ঝকঝকে উজ্জ্বল রোদে শীতের সকালটা যেন অন্য রকম। ঘড়ির কাঁটায় সকাল আটটা। দূরদূরান্ত থেকে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা দলে দলে উপস্থিত হতে শুরু করেন বরিশাল নগরের ঐতিহ্যবাহী ব্রজমোহন (বিএম) মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিশাল মাঠে। বরিশাল আঞ্চলিক গণিত উৎসব ঘিরে এই ভিড়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই বিদ্যালয়ের অঙ্গন শিক্ষার্থীদের কলরবে মুখর হয়ে ওঠে।
আজ শুক্রবার বরিশাল নগরের কালীবাড়ি সড়কের ঐতিহ্যবাহী বিএম স্কুলে ‘গণিত শেখো স্বপ্ন দেখো’ স্লোগানে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘ডাচ্-বাংলা ব্যাংক-প্রথম আলো গণিত উৎসব-২০২৬’–এর বরিশাল আঞ্চলিক পর্ব। বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলার প্রায় সাড়ে ৪০০ খুদে গণিতবিদ উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে আঞ্চলিক এই গণিত উৎসবে অংশ নেয়।
সকাল সাড়ে ৯টায় জাতীয় সংগীতের সঙ্গে জাতীয় পতাকা, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে গণিত উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন বিএম স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোমিন হাওলাদার, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা উত্তোলন করেন ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপক হুমায়ুন কবির এবং আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা উত্তোলন করেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খোরশেদ আলম।
অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মো. কায়কোবাদ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন প্রথম আলোর বরিশালের নিজস্ব প্রতিবেদক এম জসীম উদ্দীন। বন্ধুসভার সাবেক সভাপতি নাঈম ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক অ্যানজেলিনা শর্মির সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করে প্রথম আলো বরিশাল বন্ধুসভা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অধ্যাপক মো. কায়কোবাদ বলেন, একটি জাতিকে এগিয়ে নিতে জ্ঞান ও বিজ্ঞানের বিকল্প নেই। জ্ঞান ও বিজ্ঞানে দক্ষতা অর্জন করতে না পারলে, বিজ্ঞানমনস্ক না হলে এগিয়ে যাওয়া যায় না। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তোমরা শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের নাগরিক। তোমরা বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠানে চাকরি করবে, সম্মান ও স্বীকৃতি পাবে। এর মধ্য দিয়ে দেশকে আরও উজ্জ্বল ও সম্মানিত করবে।’
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খোরশেদ আলম বলেন, ‘এই গণিত উৎসব শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি স্বপ্ন দেখার একটি মঞ্চ। এখানে তোমরা যারা এসেছ, তারা সবাই আলাদা আলাদা সম্ভাবনা নিয়ে এসেছ। গণিত অনেকের কাছে কঠিন মনে হতে পারে, ভয়ও লাগতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ভয়কে জয় করলেই সামনে এগোনো যায়। তাই তোমরা গণিতকে পরাজিত না করা পর্যন্ত লেগে থাক।’
অনুষ্ঠানে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপক মো. হুমায়ুর কবির বলেন, ‘গণিতচর্চা ভবিষ্যতের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলে। ডাচ্-বাংলা ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণিত ও যুক্তিবোধের চর্চা ছড়িয়ে দিতে এই উৎসবের পাশে আছে। আনন্দের মধ্য দিয়ে শেখার এই আয়োজন থেকে শিক্ষার্থীরা আত্মবিশ্বাস ও অনুপ্রেরণা পাবে, এটাই আমাদের বিশ্বাস।’
অনুষ্ঠানে বিএম স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোমিন হাওলাদার বলেন, ‘গণিত উৎসবের মতো আয়োজন শিক্ষার্থীদের জন্য আনন্দের। অনেকেই গণিতে ভয় পায়, কিন্তু নিয়মিত চর্চা করলে সেই ভয় কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। আমাদের বিদ্যালয়ে এমন একটি উৎসবের আয়োজন করায় আমরা সম্মানিত বোধ করছি।’
অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক গৌতম কুমার সাহা। অতিথিরা বেলুন উড়িয়ে উৎসবের উদ্বোধন করেন। এরপর বিএম স্কুলের প্রধান শিক্ষকের হাতে ভেন্যু স্মারক তুলে দেন অধ্যাপক মো. কায়কোবাদ। পরে শুরু হয় পরীক্ষা পর্ব।
সকালে উৎসব প্রাঙ্গণে হাজির হয় বরিশাল সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসফিয়া মরিয়ম। তাসফিয়া জানায়, গণিত তাঁর খুব প্রিয় বিষয়। এখানে এসে তাঁর খুব ভালো লাগছে।
ছোট্ট সারাফ নাওয়াত বরিশাল জাহানারা ইজরাইল স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। শীত উপেক্ষা করে সকালেই বাবার হাত ধরে উৎসবে অংশ নিতে বিএম স্কুলে আসে। এই শিক্ষার্থী জানায়, যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ—এই অঙ্কগুলো তার কাছে খুবই সহজ। অঙ্ক কষতেও তার ভালো লাগে।
উৎসব প্রাঙ্গণে বসেছে তৌফিক প্রকাশনী, আদর্শ প্রকাশনী, স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশনীর ম্যাথ স্টল। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা ঘুরে ঘুরে দেখছেন বই, কিনছেন গণিত আর ধাঁধার বই।
ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতায় ও প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনায় গণিত উৎসবের আয়োজন করছে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি। বরিশাল আঞ্চলিক পর্যায়ে চারটি ক্যাটাগরিতে প্রাইমারি (তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি বা সমমান), জুনিয়র (ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি বা সমমান), সেকেন্ডারি (নবম-দশম শ্রেণি) এবং হায়ার সেকেন্ডারি (একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি) ও সমমানের শিক্ষার্থীরা অংশ নিচ্ছে। আঞ্চলিক পর্যায় থেকে নির্বাচিত শিক্ষার্থীরা পরবর্তী সময় জাতীয় পর্যায়ে অংশ নেবে। আজ অনুষ্ঠিত উৎসবের পরীক্ষার ফলাফল পরবর্তী সময়ে ওয়েবসাইটে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন আয়োজকেরা।