মজুরি নয়, খড়ের বিনিময়ে ধান কাটেন তাঁরা
সকালে চারদিকে হালকা কুয়াশার আবরণ। মাঠে মাঠে কাস্তে হাতে মানুষের দল। কেউ ঝুঁকে ধান কাটছেন, কেউ আঁটি বাঁধছেন। পাশেই চলছে মাড়াই। মাড়াইযন্ত্রের শব্দের ফাঁকে ফাঁকে জমিতে জমছে খড়ের স্তূপ। কাজ শেষে কেউ মাথায়, কেউ সাইকেলে, কেউ ভ্যানে করে সেই খড় নিয়ে ফিরছেন বাড়ির পথে।
ধান কাটার মৌসুমের এই চেনা দৃশ্যে একটু ভিন্নতা আছে। যাঁরা মাঠে ধান কাটছেন, তাঁদের সবাই পেশাদার কৃষিশ্রমিক নন। কেউ কৃষক, কেউ অন্য পেশার মানুষ। তবে সবারই বাড়িতে গবাদিপশু আছে। গরু-মহিষের খড়ের সংকট মেটাতে তাঁরা মজুরি না নিয়ে অন্যের আগাম পাকা ধান কেটে দিচ্ছেন; বিনিময়ে নিয়ে যাচ্ছেন খড়।
এভাবেই ঠাকুরগাঁওয়ের কিছু এলাকায় আগাম আমন কাটার সময় গড়ে উঠেছে ‘খড় উৎসব’। এতে কৃষকের শ্রমিক খরচ বাঁচছে, আবার গবাদিপশু পালনকারীরাও পাচ্ছেন গোখাদ্য। কেউ কেউ খড় বিক্রিও করছেন।
আগাম ধান, আগাম বিনিময়
ঠাকুরগাঁওয়ে সাধারণত অগ্রহায়ণ মাসে আমন ধান কৃষকের ঘরে ওঠে। তবে এবার জেলার বিভিন্ন এলাকায় আগাম জাতের আমন আবাদ হয়েছে। সেসব জমির ধান পেকে যাওয়ায় শুরু হয়েছে আগাম কাটাই-মাড়াই। এ সময়েই খড়ের সংকটে থাকা কৃষক ও গবাদিপশু পালনকারীদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে এই বিনিময়ব্যবস্থা।
আমার জমির ধান আগে পেকে গেছে। ২০ জন কৃষক-শ্রমিক এসে ধান কেটে, মাড়াই করে, বস্তায় ভরে বাড়িতে পৌঁছে দেন। তাঁদের কাউকে টাকা দিতে হয়নি। এতে আমার প্রায় ১২ হাজার টাকা শ্রমিকের খরচ বেঁচেছে।রেজাউল করিম, কৃষক
গত রোববার সকালে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ঠাকুরগাঁও-পীরগঞ্জ সড়কের পাশে মধ্য পারপুগী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, একটি জমিতে ১৮ থেকে ২০ জনের দল ধান কাটছে। কেউ কাস্তে চালাচ্ছেন, কেউ আঁটি বাঁধছেন। আঁটি নেওয়া হচ্ছে মাড়াইযন্ত্রের কাছে। সেখানে ধান থেকে খড় আলাদা হচ্ছে। জমির এক পাশে জমছে খড়ের স্তূপ।
ধান কাটার শ্রমিক খরচ বেঁচেছে
শিবগঞ্জ বাজার এলাকার কৃষক রেজাউল করিম দুই বিঘা জমিতে আগাম আমন আবাদ করেছেন। রেজাউল বলেন, ‘আমার জমির ধান আগে পেকে গেছে। খবর পেয়ে ২০ জন কৃষক-শ্রমিক এসে ধান কেটে, মাড়াই করে, বস্তায় ভরে বাড়িতে পৌঁছে দেন। তাঁদের কাউকে টাকা দিতে হয়নি। তাঁরা খড় নিয়ে গেছেন। এতে আমার প্রায় ১২ হাজার টাকা শ্রমিকের খরচ বেঁচেছে।’
