লঞ্চে অতিরিক্ত ভাড়া, সদরঘাটে নেমে যানবাহন–সংকটে যাত্রীদের ভোগান্তি

লঞ্চ থেকে যাত্রীরা নামছেন। আজ মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকার সদরঘাট টার্মিনালেছবি: প্রথম আলো

ঈদের পর রাজধানীতে ফেরা নৌপথের যাত্রীরা সদরঘাট টার্মিনালে এসে ভোগান্তিতে পড়ছেন। লঞ্চে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগের পাশাপাশি ঘাটে নেমে পর্যাপ্ত যানবাহন না থাকায় গন্তব্যে পৌঁছাতে বাড়তি খরচ ও দুর্ভোগে পড়ছেন তাঁরা।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটি) ঢাকা নদীবন্দর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আজ মঙ্গলবার ভোর থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত দক্ষিণাঞ্চল থেকে সদরঘাট টার্মিনালে লঞ্চ এসেছে ৭৩টি। আর টার্মিনাল ছেড়ে গেছে ৩৯টি।

মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা গেছে, দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুট থেকে যাত্রীবাহী লঞ্চ টার্মিনালের পন্টুনে ভিড়ছে। যাত্রীরা পরিবার-পরিজন ও মালামাল নিয়ে নেমে নিজ নিজ গন্তব্যের দিকে রওনা দিচ্ছেন। তবে টার্মিনাল এলাকায় পর্যাপ্ত গণপরিবহন না থাকায় অনেকেই সড়কে দাঁড়িয়ে যানবাহনের জন্য অপেক্ষা করছেন। কেউ কেউ বিকল্প হিসেবে তাঁতীবাজারসহ আশপাশের এলাকায় হেঁটে যানবাহনের খোঁজ করছেন।

এদিকে লঞ্চে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও তুলেছেন যাত্রীরা। পটুয়াখালীগামী এমভি শুভ রাজ-৯ লঞ্চের যাত্রী শরিফুল হাওলাদার বলেন, লঞ্চে ওঠার সময় ৫০০ টাকা ভাড়া বলা হলেও মাঝনদীতে গিয়ে ৬০০ টাকা দাবি করা হয়। পরে বাগ্‌বিতণ্ডার পর ৫৫০ টাকা দিতে হয়েছে। ন্যায্য ভাড়ার কথা বলে যাত্রীদের এভাবে জিম্মি করা উচিত নয়। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

অভিযোগ অস্বীকার করেন এমভি শুভ রাজ-৯ লঞ্চের কর্মচারী রশিদ শেখ। তাঁর দাবি, সরকার–নির্ধারিত ভাড়াই নেওয়া হচ্ছে। যাত্রীরা মিথ্যা অভিযোগ করেছেন।

একই ধরনের অভিযোগ করেন এমভি সুন্দরবন-১৪ লঞ্চের যাত্রী ফয়সল হাসান। তিনি বলেন, ‘ডাবল কেবিনের ভাড়া সরকার–নির্ধারিত ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা হলেও আমার কাছে ৩ হাজার টাকা চাওয়া হয়। পরে ২ হাজার ৫৫০ টাকায় নিতে হয়েছে। এভাবে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। অথচ এগুলো দেখার কেউ নেই। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বরিশাল থেকে আসা এক যাত্রী আক্ষেপ করে বলেন, লঞ্চে ওঠার সময় এক ভাড়া বলে, পরে মাঝপথে বাড়তি টাকা চায়। না দিলে নানা অজুহাত দেয়। পরে বাধ্য হয়ে বেশি ভাড়া দিতে হয়। লঞ্চ থেকে নেমে আরও বিপাকে পড়তে হচ্ছে যাত্রীদের। পর্যাপ্ত যানবাহন না থাকায় অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে যেতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে।

বরগুনা থেকে আসা যাত্রী হাকিম উদ্দিন বলেন, সদরঘাট থেকে মিরপুরের ভাড়া সাধারণত ৫০০ টাকা; কিন্তু সিএনজিচালক ১ হাজার ২০০ টাকা চেয়েছেন। শেষে ৯০০ টাকায় যেতে হয়েছে।

বরগুনার আমতলী থেকে আসা কুদ্দুস জমাদ্দার বলেন, ‘আমি উত্তরা দিয়াবাড়ি যাব। ট্যাক্সিক্যাব ভাড়া চেয়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকা। পরে চালক ১ হাজার ১০০ টাকায় রাজি হয়েছে। প্রতিবছর ঈদ মৌসুমে যাত্রীদের কাছ থেকে যানবাহনচালকেরা নিজেদের ইচ্ছামতো অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে। তাদের থামানোর মতো কেউ নেই। সরকারের এসব বিষয় দেখা উচিত। আর যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত গণপরিবহনের ব্যবস্থা রাখা দরকার।’

চাঁদপুর থেকে আসা খায়রুন্নেছা বলেন, ‘আমি খিলক্ষেত যামু। লঞ্চ থেকে নামার পর এক ঘণ্টা দাঁড়ায়া আছি। কোনো গাড়ি পাই না। যেগুলা আছে সেগুলা দুই গুণ, তিন গুণ ভাড়া চায়। এত ভাড়া চাইলে পোলাপানগুলা লইয়া বাড়ি যামু কেমনে? এহন খুব কষ্টে পইড়া গেলাম।’

নৌ পুলিশের সদরঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সোহাগ রানা বলেন, যাত্রীদের সেবায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। কোনো যানবাহনে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিআইডব্লিউটিএর নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের ঢাকা নদীবন্দরের যুগ্ম পরিচালক মোবারক হোসেন বলেন, লঞ্চে সরকার–নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া কোনো অবস্থাতেই নেওয়া যাবে না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে সেই লঞ্চের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।