দলীয় কর্মীদের পেট ভরার রাজনীতি করি না : জামায়াত আমির

কুষ্টিয়ায় শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে জামায়াতের জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। আজ সোমবার দুপুরেছবি: প্রথম আলো

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আমরা জাতির সমস্ত মানুষের মুক্তির চিন্তা করি। আমরা নিজেরা খাওয়ার জন্য রাজনীতি করি না। দলীয় কর্মীদের পেট ভরার জন্যও রাজনীতি করি না।’ আজ সোমবার দুপুর ১২টায় কুষ্টিয়ায় শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে আয়োজিত জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথাগুলো বলেন।

কুষ্টিয়ার সন্তান আবরার ফাহাদকে নিয়ে জামায়াতের আমির বলেন, ‘শহীদ আবরার ফাহাদ আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। সে নিজেই বিদ্রোহী ও একটা বিপ্লবের নাম। সে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিল। এটাই তার অপরাধ। এ জন্য তাকে দুনিয়া থেকে অত্যন্ত নির্মমভাবে বিদায় করা হয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে, যেখানে মেধাবীদের মিলনমেলা।’

কারও নাম উল্লেখ না করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘এরা যা আচারণ করেছে, তা কোনো মানুষ করে না। এটা সাধারণ পশুও করে না। তারা হচ্ছে চার পায়া জন্তুর মতো। এরা ওই জন্তুগুলোর চেয়ে আরও খারাপ, আরও নিকৃষ্ট। বাংলাদেশের প্রত্যেক যুবক-যুবতী যেন একেকজন আবরার ফাহাদ হয়ে যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘চব্বিশের দ্রোহ প্রমাণ করে দিয়েছে, বাংলাদেশের দামাল ছেলেরা আল্লাহ ছাড়া কাউকে পরোয়া করে না। এটা একটা স্বাধীন দেশের জন্য বিশাল শক্তির ব্যাপার; যাদের নেতৃত্বে এই জাতি চব্বিশের লড়াইয়ে অংশ গ্রহণ করে মুক্তি পেয়েছে।’

গণ–অভ্যুত্থানের সব যোদ্ধা ও শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে জামায়াতের আমির বলেন, ‘এক আবরারকে বিদায় করেছে, এক আবু সাঈদকে বিদায় করেছে, কিন্তু মনে রাখবা, একেকটা বিপ্লবী হাজার নয়, লক্ষ নয়, কোটি বিপ্লবী দুনিয়ায় জন্ম দিয়ে তারা বিদায় নিয়েছে। ওই মায়েদের পক্ষে কথা বলতে দাঁড়িয়েছি, যে মা তার সন্তান হারিয়েছে। এই মায়েদের দুয়ারে আমি হাজির হয়েছি। মায়েদের চোখেমুখে আমি পানি দেখিনি; তাদের চোখের কোনায় রক্ত দেখেছি।’

বিগত সময়ের গুম সম্পর্কে শফিকুর রহমান বলেন, ‘অসংখ্য মায়ের বুক থেকে, বোনের বুক থেকে তাদের আপনজনকে তুলে নিয়ে বছরের পর বছর আয়নাঘরে রাখা হয়েছে, গুম করে রাখা হয়েছে। বেশির ভাগই আমরা ফেরত পেয়েছি আলহামদুলিল্লাহ। হয় জীবিত অথবা লাশ হিসেবে। কিছু এখনো পাইনি। তাদের মধ্যে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন আছে। এ রকম আরও আটজন আছে, যাদের আজও খুঁজে পাইনি।’

নদী খননের জন্য প্রতিবছর বাজেট থাকে জানিয়ে জামায়াতের আমির অভিযোগ করে বলেন, ‘নদী খননের সমস্ত টাকা মুখ দিয়ে ঢুকে পেটের ভেতর চলে যায়। নদীর বালু আর ওঠে না। খননও হয় না। শুধু নদী নয়, উন্নয়নের নামে বিগত ৫৪ বছর কমবেশি যারাই ক্ষমতায় গেছে, এই একই কাজ তারা করেছে। তারা এই ৫৪ বছরে খামছে দেশকে তছনছ করে দিয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, চরিত্র পরিবর্তন না হলে এই দেশকে ভালো কিছু দিতে পারবে না।’

জনসভায় উপস্থিত জামায়াতের নেতা–কর্মীসহ জনতারএকাংশ। আজ বেলা ১২টায় শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে
ছবি: প্রথম আলো

কুষ্টিয়া থেকে যেসব ট্রাক চাল নিয়ে যায়, প্রতিটি ট্রাক থেকে ৫ হাজার টাকা করে চাঁদা আদায় হয় বলে অভিযোগ করেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, এতে চালকলের মালিক ও ট্রাকমালিকেরা অতিষ্ঠ। পণ্যের দাম কমানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা তিনটা কাজ করব—যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি করব, সিন্ডিকেট ভেঙে একদম চুরমার করে দেব এবং চাঁদাবাজিতে যারা লিপ্ত, তাদের আমাদের বুকে টেনে নিয়ে ভালো কাজে লাগিয়ে দেব।’

মায়েদের পরম যত্নের সঙ্গে দুটি জিনিস নিশ্চিত করবেন জানিয়ে শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এক. তাঁদের মর্যাদা। দুই. তাঁদের নিরাপত্তা। বড় শহরগুলোয় তাঁদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস করব।’

বক্তব্যে শেষে জামায়াতের আমির কুষ্টিয়ার চারটি আসনের দলের প্রার্থীদের হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন।

জেলা জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির ও কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) আসনে দলটির সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী মো. আবদুল গফুরের সভাপতিত্বে ও দলের জেলা সেক্রেটারি সুজা উদ্দীন জোয়ার্দ্দারের সঞ্চালনায় জনসভায় উপস্থিত ছিলেন কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের প্রার্থী বেলাল উদ্দীন, কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের প্রার্থী আমির হামজা, কুষ্টিয়া-৪ (খোকসা-কুমারখালী) আসনের প্রার্থী আফজাল হেসেন ও শিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ প্রমুখ।

ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ার ডাক

মেহেরপুর পৌর শহরের সরকারি উচ্চমাধ্যমিক বালক বিদ্যালয় মাঠে আজ দুপুরে জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, ‘বিগত দিনে যাঁরাই ক্ষমতায় ছিলেন, তাঁরা কেউই সততার সঙ্গে দেশ পরিচালনার দাবি করতে পারবেন না। ফ্যাসিবাদ ও লুটতরাজের কারণে দেশের সম্পদ ও ব্যাংকিং খাত ধ্বংস করা হয়েছে। আমরা এই ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন চাই।’

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে জামায়াতের আমির বলেন, ‘আল্লাহর কসম, আমরা ক্ষমতায় গেলে জনগণের সম্পদের ওপর হাত দেব না। আমরা হব জনগণের চৌকিদার। সরকারি অর্থের প্রতিটি হিসাব জনগণের কাছে দিতে আমরা দায়বদ্ধ থাকব। জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের হিসাব কেবল পাঁচ বছরে একবার নয়; বরং প্রতিবছর জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে। ক্ষমতায় থাকাকালে কোনো জনপ্রতিনিধির সম্পদ এক পয়সাও বাড়বে না।’

জামায়াতের আমির দেশের নদী, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিয়ে তাঁর পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, শুকিয়ে যাওয়া নদীগুলোর প্রাণ ফিরিয়ে আনা হবে, যাতে কৃষি ও প্রকৃতি রক্ষা পায়। কর্মস্থল ও রাস্তায় নারীদের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। কোনো ‘জালিম’ যেন তাদের দিকে চোখ তুলে তাকাতে না পারে, সে ব্যবস্থা করা হবে। যুবকদের বেকার ভাতা নয়; বরং সরকারি খরচে উন্নত প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তোলা হবে এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। এমনকি বর্তমানে যারা চাঁদাবাজিতে লিপ্ত, তাদেরও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সুপথে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা এবং প্রবীণদের জন্য পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে।

শফিকুর রহমান আরও বলেন, জাতিকে ধর্ম ও বর্ণের ভিত্তিতে বিভক্ত করে সংঘাতে ঠেলে দেওয়ার রাজনীতি আর চলতে দেওয়া হবে না। সাড়ে ১২ কোটি ভোটার আগামী ১২ তারিখে ব্যালটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবেন, তাঁরা কেমন বাংলাদেশ চান। মানুষ এখন ইনসাফ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে।

মেহেরপুর জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা মাহবুব উল আলমের সভাপতিত্বে সভায় আরও বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসেন, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ এবং মেহেরপুর-১ (সদর-মুজিবনগর) আসনের জামায়াত প্রার্থী তাজউদ্দীন খান, মেহেরপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী নাজমুল হুদা।