‘ছেলের অপরাধে কেন বাবা–চাচাকে পিটিয়ে হত্যা করল’

মানিকগঞ্জে পিটুনিতে হত্যার শিকার দুই ভাইয়ের বাড়িতে আত্মীয়স্বজন ও এলাকাবাসীর ভিড়। আজ শনিবার দুপুরে সদর উপজেলার বনপারিল গ্রামেছবি: প্রথম আলো

‘আমার ভাগনেরা কী দোষ করেছে? কেন দুই ভাগনেকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করতে হবে? সন্তান অপরাধ করলে তার শাস্তি হোক। কিন্তু আমার নিরপরাধ ভাগনেদের কেন হত্যা করা হলো? ছেলের অপরাধে কেন বাবা–চাচাকে হত্যা করল?’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় শিশুকে হত্যার অভিযোগে স্বজন ও স্থানীয় লোকজনের পিটুনিতে হত্যাকাণ্ডের শিকার দুই ভাই পান্নু মিয়া ও ফজলু মিয়ার খালা মোছা. রওশন আরা। আজ শনিবার দুপুর ১২টার দিকে সদর উপজেলার বনপারিল গ্রামে পান্নু মিয়ার বাড়িতে তাঁর সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়।

গত বৃহস্পতিবার রাতে বনপারিল গ্রামের দুদল মিয়ার মেয়ে আতিকা আক্তারের (৭) লাশ উদ্ধার করা হয়। শিশুটিকে শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগ ওঠে একই গ্রামের এক কিশোরের (১৫) বিরুদ্ধে। পরে অভিযুক্ত কিশোরের বাবা ইজিবাইকচালক পান্নু মিয়া ও চাচা ফজলু মিয়াকে পিটিয়ে হত্যা করেন নিহত শিশুর স্বজন ও স্থানীয় লোকজন।

শিশু আতিকাকে হত্যার ঘটনায় তার মা আরিফা আক্তার বাদী হয়ে সদর থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় পিটুনিতে নিহত দুজনসহ মোট পাঁচজনকে আসামি করা হয়। পরে গতকাল শুক্রবার রাতে ঢাকার নবাবগঞ্জ থেকে অভিযুক্ত কিশোরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তবে আজ বিকেল পর্যন্ত অভিযুক্ত কিশোরের বাবা ও চাচাকে হত্যার ঘটনায় থানায় কেউ লিখিত অভিযোগ দেননি।

আজ পান্নু মিয়ার বাড়ি গিয়ে উঠানে তাঁর খালা রওশন আরা, খালাতো বোন বিথী আক্তার ও আশপাশের গ্রামের ১০ থেকে ১২ নারীকে দেখা যায়। পান্নু মিয়ার বসতঘরে তালা ঝুলছে। উঠানের একটি বেঞ্চে বসে আছেন খালা ও স্বজনেরা। পান্নু মিয়ার স্ত্রী নারগিস আক্তার স্বামী ও দেবরের লাশ আনতে মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজের মর্গে গিয়েছেন। উঠানের এক পাশেই পড়ে আছে পান্নু মিয়ার ইজিবাইক। আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে গ্রামে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

বাড়িতে নিহত ভাগনেদের লাশ আসার অপেক্ষায় আছেন খালা রওশন আরাসহ স্বজনেরা। রওশন আরা জানান, নিহত পান্নু ও তাঁর ছেলে নাজমুল ইজিবাইক চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। সপ্তাহখানেক আগে পান্নুর বাড়িতে বেড়াতে আসেন তাঁর ভাই ফজলু মিয়া। নিহত শিশুর স্বজনেরা বাড়ি থেকে মুঠোফোনে ডেকে নিয়ে যান পান্নু, ফজলু ও নাজমুলকে। পরে শিশুকে হত্যার অভিযোগে স্বজনেরা পান্নু ও ফজলুকে পিটিয়ে হত্যা করে লাশ বাড়ির পাশের পুকুরে ফেলে দেন। পান্নুর বড় ছেলে নাজমুলকেও পিটিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। মুমূর্ষু অবস্থায় নাজমুল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

আক্ষেপ করে রওশন আরা বলেন, ‘সন্তান যদি অপরাধও করে, তাই বলে কী বাবা–চাচাকে এভাবে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করবে? আমরা এর সুষ্ঠু বিচার চাই। হত্যাকারীদের শাস্তি চাই।’

আরও পড়ুন

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বনপারিল কবরস্থানে নিহত পান্নু ও ফজলুকে দাফনের জন্য কবর খোঁড়া হচ্ছিল। করব খোঁড়ার কাজ করছিলেন পান্নুর চাচা বৃদ্ধ আবদুল খালেক ও ভায়রা মোশারফ হোসেনসহ কয়েকজন। মোশারফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সন্তান অপরাধ করলে তাকে আইনের লোকদের (পুলিশ) কাছে তুলে দিতে পারত। কিন্তু এভাবে পিটিয়ে বাবা ও চাচাকে হত্যা করা আরও বড় অপরাধ।’