হিসাবের অন্য পাশেও লাভ আছে। যাঁরা অন্যের জমির ধান কাটতে আসছেন, তাঁদের অনেকের নিজেদেরও জমি আছে। কিন্তু সেসব জমির ধান কাটার উপযোগী হতে আরও কয়েক সপ্তাহ লাগবে। এর মধ্যে ঘরের গরু-মহিষের খড় শেষ। বাজারে খড়ের সরবরাহ কম, দাম বেশি। তাই অন্যের জমির ধান কেটে খড় জোগাড় করছেন তাঁরা।
রেজাউলের জমিতে ধান কাটছিলেন বিট বাজার এলাকার কৃষক আইনুল হক। তাঁর বাড়িতে তিনটি গরু। তিনি বলেন, ‘বাড়ির খড় শেষ। নিজের জমির ধান কাটতে আরও সময় লাগবে। এখন খড় কিনতে গেলে দাম বেশি। তাই অন্যদের সঙ্গে এখানে ধান কাটতে এসেছি। খড় নিয়ে বাড়ি যাব।’
মাদারগঞ্জ গ্রামের কৃষিশ্রমিক কার্তিক বর্মণের বাড়িতে চারটি গাভি। বৃষ্টির কারণে আগের মৌসুমের খড় শুকাতে না পারায় গোখাদ্য নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তিনি। কার্তিক বলেন, ‘এবার বৃষ্টির কারণে বোরোর একটুও খড় শুকাতে পারিনি। বাজারে প্রতি পণ (৮০টি আঁটিতে এক পণ) খড় ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এত টাকা দিয়ে খড় কিনে গরুকে খাওয়ানো কঠিন। তাই এখানে ধান কেটে খড় বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি।’
খড় বেঁচেও ভাগ হচ্ছে আয়
পাশের জমিতে পৌনে দুই বিঘায় আগাম আমন আবাদ করেছেন কৃষক তানজিনা বেগম। সেখানে ১৬ জনের একটি দল ধান কাটছিল। দলের সদস্য সিরাজুল ইসলাম জানান, ধান কাটার পর প্রায় দেড় হাজার আঁটি খড় পাওয়া যেতে পারে। এর একটি অংশ তাঁরা প্রতি আঁটি সাত টাকা দরে এক ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রির চুক্তি করেছেন। সিরাজুল বলেন, ‘বিক্রি করে যে টাকা পাব, তা সবাই মিলে ভাগ করে নেব।’
তানজিনা বেগম জানান, এতে দুই পক্ষেরই লাভ হচ্ছে। তাঁর ধান কাটা ও মাড়াইয়ের খরচ বেঁচে যাচ্ছে, আর যাঁরা কাটছেন, তাঁরাও খড় পাচ্ছেন।
কয়েক বছরের রীতি
কয়েক বছর ধরে এলাকায় আগাম আমন কাটার সময় এমন রীতি চলে আসছে জানিয়ে স্থানীয় শিক্ষক আতাউর রহমান বলেন, স্থানীয় কৃষকেরা এ ব্যবস্থাকে ‘খড় উৎসব’ বলেন।
ঠাকুরগাঁও জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলায় গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া মিলিয়ে ১০ লাখ ৪৭ হাজারের বেশি গবাদিপশু আছে। এসব পশুর খাদ্যের বড় একটি অংশ আসে ঘাস ও খড় থেকে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মাজেদুল ইসলাম বলেন, এবার টানা বৃষ্টির কারণে অনেক কৃষক বোরোর খড় ঠিকমতো শুকাতে পারেননি। ফলে কোথাও কোথাও খড়ের সংকট তৈরি হয়েছে। খড়ের বিনিময়ে ধান কাটায় একদিকে কৃষকের শ্রমিক খরচ কমছে, অন্যদিকে গবাদিপশু পালনকারীরাও গোখাদ্য পাচ্ছেন।