প্রথম আলো: নারী ফুটবলার তৈরির ভাবনাটি কেমন করে এল?

তাজুল ইসলাম: আসলে নারী ফুটবল নিয়ে কাজ করব, আমার ভাবনায় এমনটা ছিল না। নিজে একজন ফুটবল খেলোয়াড় ছিলাম, খেলার প্রতি সবার মতো আমারও টান ছিল। ২০১৪ সালের আগস্টে রাঙ্গাটুঙ্গি গ্রামে একটি টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গিয়ে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর এক কিশোরীর ফুটবল খেলা দেখে কিশোরীদের একটা ফুটবল দল করার ভাবনা আসে। খেলা চলাকালে ওই কিশোরীকে ডেকে পরিচিত হলাম।

আমার ভাবনার কথা জানাতেই ওই কিশোরী রাজি হয়ে গেল। পরের দিন থেকে শুরু হয়ে গেল কিশোরী ফুটবলার সংগ্রহের কাজ। কয়েক দিনের মাথায় ১৪ থেকে ১৫ জনের একটা দল পেয়ে গেলাম। পাশে এসে দাঁড়ালেন সুগা মুর্মু, স্থানীয় যুবক জয়নুল আবেদিন ও সেতাউর রহমান। এই উদ্যোগের নাম দিলাম রাঙ্গাটুঙ্গি ইউনাইটেড ফুটবল একাডেমি।

প্রথম আলো: রাঙ্গাটুঙ্গি ইউনাইটেড ফুটবল একাডেমির সফলতা কী?

তাজুল ইসলাম: নারী সাফ ফুটবল জয় দেশের নারী ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সফলতা। রাঙ্গাটুঙ্গি ইউনাইটেড ফুটবল একাডেমিও এই সফলতার অংশীদার। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ স্কোয়াডে এই একাডেমির সোহাগী কিসকু আর স্বপ্না রানী ছিলেন। এটা আমাদের একাডেমির জন্য গর্বের। এ ছাড়া আমাদের একাডেমির বিথিকা মুরমু, কোহাতি কিসকু, কবিতা রানীসহ মোট পাঁচজন খেলোয়াড় বয়সভিত্তিক জাতীয় দলের ক্যাম্পে আছেন। কাকলি আক্তার ও ঈশরাত জাহান যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থাপনায় বিশেষ প্রশিক্ষণে পর্তুগাল যাচ্ছেন। একাডেমির তিন নারী খেলোয়াড় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে খেলোয়াড় কোটায় চাকরিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।

২০১৬ সালে জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৪ জেএফএ কাপে ঠাকুরগাঁও জেলা কিশোরী ফুটবল দল প্রথমবার খেলতে গিয়ে জাতীয় পর্যায়ে ফাইনাল রাউন্ড খেলে। একই টুর্নামেন্টে ২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে পরপর তিনবার রানার্সআপ হয়। ওই দল রাঙ্গাটুঙ্গি ইউনাইটেড ফুটবল একাডেমির খেলোয়াড় নিয়েই গঠিত হয়েছিল। রাঙ্গাটুঙ্গি ইউনাইটেড ফুটবল একাডেমি ২০১৭ সালে ‘জয় বাংলা অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করে। এখন আমাদের একাডেমির মাঠে নিয়মিত অনুশীলন করছেন বিভিন্ন বয়সী ৪০ জনেরও বেশি কিশোরী। একাডেমির ১৫ জন খেলোয়াড় দেশের নারী ফুটবল লীগে বিভিন্ন ক্লাব হয়ে অংশগ্রহণ করছেন।

প্রথম আলো: সাফজয়ী নারী দলে আপনার একাডেমির দুজন খেলোয়াড় আছেন, তাঁদের নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কী?

তাজুল ইসলাম: সোহাগী ও স্বপ্না আগামী দিনে নারী ফুটবল দলের কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন ভাইয়ের তুরুপের তাস হবে, এটা নিশ্চিত। স্বপ্নার ফ্রি-কিক আর সোহাগীর নিখুঁত বল পাসিংয়ের দক্ষতা আছে, যা দলের জয়ে ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রথম আলো: দেশের নারী ফুটবলকে এগিয়ে নিতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

তাজুল ইসলাম: দেশের নারী ফুটবলের অধিকাংশ খেলোয়াড়ই প্রান্তিক পরিবার থেকে উঠে এসেছেন। তাঁরা অভাব-অনটনের মধ্যেই বেড়ে উঠেছেন। সবার আগে তাঁদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। জীবিকার বিষয়টি মাথায় রেখে পেশাদার খেলোয়াড় তৈরিতে প্রথম থেকেই মনোযোগী হতে হবে। তৃণমূল পর্যায়ে সম্ভাবনাময় কিশোরীদের খুঁজে বের করে তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে।

পাশাপাশি তৃণমূলের সংগঠকদের দিকে পৃষ্ঠপোষকতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। পরে তৃণমূলের খেলোয়াড়দের মধ্য থেকে বাছাই করে আরও উন্নত প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। বিজয়ের ধারা অব্যাহত রাখতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে গড়ে ওঠা নারী ফুটবল একাডেমিগুলোকে উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।

প্রথম আলো: নারী ফুটবল দলের প্রতি আপনার প্রত্যাশা কী?

তাজুল ইসলাম: আমি মনে করি, দক্ষ করে গড়া গেলে নারী ফুটবলাররাই দেশকে মাতিয়ে রাখবে। প্রত্যাশা তো আছেই। এবার দক্ষিণ এশিয়ায় সেরা হয়েছি। পরের মিশন এশিয়া। এরপর নারী বিশ্বকাপ আসর। এভাবেই এগিয়ে যাক আমাদের নারী ফুটবল।

এর জন্য আমাদেরও তাঁদের প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে। মনে রাখবেন, নারী ফুটবলারদের প্রতি সামান্য করলে অসামান্য ফল পাবেন।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন