আমেনা খাতুন ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার দর্জিগাতী গ্রামের মৃত ছমেদ আলীর স্ত্রী। তাঁর জন্ম ১৯০২ সালে হলেও পরিচয়পত্রে লেখা রয়েছে ১৯৮৯ সাল
ছবি: প্রথম আলো

মুখের ত্বকে ভাঁজ পড়েছে আমেনা খাতুনের। বয়সের ভারে লাঠির সাহায্য ছাড়া হাঁটতে পারেন না। চোখে কম দেখেন, কানেও কম শোনেন। চার ছেলে মারা গেছেন। এক ছেলে জীবিত থাকলেও তিনিও বয়সের ভারে ন্যুব্জ। অথচ জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী এই বৃদ্ধার বয়স মাত্র ৩৩ বছর।

আমেনা খাতুন ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার দর্জিগাতী গ্রামের প্রয়াত ছমেদ আলীর স্ত্রী। অভাব-অনটনের সংসারে আমেনা খাতুন থাকেন নাতির সঙ্গে। পরিবারের লোকজন বলছেন, আমেনার বর্তমান বয়স ১১৯ বছর। তিনি গ্রামের সবচেয়ে প্রবীণ মানুষ বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অথচ অভাব–অনটনে ভুগলেও তিনি বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন না। কারণ, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ৬৫ বছরের আগে বয়স্ক ভাতা পাওয়ার সুযোগ নেই।

গতকাল দুপুরে দর্জিগাতী গ্রামে গিয়ে কথা হয় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। আমেনা খাতুনের মোট সাত সন্তান ছিলেন। বর্তমানে বড় ছেলে মো. ইয়াকুব আলী এবং দুই মেয়ে সখিনা খাতুন ও রাশিদা খাতুন বেঁচে আছেন। জন্মের পরপরই আমেনার বড় দুই ছেলে মারা যায়। এরপর জন্ম নিয়েছেন মো. ইয়াকুব আলী। পরিচয়পত্র অনুযায়ী তাঁর বর্তমান বয়স ৮৬ বছর। ৩৫ বছর আগে আমেনা খাতুনের স্বামী মারা গেছেন।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০০৮ সালে জাতীয় পরিচয়পত্র পান আমেনা খাতুন। তাঁর জন্ম ১৯০২ সালে হলেও পরিচয়পত্রে লেখা রয়েছে ১৯৮৯ সাল। শুরুর দিকে পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি নিয়ে তেমন গুরুত্ব দেননি। আমেনার পাঁচ ছেলের মধ্যে ছোট দুই ছেলে আবদুল মান্নান ও আবদুল হাই সম্প্রতি মারা গেছেন। এর পর থেকে তাঁদের সংসারে অভাব দেখা দেয়।

আমেনার এক নাতনির ছেলে রাকিবুল হাসান পরিচয়পত্রে জন্মতারিখ সংশোধনের উদ্যোগ নেন। রাকিবুল হাসান ময়মনসিংহ মহাবিদালয়ের উচ্চমাধ্যমিকে পড়ছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের জন্য গালাগাঁও ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) কার্যালয়ে যাওয়া-আসা করছেন। তবে এখনো বিষয়টির কোনো সুরাহা হয়নি।

রাকিবুল হাসান বলেন, অন্তত পাঁচ বছর ধরে তিনি পরিচয়পত্র সংশোধনের চেষ্টা করছেন। এ সময়ের মধ্যে গালাগাঁও ইউপির চেয়ারম্যানও বদল হয়েছেন। তবে বর্তমান চেয়ারম্যান সংশোধনের ব্যাপারে পরামর্শ দিয়েছেন।

আমেনা খাতুন বলেন, ‘নাতির সংসারে থাকি। সবাই আমারে অনেক আদর করে। তবে নাতি আর ছেলের অবস্থাও ভালো না। আমার থাকার ঘর নাই। নাতির ঘরের এক পাশে থাকি। সরকার যদি আমারে ভাতা দেয়, তাহলে আমার নাতি আর ছেলের ওপর চাপ কিছুটা কমত।’

আমেনা খাতুনের বড় ছেলে মো. ইয়াকুব আলী (৮৬) বলেন, ‘আমার ছোট দুই ভাই মারা গেছেন। আমারও বয়স হয়েছে। মাকে খুব বেশি দেখাশোনা করতে পারি না। আমার ছোট ভাইয়ের ছেলে মো. শামীম মাকে দেখাশোনা করে। বয়স্ক ভাতার ব্যবস্থা হলে উপকার হতো।’

গালাগাঁও ইউপির চেয়ারম্যান আবদুর রহমান তালুকদার বলেন, আমেনা খাতুনের জাতীয় পরিচয়পত্রে ভুলের বিষয়টি তিনি কিছুদিন আগেই জেনেছেন। তাঁর জানামতে, আমেনা খাতুন এই গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক মানুষ। কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্রে ভুলের কারণে তিনি বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন না। তিনি নিজে উদ্যোগী হয়ে অতি দ্রুত আমেনা খাতুনের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন।