সুনামগঞ্জে সংকটে ভরসার নাম ‘ব্লাড লিংক’
একসময় রক্তদানে অনেকের মধ্যে ভীতি কাজ করত। এখন সচেতনতা বেড়েছে। ব্যতিক্রম নয় সুনামগঞ্জও। জেলার তরুণদের চেষ্ঠায় বাড়ছে স্বেচ্ছায় রক্তদান। মানবিক এই কাজে বেশ কয়েকটি সংগঠন কাজ করছে। এতে যুক্ত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই তরুণ ও শিক্ষার্থী। বর্তমানে জেলায় কাজ করা সংগঠনগুলোর মধ্যে এগিয়ে আছে ‘ব্লাড লিংক’।
সংগঠনের সদস্যরা নিজেরা রক্ত দেওয়ার পাশাপাশি রক্ত সংগ্রহ করে দেন। এখন প্রতি মাসে ব্লাড লিংকের উদ্যোগে প্রায় দুই শ ব্যাগ রক্তের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। গত পাঁচ বছরে এই সংগঠনের সদস্যদের চেষ্টায় তিন হাজারের বেশি ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করে দেওয়া হয়েছে।
সুনামগঞ্জে স্বেচ্ছায় রক্তদাতা ও সংগঠনের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় এখানে শুধু সন্ধানী ডোনার ক্লাবের কার্যক্রম ছিল। এখন বেশ কিছু সংগঠন কাজ করছে। কিছু সংগঠন আছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক। আবার কিছু আছে জেলাজুড়ে, তবে রক্তের প্রয়োজনে একে অন্যকে সহযোগিতা করে থাকে। ব্লাড লিংক রক্ত সংগ্রহ করে দেওয়ার পাশাপাশি রক্তের গ্রুপ নির্ণয়, মেডিকেল ক্যাম্প, শিশুদের চিকিৎসায় সহায়তা প্রদান, বন্যায় ত্রাণ বিতরণসহ নানা কাজ করছে। এ জন্য সদস্যরা সামর্থ্য অনুযায়ী মাসিক চাঁদা দিয়ে থাকেন।
যেভাবে ব্লাড লিংকের শুরু
এই সংগঠনের কার্যক্রম শুরু হয় মো. হুমায়ুন ফারুক আলমগীর ও কামরুজ্জামান কামরুলের হাত ধরে। আলমগীর তখন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার হিসেবে জেলার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত। কামরুল ছিলেন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট হিসেবে। ২০২০ সালে করোনাকালে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসা রোগীদের রক্তের প্রয়োজন হলে তাঁরা বিভিন্নজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে রক্ত সংগ্রহ করে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। সামাজিক যোগযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে রক্তের প্রয়োজনের কথা জানাতেন।
ব্লাড লিংকের সহপ্রতিষ্ঠাতা কামরুল বলছিলেন, তখন রক্তের প্রয়োজন হলেই তাঁদের কাছে ফোন আসত। পরে দুজন মিলে সংগঠন করার চিন্তা করেন, যাতে আরও অনেককে এই কাজে যুক্ত করা যায়। এরপর ২০২০ সালের ৩ মে যাত্রা শুরু করে ব্লাড লিংক। এতে যুক্ত হন সুনামগঞ্জ শহরের অনেকে, যাঁরা নিয়মিত রক্ত দেন।
গ্রামের অনেক সাধারণ মানুষ আছেন, যাঁরা রক্তের দরকার হলে অসহায় হয়ে পড়েন। যখন এমন কারও প্রয়োজনে নিজে রক্ত দিই বা রক্ত সংগ্রহ করে দিতে পারি, তখন অন্য রকম ভালো লাগা কাজ করে।
এভাবে তাঁদের কার্যক্রম বাড়তে থাকে। তখন শহরে স্বেচ্ছায় রক্তদাতা হিসেবে তরুণ তৈয়বুর রহমানকে সবাই চিনেন। তৈয়বুর রহমানও যুক্ত হন ব্লাড লিংকে। এখন সংগঠন পরিচালনায় যুক্ত আছেন ১৭ জন। তাঁদের কাছে দুই হাজারের বেশি রক্তাদাতাদের নাম–ঠিকানা আছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত নভেম্বর পর্যন্ত ৩ হাজার ১৮৭ জনকে সংগঠনের মাধ্যমে রক্ত সংগ্রহ করে দেওয়া হয়েছে। কামরুল নিজে ২০ বার, আরেক সদস্য নাজমুল হাসান ২১ বার, সাবিহা সুলতানা ১৯ বার, তৈয়বুর রহমান ১৭ বার ও ইশতিয়াক পিয়াল ১৯ বার রক্ত দিয়েছেন।
অন্য রকম ভালো লাগা
সংগঠনের এডমিন সাবিহা সুলতানা বলছিলেন, ‘গ্রামের অনেক সাধারণ মানুষ আছেন, যাঁরা রক্তের দরকার হলে অসহায় হয়ে পড়েন। যখন এমন কারও প্রয়োজনে নিজে রক্ত দিই বা রক্ত সংগ্রহ করে দিতে পারি, তখন অন্য রকম ভালো লাগা কাজ করে। কাজটি আনন্দ নিয়েই করি।’
আলাপকালে সংগঠনের সদস্য নাজমুল হাসান ও তৈয়বুর রহমান জানান, তাঁরা শুধু সুনামগঞ্জে নয়, সিলেট এমনকি ঢাকাতেও রক্ত সংগ্রহ করে দিয়েছেন। উপজেলা থেকে কেউ যোগাযোগ করলে সেখানে থাকা সংগঠন বা ব্যক্তির সঙ্গে তাঁরা সংযোগ করে দেন।
সুনামগঞ্জে ৩০ বছর ধরে স্বেচ্ছায় রক্তদানের সঙ্গে যুক্ত শহরের হাছন নগর এলাকায় বাসিন্দা মুজাহিদুল ইসলাম (মজনু)। তিনি এখন পর্যন্ত ৬০ ব্যাগ রক্ত দিয়েছেন। তিনি বলেন, এই কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে তরুণ-তরুণীর সংখ্যাই বেশি। এখন প্রয়োজনে রক্ত পাওয়া যায়, তবে সুনামগঞ্জে ব্লাড ব্যাংক থাকলে আরও ভালো হতো।
জাতীয় স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরনোত্তর চক্ষুদান দিবসে ২ নভেম্বর সুনামগঞ্জে ব্লাড লিংকের উদ্যোগে ১১৩ জন রক্তাদাতাকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়। সম্মাননা পাওয়া বিভিন্ন সংগঠনের সদস্য ও ব্যক্তিদের মধ্যে সর্বনিম্ন ১০ থেকে সর্বোচ্চ ৭২ ব্যাগ রক্তদাতা আছেন।