চার আসনে বিএনপির বিশাল জয় ও দুই আসনে হারের নেপথ্যে

রাজশাহী-৬ আসনের বিএনপির বিজয়ী প্রার্থী আবু সাইদ চাঁদকে মালা পরিয়ে দিচ্ছেন জামায়াতের পরাজিত প্রার্থী নাজমুল হক। শুক্রবার বিকেলে চারঘাট উপজেলার চামটা গ্রামেছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

রাজশাহীর ছয়টি আসনের মধ্যে চারটিতে জয় পেয়েছে বিএনপি। আর দুটিতে জামায়াত। কিন্তু এই ফলাফলের পরিসংখ্যানে অবাক হয়েছেন দলগুলোর নেতা–কর্মীরাও। রাজশাহীর একটি আসনে বিএনপি প্রার্থীর দুজন ‘বিদ্রোহী’ থাকা সত্ত্বেও দলটির প্রার্থী ৭৯ হাজার ৯৮০ ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন। আবার যে দুটি আসনে জামায়াত জিতেছে তাঁদের সঙ্গে বিএনপির প্রার্থীর ব্যবধান সামান্য।

রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনে বিএনপির প্রার্থী সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছেন। এই আসনে প্রার্থী ছিলেন জেলা বিএনপির সদস্য ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪২৫ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মনজুর রহমান পেয়েছেন ৭৩ হাজার ৪৪৫ ভোট। আর বিদ্রোহী দুই প্রার্থীর ভোট প্রায় হিসাবে না আনার মতো।

নির্বাচনের দুই দিন আগেও ভোটের মাঠের বিশ্লেষণে অনেকেই বলেন, দুই ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর ভোট কাটাকাটিতে বিএনপির প্রার্থী জামায়াতের কাছে হেরে যেতে পারেন। ভোটের পরে দেখা যাচ্ছে, বিএনপির প্রার্থীর জয়ের এই ব্যবধান রাজশাহী জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি।

বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলামের সঙ্গে মাঠে ছিলেন জেলা যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক জুলফিকার রহমান। তিনি বলছেন, তাঁদের ভোটের ব্যবধান বাড়িয়েছেন নির্বাচনী এলাকার সনাতন ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রায় ৪৫ হাজার ভোটার। তাঁদের সব ধরনের নিরাপত্তার বিষয়ে আশ্বস্ত করতে পেরেছেন বিএনপির প্রার্থী। এতে তাঁদের প্রায় ৪০ হাজার ভোট বিএনপি প্রার্থী পেয়েছেন। বিএনপি প্রার্থী হেঁটে হেঁটে বাড়ি বাড়ি গিয়েছেন। এটি ভোটে জয়ের মূল কারণ। এ ছাড়া তফসিল ঘোষণার পরে জামায়াতের প্রার্থী পরিবর্তন বড় ব্যবধানের জয়ের আরেকটি কারণ হতে পারে।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন রাজশাহী-৬ (চারঘাট-বাঘা) আসনের বিএনপির প্রার্থী ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সাইদ চাঁদ। তিনি এর আগে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০২৩ সালে শেখ হাসিনাকে গোরস্তানে পাঠানোর বক্তব্য দিয়ে তিনি দেশব্যাপী আলোচিত হয়েছেন। এ জন্য দীর্ঘদিন কারাগারেও থাকতে হয়েছে তাঁকে। কারাগারে থাকা অবস্থায় তাঁর মা এবং স্ত্রীর মৃত্যু হয়। এসব কারণে এই নেতার প্রতি মানুষের সমবেদনা ছিল। এলাকায় তিনি জনপ্রিয় নেতা বলেও পরিচিত। আবু সাইদ পেয়েছেন ১ লাখ ৪৮ হাজার ৬৭২ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থী নাজমুল হককে তিনি ৫৫ হাজার ৭০৭ ভোটে হারিয়েছেন।

তৃতীয় সর্বোচ্চ ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের বিএনপি প্রার্থী দলের ত্রাণ ও পুনর্বাসনবিষয়ক সম্পাদক শফিকুল হক। তিনি জামায়াতের প্রার্থী আবুল কালাম আজাদকে ৩৮ হাজার ৩৯১ ভোটে হারিয়েছেন। তিনি দীর্ঘদিন নির্বাচনী এলাকায় নিরলস পরিশ্রম করেছেন। তাঁর ফলাফল এ রকম হবে, সেটা আগে থেকেই আন্দাজ করা যাচ্ছিল। এ বিষয়ে বিএনপির এক নেতার মূল্যায়ন—‘পরিশ্রম জিতেছে, দল জিতেছে, ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত হওয়ার পর বাদ জুমা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন রাজশাহী- (সদর) আসনের বিএনপির বিজয়ী প্রার্থী মিজানুর রহমান (মিনু)।
ছবি: প্রথম আলো

রাজশাহী সদর আসনের প্রার্থী বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, সাবেক সিটি মেয়র মিজানুর রহমানের (মিনু) জয়ে ভোটের ব্যবধান চতুর্থ সর্বোচ্চ। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৩৭০ ভোট। নিকটতম প্রার্থী জামায়াতের মহানগর আমির মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরের সঙ্গে তাঁর ভোটের ব্যবধান ২৮ হাজার ১৭৬। ২০০১ সালের নির্বাচনে মিজানুর রহমান দেশের মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর এবারের ব্যবধানে নেতা–কর্মীরা কিছুটা অবাক হয়েছেন।

তবে জামায়াত যে দুটি আসনে জিতেছে এ দুটি আসন বরাবরই বিএনপির। একটি হচ্ছে রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসন। আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত আমিনুল হকের ভাই মেজর জেনারেল (অব.) মো. শরীফ উদ্দীন। এই আসনে জামায়াতের নায়েবে আমির মো. মুজিবুর রহমান ১ হাজার ৮৮৪ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। তিনি ১৯৮৬ সালের বিএনপিবিহীন নির্বাচনে এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। স্থানীয় লোকজন বলছেন, আসনটিতে জয় পেতে জামায়াত সর্বোচ্চ শক্তি নিয়োগ করেছে।

গোদাগাড়ী বিএনপির সভাপতি আবদুস সালাম তাঁদের পরাজয়ের কারণ সম্পর্কে কিছুই ধারণা করতে পারছিলেন না। তাঁর মতে ভোট সুষ্ঠু হয়েছে। তবে জামায়াতের নারী ভোটার আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। এটি একটি কারণ হতে পারে বলে এই নেতা মনে করছেন।

রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনে জামায়াতের প্রার্থী মো. আবদুল বারী সরদার ৫ হাজার ৭৬৫ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ১৫ হাজার ২২৬ ভোট। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ডি এম ডি জিয়াউর রহমান। বিএনপির নেতারা বলছেন, প্রার্থী নির্বাচনে ভুল হওয়ার কারণে আসনটি তাঁদের হাতছাড়া হলো। এক নেতার মূল্যায়ন, ‘এই আসনে ব্যক্তি হেরেছে, বিএনপি হারেনি।’