ঝড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিপর্যয়, ঈদের আগে দুর্ভোগে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ
বরিশাল বিভাগের ছয় জেলার প্রায় সব এলাকাতেই গতকাল মঙ্গলবার দুপুর থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। ঝোড়ো হাওয়া, বজ্রসহ বৃষ্টির পর বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় বিভাগজুড়ে জনজীবনে নেমে এসেছে স্থবিরতা। বিভাগীয় শহর থেকে শুরু করে উপজেলা ও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে কোথাও আধা ঘণ্টা পরপর, কোথাও এক ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ধরে চলছে লোডশেডিং। তবে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন পল্লী বিদ্যুতের আওতায় থাকা গ্রামের গ্রাহকেরা।
ঈদুল আজহার মাত্র এক দিন আগে এমন পরিস্থিতিতে গ্রামে ফেরা লাখো মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন। বিদ্যুৎ না থাকায় তীব্র গরমে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষের অবস্থা সবচেয়ে বেশি নাজুক হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে কোরবানির পশুর মাংস সংরক্ষণ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
বরিশাল ও বিভাগের বিভিন্ন জেলার বিদ্যুৎ গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গতকাল দুপুরে একদফা আকস্মিক ঝড়ের পর থেকেই অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। কোথাও গভীর রাতে সাময়িকভাবে সংযোগ চালু হলেও আজ বুধবার সকালে আরেক দফা ঝড়ে আবারও নতুন করে বিপর্যয় দেখা দেয়।
বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ও ওজোপাডিকোর কর্মকর্তারা জানান, গতকাল বেলা দুইটার দিকে আকস্মিক ঝড়ের আঘাতে বহু স্থানে বৈদ্যুতিক লাইন ছিঁড়ে যায়, খুঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং লাইনের ওপর বড় বড় গাছ ভেঙে পড়ে। এতে পুরো বিভাগের বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলা সদরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা (ওজোপাডিকো)। এ প্রতিষ্ঠানের আওতায় ছয়টি জেলা শহরে গ্রাহক আছেন প্রায় পাঁচ লাখ। এর মধ্যে বরিশাল নগরে গ্রাহকসংখ্যা দেড় লাখের বেশি। অন্যদিকে উপজেলা সদর ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (পবিস)। বিভাগের পাঁচটি পবিসের আওতায় গ্রাহক আছেন প্রায় ২১ লাখ ৬৫ হাজার।
বরিশাল জাতীয় গ্রিড উপকেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, বিভাগের বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, বরগুনা ও পিরোজপুর জেলায় প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা ৫৫০ থেকে ৬০০ মেগাওয়াট। বরিশাল জেলায় পল্লী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় দুটি সমিতির মাধ্যমে। এর মধ্যে সমিতি-১–এর আওতায় গ্রাহক রয়েছেন প্রায় সাড়ে ৩ লাখ এবং সমিতি-২–এর আওতায় রয়েছেন প্রায় তিন লাখ ৮০ হাজার গ্রাহক। আজ বেলা দেড়টা পর্যন্ত এই দুই সমিতির প্রায় ৮০ শতাংশ গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে ওজোপাডিকোর আওতাধীন বরিশাল নগরীতেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংকিং কার্যক্রম, অনলাইন সেবা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১–এর আওতাধীন বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার বিহারীপুর গ্রামের বাসিন্দা বাদল মৃধা ও নান্না মৃধা বলেন, গতকাল দুপুর থেকে তাঁদের এলাকায় বিদ্যুৎ নেই। সারা রাত গরমে ঘুমানো যায়নি। ঈদের আগে পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম দুর্ভোগে আছেন তাঁরা।
একই উপজেলার বিরঙ্গল গ্রামের সফিকুল ইসলাম ও শ্যামপুর গ্রামের শামীম হাওলাদার বলেন, আগামীকাল ঈদ। কিন্তু এখন পর্যন্ত বিদ্যুৎ নেই। ঈদের দিনও যদি বিদ্যুৎ না আসে, তাহলে মানুষ খুব কষ্টে পড়বে। কোরবানির মাংস সংরক্ষণ করাও কঠিন হয়ে যাবে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২–এর আওতায় বরিশালের উজিরপুর উপজেলার ধামুরা গ্রামের কৃষক সিরাজুল ইসলাম বলেন, গতকাল দুপুরে বিদ্যুৎ গেছে। রাতে দেড়টার দিকে একবার এসেছিল, কিন্তু বারবার যাওয়া-আসা করেছে। আজ সকাল নয়টার পর থেকে আর আসেনি। গরমে ঘরে থাকা যাচ্ছে না।
গৌরনদী, আগৈলঝাড়া, হিজলা, মুলাদী, মেহেন্দীগঞ্জ ও বাবুগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামেও একই পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। উপজেলা সদরে আংশিক বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকলেও সেটিও বারবার বিচ্ছিন্ন হচ্ছে।
মুলাদী উপজেলার চললেখান গ্রামের বাসিন্দা বায়েজিদ আহমেদ বলেন, এমনিতেই কয়েক দিন ধরে তীব্র গরম পড়ছে। তার ওপর বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। ঝড়-বৃষ্টি হলেও গরম কমেনি।
