শ্রুতিতে থাকলেও নেই কোনো স্মৃতিচিহ্ন

রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৯৫২ সালে গোবিন্দচরণ পার্ক ঘিরে সভা-সমাবেশ হতো। সেখানে কোনো ফলক অথবা স্মৃতিচিহ্ন স্থাপন করা উচিত।

সিলেটের ঐতিহাসিক গোবিন্দ চরণ পার্ক বর্তমানে হাসান মার্কেট হিসেবে পরিচিত। নগরের বন্দরবাজার এলাকায় সম্প্রতিছবি: প্রথম আলো

সিলেট শহরে সভা-সমাবেশ সাধারণত গোবিন্দচরণ পার্কে হতো। ভাষা আন্দোলনের সময়টাতে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠার দাবিতে এখানকার মানুষ এ পার্কেই প্রতিবাদী সভাসহ সব ধরনের কর্মসূচি পালন করেছেন। ১৯৫৮ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও পশ্চিম পাকিস্তানের বাসিন্দা আলী হাসানের তত্ত্বাবধানে এ পার্কে একটি বিপণিবিতান নির্মাণ করা হয়। এরপর এটি ‘হাসান মার্কেট’ নামে পরিচিতি পায়।

হাসান মার্কেটের অবস্থান সিলেট নগরের বন্দরবাজার এলাকায়। ব্যবসায়ীরা বলেন, পার্কের উন্মুক্ত জায়গাজুড়ে বিপণিবিতানটি নির্মাণ করা হয়েছে। নানকার বিদ্রোহ, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলনসহ সিলেটবাসীর সব ধরনের প্রতিবাদী ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে মুখর থাকা পার্কটির কোনো জায়গাই আর ফাঁকা রাখা হয়নি। ফলে এখন আর এখানে খুঁজে পাওয়া যায় না পার্কের কোনো স্মৃতিচিহ্ন।

সিলেটের কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ (কেমুসাস) বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আহমেদ নূর বলেন, কেমুসাস ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষাবিষয়ক তিনটি সভার আয়োজন করেছিল। এ প্রতিষ্ঠানের তখনকার নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিরা ভাষা আন্দোলনে সিলেটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পশ্চিম পাকিস্তানের এক নাগরিক ওই সময় জেলা প্রশাসক ছিলেন। সিলেটে ওই ব্যক্তির নামে নির্মিত বিপণিবিতান এখনো টিকে আছে—এটা একেবারেই দুঃখজনক। ভাষা আন্দোলনসহ সিলেটের যাবতীয় আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসের বিষয়টি তরুণ প্রজন্মের কাছে উপস্থাপন করার স্বার্থে স্থানটি আগের নামে ফিরিয়ে আনা উচিত। অন্তত এখানে একটা স্মৃতিফলক তো থাকা উচিত।

গোবিন্দচরণ পার্কে ভাষা আন্দোলনের সময়টাতে প্রায় প্রতিদিনই সভা-সমাবেশ হতো বলে জানিয়েছেন ভাষাসংগ্রামী মো. আবদুল আজিজ তাঁর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সিলেট বইয়ে। ১৯৫২ সালে ঢাকায় ছাত্রদের ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনার পরের দিন সিলেটের প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে তিনি তাঁর বইয়ে লিখেছেন, ‘বেলা ১১টার আগেই কর্মসূচির ঘোষণা-সংবলিত পোস্টারে শহরের দেয়াল ছেয়ে যায়। বেলা তিনটায় বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা দলে দলে গোবিন্দচরণ পার্কে (বর্তমান হাসান মার্কেট) সমবেত হতে শুরু করে। সভায় সভাপতিত্ব করেন সিলেট জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি, খেলাফত আন্দোলন খ্যাত উকিল আবদুল্লাহ বিএল। সভায় পরদিন পূর্ণ হরতাল পালনের আহ্বান জানানো হয়।’

সিলেট নগরের হাসান মার্কেটের প্রবেশমুখ
ছবি: প্রথম আলো

আবদুল আজিজ সেদিন ঘটনা জানাতে আরও লিখেছেন, ‘মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি দেওয়ান তৈমুর রাজার পদত্যাগের দাবি নিয়ে একদল প্রতিনিধি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। রাত আটটা পর্যন্ত দীর্ঘ শোভাযাত্রা গোটা শহর প্রদক্ষিণ করে। সেদিন শহর ও শহরতলির দোকানপাট বন্ধ থাকে। শাহজালালের দরগায় নামাজের পর শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়।’

সিলেটের সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীরা বলেন, রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৯৫২ সালে গোবিন্দচরণ পার্ক ঘিরেই সভা-সমাবেশ হতো। অথচ হাসান মার্কেট স্থাপিত হওয়ার পর এই পার্কের ঐতিহ্য ও ইতিহাস ধীরে ধীরে ম্লান হতে চলেছে। এখনকার প্রজন্ম এ বিষয়ে একেবারেই জানে না। এ অবস্থায় হাসান মার্কেটের কোনো একটি অংশে তখনকার ইতিহাস–খচিত কোনো ফলক অথবা স্মৃতিচিহ্ন স্থাপন করা উচিত।

এ বিষয়ে হাসান মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. রইছ আলী জানান, মার্কেটটি পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে সিলেট সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ।

সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনসহ বহু ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে আছে গোবিন্দচরণ পার্ক। তাই আগের ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে কোনো স্মৃতিফলক নির্মাণ কিংবা কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া যায় কি না, সেটি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে ভেবে দেখা হবে।’