পাহাড়ের যে বাজারের বিক্রেতা শুধু নারী

বাজারটিতে ৬০ থেকে ৭০ নারী প্রতিদিন পসরা সাজিয়ে বসেন। পাহাড়ি উৎপাদিত তাজা শাকসবজি, চালতা, কমলা, কলা, পেঁপে, পেয়ারা, আমলকী, জুমের বিন্নি চাল, যব, তিল থেকে শুরু করে সবকিছু পাওয়া যায় এখানে।

ভোরের আলো ফোটার আগেই যেন জেগে ওঠে পুরো এলাকা। কেউ মাথায় ঝুড়ি, কেউ হাতে বেগ নিয়ে হাজির হন বাজারটিতে। সঙ্গে আনেন নিজেদের উৎপাদিত শাকসবজি, ফলসহ পাহাড়ি বিভিন্ন পণ্য। তবে অন্য বাজারের চেয়ে এটি ব্যতিক্রম। এখানে বিক্রেতা সবাই নারী।

খাগড়াছড়ির দীঘিনালার লারমা স্কয়ারে দেখা যায় এ দৃশ্য। সড়কের দুই পাশে বসা এ বাজার জমজমাট থাকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। পাহাড়ি নারীদের জীবিকার লড়াই, স্বপ্ন আর স্বাবলম্বিতার গল্প; প্রতিদিন নতুন করে লেখা হয় এখানে।

মনিতা চাকমা তাঁদের একজন। স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে তাঁর সংসার। চাকরি করতেন চট্টগ্রাম নগরের বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে। তবে ২০২০ সালে করোনার সময় স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চাকরি হারান। এরপর পরিবার নিয়ে ফিরে আসেন দীঘিনালার বাড়িতে। বহু চেষ্টায় আর চাকরি পাননি।

মনিতা চাকমা প্রথম আলোকে বলেন, চাকরি না পেয়ে ২০২২ সালে নিজের চাষ করা মাত্র পাঁচ কেজি শিম নিয়ে প্রথমবার লারমা স্কয়ারে বসেন তিনি। এক ঘণ্টার মধ্যেই সব শিম বিক্রি হয়ে যায়। সেই থেকে শুরু। এখন নিজের উৎপাদিত সবজি বাদেও গ্রামের অন্য কৃষকের কাছ থেকে সবজি এনে বিক্রি করেন তিনি। এ ব্যবসাতেই এখন তাঁর সংসার চলছে।

‘স্বামী মারা যাওয়ার পর আট বছর ধরে এ বাজারে ব্যবসা করছি। দিনে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা লাভ হয়। এই আয়েই দুই মেয়েকে নিয়ে সংসার চলছে।’
কমলা ত্রিপুরা, বিক্রেতা, দীঘিনালার লারমা স্কয়ার বাজার

শুধু মনিতা চাকমা নন, প্রতিদিন তাঁর সঙ্গে আরও ৬০ থেকে ৭০ নারী এই বাজারে পসরা সাজিয়ে বসেন। পাহাড়ি উৎপাদিত তাজা শাকসবজি, চালতা, কমলা, কলা, পেঁপে, পেয়ারা, বরই, আমলকী, জুমের বিন্নি চাল, যব, তিল থেকে শুরু করে সবকিছু পাওয়া যায় এখানে। এ হাটের আসা অধিকাংশ ক্রেতাও নারী। এর বাইরে সাজেকগামী পর্যটকদেরও আকর্ষণ করে এ বাজার।

গতকাল শুক্রবার বাজারটিতে গিয়ে কথা হয় কমলা ত্রিপুরার (৪৮) সঙ্গে। তিনি জঙ্গলে পাওয়া একপ্রকারের আলু, জুমের কাঁচা ও শুকনা ছোট মরিচ নিয়ে বসেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর আট বছর ধরে এ বাজারে ব্যবসা করছেন তিনি। দিনে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা লাভ হয় তাঁর। এই আয়েই দুই মেয়েকে নিয়ে সংসার চলে তাঁর।

