হাসপাতালে এক্স-রে না করেই ফিরতে হলো কামরুলকে, সন্তানকে নেবুলাইজ করতে পারলেন না মিনু

রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যায় রোগীরা। গতকাল দুপুরেছবি: প্রথম আলো

দুপুর ১২টা। হাতের আঙুলে আঘাত লাগায় তা এক্স-রে করাতে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উপস্থিত হন কামরুল ইসলাম (৪৫)। কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে হাসপাতালটিতে তখন এক্স-রে করার সুযোগ ছিল না। এক্স-রে কক্ষের সামনে প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষার পরও বিদ্যুৎ না আসায় এক্স-রে না করেই চলে যান তিনি।

গত শনিবার দুপুরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কথা হয় কামরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি রায়পুর উপজেলার চরবংশী ইউনিয়নের চরমোহনা এলাকার বাসিন্দা। বেলা একটার দিকে তিনি বলেন, ‘চরবংশী থেকে এসেছি এক্স-রে করানোর জন্য। এক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও এক্স-রে করানো সম্ভব হয়নি। কখন বিদ্যুৎ আসবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই বাধ্য হয়ে ফিরে যাচ্ছি।’

শুধু কামরুল ইসলাম নন। লোডশেডিংয়ের কারণে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এভাবেই ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে সেবাপ্রত্যাশীদের। নিউমোনিয়া আক্রান্ত হয়ে শনিবার হাসপাতালটিতে ভর্তি ছিল শিশু মিনু আক্তার (৪)। মিনু আক্তারের মা মারজান বেগম বলেন, শ্বাসকষ্টে ভুগছে শিশুটি। চিকিৎসক দিনে চারবার নেবুলাইজ করতে বলেছেন। তবে লোডশেডিংয়ের কারণে সকাল থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত তিনি কেবল একবার নেবুলাইজ করতে পেরেছেন। উপজেলার কেরোয়া এলাকা থেকে চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে এসেছেন বলে জানান তিনি।

সরেজমিনে দেখা যায়, লোডশেডিংয়ের কারণে হাসপাতালে রোগ নির্ণয়ের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। সেবাপ্রত্যাশীরা নির্ধারিত কক্ষের সামনে অপেক্ষা করছেন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ফিরে যেতেও দেখা যায় অনেককে।

চর মোহনা গ্রাম থেকে তিন বছরের শিশুকে টিকা দিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসেছিলেন সেলিনা আক্তার। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় টিকা সংরক্ষণের ফ্রিজ খোলা যাচ্ছিল না। ফলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় তাঁকে। ক্ষোভ প্রকাশ করে সেলিনা আক্তার বলেন, ‘দূর থেকে কষ্ট করে বাচ্চাকে টিকা দিতে হাসপাতালে এসেছি। এসে দেখি বিদ্যুৎ নেই। ফ্রিজও খোলা যাচ্ছে না। গরমের মধ্যে বাচ্চাকে নিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। হাসপাতালে এসে যদি টিকার জন্যও এতক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কষ্টের শেষ কোথায়?’

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শনিবার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অন্তত সাতবার লোডশেডিং হয়েছে। এতে দুর্ভোগে পড়তে হয় উপজেলার দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগী ও তাঁদের অভিভাবকদের।

হাসপাতালের কর্মকর্তারা জানান, গতকাল রোববার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৭৭ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। তাঁদের মধ্যে নিউমোনিয়া আক্রান্ত ছিলেন ২৩ জন। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের শ্বাসকষ্ট কমাতে নেবুলাইজ করা জরুরি হলেও বিদ্যুৎ না থাকায় সেই সেবা নিয়মিত দেওয়া যাচ্ছে না।

জেনারেটর আছে, ডিজেল নেই

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, বিদ্যুৎ না থাকলে রোগীদের চিকিৎসাসেবা চালু রাখতে এক ব্যক্তির দান করা একটি জেনারেটর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রয়েছে। কিন্তু ডিজেলের বরাদ্দ না থাকায় সেটি প্রয়োজনের সময় চালানো যায় না।

হাসপাতালের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘জেনারেটর থাকলেও ডিজেল না থাকায় সেটি চালানো যাচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎ চলে গেলে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা থাকে না। যন্ত্রনির্ভর সব কাজ বন্ধ থাকে। এক্স-রে, প্যাথলজি ও নেবুলাইজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো দেওয়া যায় না। দুই থেকে তিন মাস ধরে লোডশেডিংয়ের কারণে এমন সমস্যা বেশি হচ্ছে।’

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে একটি আইপিএস রয়েছে। তবে দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎ না থাকলে সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। জরুরি রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু যন্ত্রপাতি বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বিদ্যুৎ চলে গেলে চিকিৎসকদের কাজ ব্যাহত হয়।

শয্যা খালি নেই। মেঝেতে শয্যা পেতে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। গতকাল দুপুরে
ছবি: প্রথম আলো

জানতে চাইলে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) মামুনুর রশিদ বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকলে চিকিৎসাসেবায় সমস্যা হয়। রোগীদের দুর্ভোগও বাড়ে। হাসপাতালে জেনারেটর আছে। কিন্তু জেনারেটর চালানোর জন্য জ্বালানি প্রয়োজন। জ্বালানি বরাদ্দ না থাকায় জেনারেটর চালানো সম্ভব হচ্ছে না। তারপরও আমরা রোগীদের সেবা দিতে সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

লোডশেডিংয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক শফিউল আলম প্রথম আলোকে বলেন, দৈনিক চাহিদার চেয়ে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। তাই লোডশেডিং হচ্ছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানানো হয়েছে।