ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে শিক্ষককে লাঞ্ছিতের অভিযোগ, ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন

লাঞ্ছিতের ঘটনায় জড়িত শিক্ষার্থীদের বিচারের দাবিতে বৃষ্টির মধ্যে ভেটেরিনারি বিভাগের শিক্ষার্থীদের সংবাদ সম্মেলন। সোমবার বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের পেছনে
ছবি: প্রথম আলো

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তবিভাগ ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে দুই বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে হাতাহাতির সময় ছাত্রলীগের এক নেতার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক মো. মোইজুর রহমানকে লাঞ্ছিতের অভিযোগ উঠেছে। গতকাল রোববার বেলা ১১টায় শহীদ হবিবুর রহমান হল মাঠে ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট (আইবিএ) বনাম ভেটেরিনারি বিভাগের খেলা চলাকালে এ ঘটনা ঘটে।

অভিযুক্ত ওই ছাত্রলীগ নেতার নাম আবু সিনহা ওরফে সৌমিক। তিনি আইবিএ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী শিক্ষক অধ্যাপক মো. মোইজুর রহমান উপাচার্য বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনায় জড়িত শিক্ষার্থীদের ছাত্রত্ব বাতিলের দাবি জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন ভেটেরিনারি বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া এক সপ্তাহের জন্য ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা।

প্রত্যক্ষদর্শী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গতকাল সকালে শহীদ হবিবুর রহমান হল মাঠে আইবিএ ও ভেটেরিনারি বিভাগের মধ্যে ম্যাচ শুরু হয়। নির্ধারিত ৪০ মিনিটের খেলায় ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র হলে ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। টাইব্রেকারের প্রথম পাঁচটি করে শটেও ম্যাচটির ড্র থাকে। এ সময় রেফারির বাঁশি বাজানোর আগেই ভেটেরিনারি বিভাগের এক খেলোয়াড় ষষ্ঠ শট নিলে আইবিএর গোলরক্ষক শটটি ফিরিয়ে দেন। তবে বাঁশি বাজানোর আগেই শট নেওয়ায় রেফারি সেটি বাতিল ঘোষণা করেন। রেফারির এ সিদ্ধান্ত না মেনে আইবিএর খেলোয়াড়েরা তাঁকে অবরুদ্ধ করেন। এ সময় আইবিএর তিন শিক্ষক ও ভেটেরিনারি বিভাগের অধ্যাপক মো. মোইজুর রহমান রেফারির সঙ্গে কথা বলতে সেখানে উপস্থিত হন। এ সময় আইবিএর এক খেলোয়াড় অধ্যাপক মোইজুরকে ধাক্কা দেন।

খেলা নিয়ে হাতাহাতির সময় ছাত্রলীগের এক নেতা লাঠি হাতে মারতে যান
ছবি: সংগৃহীত

প্রত্যক্ষদর্শী ও ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, ধাক্কা দেওয়ার পর উভয় পক্ষের খেলোয়াড়দের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়। অধ্যাপক মোইজুর রহমানের টি–শার্টের কলার ধরে টানাহেঁচড়া করেন আইবিএ শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আবু সিনহা। তাঁকে পেছন থেকে টেনে ধরে শিক্ষককে রক্ষার চেষ্টা করছেন ভেটেরিনারি বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এ সময় আইবিএ শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সৈকত রায়হানকে লাঠি হাতে তেড়ে আসতে দেখা যায়।

এ বিষয়ে অধ্যাপক মোইজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, তিনি এ ঘটনায় ভেটেরিনারি বিভাগের সভাপতির মাধ্যমে উপাচার্য বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

অভিযোগের বিষয়ে ছাত্রলীগ নেতা আবু সিনহার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ধরেননি। তবে তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ওই শিক্ষকই প্রথমে তাঁর বিভাগের শিক্ষার্থীদের আইবিএর খেলোয়াড়দের মারধরের নির্দেশ দেন। এতে দুই দলের মধ্যে সংঘর্ষ বেঁধে যায়। সেই সংঘর্ষের মধ্যে শিক্ষক ছিলেন কি না, তিনি বুঝতে পারেননি। তবে তাঁর দাবি, যখন ওই শিক্ষক নিজের পরিচয় দেন, তখন তাঁরা সেখান থেকে চলে আসেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আসাবুল হক বলেন, এ ঘটনায় ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জহুরুল আনিসকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আহ্বায়ক ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন।

বিচারের দাবিতে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন

শিক্ষককে লাঞ্ছিত করার প্রতিবাদে আজ সোমবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বৃষ্টির মধ্যে কৃষি অনুষদের সামনে থেকে একটি র‍্যালি বের করেন ভেটেরিনারি বিভাগের শিক্ষার্থীরা। তাঁরা বৃষ্টির মধ্যে র‍্যালি নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (রাবিসাস) চত্বরে এসে সংবাদ সম্মেলন করেন। শিক্ষার্থীরা ঘটনার প্রতিবাদে এক সপ্তাহের জন্য সব ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের পাশাপাশি তিন দফা দাবি জানান।

সংবাদ সম্মেলনে ভেটেরিনারি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আল-আমিন ও কায়েস মাহবুব লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। তাঁদের দাবিগুলো হলো—আবু সিনহার ছাত্রত্ব বাতিল করতে হবে; ভিডিও ফুটেজ দেখে তদন্ত সাপেক্ষে জড়িত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং আন্তবিভাগ প্রতিযোগিতার যেকোনো খেলা চলাকালে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

এর আগে গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কৃষি অনুষদ ভবনের প্রধান ফটকে তালা লাগিয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন ভেটেরিনারি বিভাগের শিক্ষার্থীরা। সে সময় প্রক্টর আসাবুল হক ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করেন। পরে ভুক্তভোগী শিক্ষক, বিভাগের সভাপতি ও কয়েকজন ছাত্রকে নিয়ে আলোচনায় বসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।