একই গল্প নন্দ রানী চাকমারও (৩৭)। ১২ বছর আগে তাঁর স্বামীর মৃত্যু হয়। এর পর থেকে তিনি স্থানীয় অন্য বাজার থেকে সবজি কিনে এনে এখানে বিক্রি করছেন। বিক্রির এ আয় দিয়েই তিনি একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন।

বীণা চাকমার গল্পটা অবশ্য ব্যতিক্রম। উচ্চমাধ্যমিক পাস করেও যখন কোথাও চাকরি পাননি, তখন বেকারত্বের তাড়নায় এ হাটে ব্যবসা শুরু করেন। এক হাজার টাকা দিয়ে শুরু করা এ উদ্যোক্তার এখন দিনে আয় হয় প্রায় ৭০০ টাকা। এ আয় দিয়েই তিনি স্নাতকোত্তর পাস করেছেন, ধরেছেন পরিবারের হাল।

খাগড়াছড়ির দীঘিনালার লারমা স্কয়ারে দেখা যায় এ দৃশ্য। সড়কের দুই পাশে বসা এ বাজার জমজমাট থাকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। পাহাড়ি নারীদের জীবিকার লড়াই, স্বপ্ন আর স্বাবলম্বিতার গল্প প্রতিদিন নতুন করে লেখা হয় এখানে।

শাপলা চাকমার (৫০) স্বামীর চাকরি নেই। উপজেলার শনখোলাপাড়ার পাহাড়ি এলাকা ঘুরে শাকসবজি সংগ্রহ করে প্রতিদিন লারমা স্কয়ারে এনে বিক্রি করেন তিনি। এই আয়েই সংসার চালান তিনি। তাঁর এক ছেলে খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজে পড়ছেন। একই ধরনের ভিন্ন সংগ্রামের গল্প শোনা যায় মল্লিতা চাকমা (২৮), যমুনা ত্রিপুরা (২৫), রনিকা চাকমা (৪১) ও আলপনা চাকমার (৬০) মুখেও। সংসারের বাড়তি আয়ের জন্য তাঁরা সবাই এই নারী হাটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।

বাজারটির অধিকাংশ ক্রেতাও নারী। খাগড়াছড়ি থেকে এ সড়ক দিয়েই প্রতিদিন তিনি তাঁর দীঘিনালার অফিসে যান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘লারমা স্কয়ারে সবজির দাম কম, সবই টাটকা। তাই প্রতিদিন এখান থেকেই বাজার করে নিয়ে যাই।’

সাজেক থেকে ফেরার পথে পর্যটকেরাও থামেন এই হাটে। ঢাকার বাসিন্দা ইয়াসমিন আক্তার বলেন, ‘এত টাটকা সবজি আর ফল আগে দেখিনি। দামও ঢাকার তুলনায় চার গুণ কম। রাস্তায় দুই পাশে বসায় আমরা সবজি, ফল আর বিন্নি চাল কিনে নিয়ে যাচ্ছি।’

তবে বাজার নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে বিক্রেতাদের মধ্যে। তাঁদের অভিযোগ, রোদে এখানে বসে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করা গেলেও বর্ষায় খোলা আকাশের নিচে বসা যায় না। বৃষ্টির পানিতে অনেক সময়ই পণ্য নষ্ট হয়ে যায়। তাঁরা একটি স্থায়ী ছাউনি চান।

দীঘিনালা উপজেলায় নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিল পারভেজ বলেন, বাজারে ছাউনির ব্যাপারে বাজার ফান্ড কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় বাজার চৌধুরীর (বাজার ব্যবস্থাপনার প্রধান স্থানীয়ভাবে বাজার চৌধুরী নামে পরিচিত) সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয় বোয়ালখালী বাজারের বাজার চৌধুরী জেসমিন চাকমা বলেন, নারীরা যে আজ আর পিছিয়ে নেই, তা লারমা স্কয়ারে এলেই বোঝা যায়। এখানে প্রত্যেক নারী বিক্রেতা একেকজন যোদ্ধা। তাঁরা নিজেরাই ব্যবসা করে সংসারের হাল ধরছেন, সন্তানদের পড়াচ্ছেন।