি মোটরসাইকেল ছিল। সামনের মোটরসাইকেলগুলো তেল নেওয়া শেষ হলে তাঁর পালা আসবে। নগরের টিকাপাড়া এলাকার সৈকত নামের এক যুবক ৫০০ টাকার তেল পেয়েছেন। কাইয়ুম ইসলাম একটি বেসরকারি কোম্পানির বিপণন বিভাগে চাকরি করেন। তাঁর তেল জরুরি। এ জন্য রাত তিনটায় এসে সারিতে দাঁড়ান। নগরের কোর্ট বাজার এলাকা থেকে রাত আড়াইটায় এসেছেন ব্যবসায়ী মো. জুয়েল রানা। তাঁরা সবাই পাম্পের কাছাকাছি চলে এসেছেন। কিন্তু মোটরসাইকেলের এই সারি দীর্ঘ হতে হতে নগরের স্বচ্ছ টাওয়ারের মোড় থেকে বাঁক নিয়ে সাগরপাড়া বটতলা পার হয়ে চলে গেছে। লাইনের শেষের দিকে গিয়ে দেখা যায়, অনেকেই মোটরসাইকেল রেখে পাশে ফোনে কথা বলছেন। কেউ কেউ অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।

পাম্পের ব্যবস্থাপক সোলাইমান কবির প্রথম আলোকে বলেন, তাঁকে গতকাল সাড়ে চার হাজার লিটার অকটেন দেওয়া হয়েছিল, একটুও পেট্রল দেওয়া হয়নি। জেলা প্রশাসকের সঙ্গে মালিক সমিতির বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত হয়েছে, প্রতিদিন সকাল আটটা থেকে তেল দিতে হবে। রাতে কোনো তেল দেওয়া যাবে না। তিনি জানান, আজ রাতে যদি আবার তেল বরাদ্দ দেওয়া হয়, তাহলে সকালে গাড়ি তেল আনতে যাবে। সেই তেল আগামী বুধবার সকাল আটটায় তিনি বিক্রি করতে পারবেন। তিনি জানান, আজ দুপুর সাড়ে ১২টায় যখন তেল শেষ হয়ে যায়, তখন প্রায় ৩০০ গাড়ি পাম্পের সামনে ছিল। চালকেরা বিক্ষোভ শুরু করেন। পুলিশ ও সংবাদকর্মীদের ডেকে তিনি গাড়ির ট্যাংকের ঢাকনা খুলে দেখিয়েছেন। তারপর লোকজন পাম্পের সামনে থেকে সরে গেছেন।

বেলা পৌনে তিনটার দিকে রাজশাহী নগরের অক্ট্রয়মোড় এলাকার নয়ান পেট্রলপাম্পের সামনে টানা রোদের মধ্যে প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ মোটরসাইকেলের সারি দেখা গেছে। মোহন নামের এক শিক্ষার্থী জানান, তিনি প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে রোদে দাঁড়িয়ে আছেন। একই কথা জানান পল্লব নামের আরেক শিক্ষার্থী।

রাজশাহী জেলা পেট্রলপাম্প মালিক সমিতির সভাপতি ও লতা ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী মমিনুল হক বলেন, চাহিদা অনুযায়ী তেল পেলে এই সমস্যা হতো না। তেল দেওয়া শুরু করলেই পাম্পের সামনে শত শত গাড়ি দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। তিনি জানান, এজেন্টদেরও তেল দেওয়া হচ্ছে না। তাঁর একটি এজেন্সি রয়েছে, কিন্তু তেল পাচ্ছেন না। ঈদের পরে ডিলার হিসেবে শুধু দুই চেম্বার (সাড়ে চার হাজার লিটার করে) তেল পেয়েছেন।