একই ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছে বরগুনা জেলায়ও। জেলার হাজারবিঘা, খাজুরতলা ও আশপাশের গ্রামাঞ্চলে পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকেরা চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। জেলা শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে ওজোপাডিকো। শহরের গ্রাহক শামসুল ইসলাম বলেন, কয়েক দিন ধরে লোডশেডিং কম ছিল। কিন্তু গতকাল থেকে আবার ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাচ্ছে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২–এর মহাব্যবস্থাপক বিপুল কৃষ্ণ মণ্ডল আজ দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, ‘গতকাল দুপুরের ঝড়ের পর আমাদের আওতাধীন প্রায় সব গ্রাহক বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েন। রাত দেড়টার দিকে কিছু এলাকায় সংযোগ দেওয়া সম্ভব হলেও অধিকাংশ এলাকায় সম্ভব হয়নি। আজ সকাল নয়টার দিকে আবার ঝড় হওয়ায় নতুন করে বিপর্যয় দেখা দেয়। লাইনের ওপর বড় বড় গাছ পড়ে আছে। এগুলো অপসারণ ছাড়া বিদ্যুৎ চালু করা সম্ভব নয়। আমাদের কর্মীরা দিন-রাত কাজ করছেন।’
বেলা সোয়া দুইটার দিকে বিপুল কৃষ্ণ মণ্ডল জানান, তাঁর আওতায় থাকা তিন লাখ গ্রাহকের মধ্যে এক লাখ গ্রাহক বিদ্যুৎ পেয়েছেন। এখনো দুই লাখ গ্রাহকের বিদ্যুৎ সংযোগ সচল করা যায়নি।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১–এর মহাব্যবস্থাপক এ বি এম মিজানুর রহমান বলেন, কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল করা গেছে। আরও কিছু এলাকায় আজ রাতের মধ্যে সরবরাহ চালু হতে পারে। তবে বাকেরগঞ্জসহ বেশ কিছু এলাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগবে।
বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, কিছু এলাকায় বৈদ্যুতিক খুঁটি ও লাইনের বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ায় সংযোগ পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে কয়েক দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
দুই দিনের ঝড়ে দুই দফা ভোগান্তিতে পড়েন ঝালকাঠির বাসিন্দারাও। ঝড়ে বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুতের খুঁটি ও তার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, উপড়ে পড়েছে গাছ। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। গতকাল বেলা ১টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। এরপর আজ সকাল ১০টা থেকে আবার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। বেলা ২টায় অধিকংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েন গ্রাহকেরা। দৈনন্দিন কাজকর্ম, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পানির সংকট নিয়েও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে তাঁদের।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল বেলা ১টা থেকে টানা ৪ ঘণ্টা ঝালকাঠি জেলার বিভিন্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টি ও বজ্রপাত হয়। এ সময় তীব্র বেগে কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যায়। ঝড়ে সড়কের পাশের অসংখ্য গাছ ও ডালপালা ভেঙে পড়ে। এতে বরিশাল-ঝালকাঠি আঞ্চলিক মহাসড়কের নলছিটি শ্রীরামপুর এলাকায় গাছ উপড়ে পড়ে বিদ্যুতের লাইন ছিঁড়ে যায়। এতে সদরের অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। পরে রাত সাড়ে আটটার দিকে বিদ্যুৎব্যবস্থা স্বাভাবিক সরবরাহ চালু হয়। আজ বেলা ১টার দিকে প্রচণ্ড ঝড় ও কালবৈশাখীর প্রভাবে অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
ঝালকাঠির ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মতিউর রহমান বলেন, ঝালকাঠি-বরিশাল আঞ্চলিক মহাসড়কসহ বিভিন্ন স্থানে ৩৩ কেভি লাইনের ওপর গাছ পড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এগুলো মেরামতের কাজ চলছে। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা উপড়ে পড়া গাছ কাটায় বিদ্যুৎ বিভাগকে সহযোগিতা করছেন।
বরিশাল পাওয়ার গ্রিড স্টেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী আক্তারুজ্জামান পলাশ আজ দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, বিদ্যুতের উৎপাদন বা সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। বিভাগে চাহিদা প্রায় ৫৫০ মেগাওয়াট এবং পুরো চাহিদাই পাচ্ছেন। কিন্তু ঝড়ের কারণে বিতরণব্যবস্থায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফলে চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎও সরবরাহ করা যাচ্ছে না। গতকাল ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি সাবস্টেশন পুরোপুরি জিরো হয়ে গিয়েছিল।
নির্বাহী প্রকৌশলী আরও বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত লাইন ও উপকেন্দ্র মেরামতে একযোগে কাজ চলছে। তবে আবহাওয়া অনুকূলে না এলে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগতে পারে।
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন প্রতিনিধি, ঝালকাঠি]