বিশ্ববাজারে মেহেরপুরের হিমসাগর আম, রপ্তানি বাড়াতে সরকারি সহায়তা চান চাষিরা

গাছে ঝুলছে হিমসাগর আম। ১৩ জুন সকালে মেহেরপুর সদর উপজেলার ঝাউবাড়িয়া গ্রামেছবি: প্রথম আলো

মেহেরপুরের আমবাগানগুলোয় এখন উৎসবের আমেজ। দেশীয় বাজারের পাশাপাশি জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) স্বীকৃতিপ্রাপ্ত মেহেরপুরের ঐতিহ্যবাহী ও সুস্বাদু হিমসাগর আমের স্বাদ পৌঁছে গেছে বিদেশে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এবার এই আম যুক্তরাজ্যে রপ্তানি করা হচ্ছে। তবে রপ্তানি কার্যক্রম আরও বাড়াতে সরকারি সহায়তা ও উদ্যোগ চান স্থানীয় আমচাষিরা।

হিমসাগার আম রপ্তানির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারের কঠোর স্বাস্থ্য ও গুণগত মান বজায় রাখতে এবার জেলার বাগানগুলোয় ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে আধুনিক ‘ফ্রুট ব্যাগিং’ (গাছে থাকা অবস্থায় ফলকে বিশেষ ধরনের ব্যাগ দিয়ে ঢেকে দেওয়া) পদ্ধতি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস ও বিমানবন্দরগুলোয় কার্গো–সুবিধা বাড়ানো না গেলে এই বিশাল আন্তর্জাতিক বাজার হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। সরকারি সুবিধা ও ব্র্যান্ডিং বাড়ালে এ খাতের রপ্তানি আয় বর্তমানের চেয়ে কয়েক গুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব।

মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে এই জেলায় মোট ২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের আমের আবাদ হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ অর্থাৎ ১ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতেই রয়েছে হিমসাগর আমের বাগান। এবার জেলায় প্রায় ৪০ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং এর মধ্যে হিমসাগর আমের উৎপাদন আশা করা হচ্ছে প্রায় ২৪ হাজার টন। ধারণা করা হচ্ছে, চলতি মৌসুমে জেলায় উৎপাদিত মোট আমের সম্ভাব্য বাজারমূল্য ১৬০ থেকে ১৭০ কোটি টাকায় পৌঁছাবে।

মেহেরপুরের বিভিন্ন উপজেলা ও গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, আম সংগ্রহ, বাছাই ও প্যাকেজিংয়ের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন বাগানমালিক ও শ্রমিকেরা। এবারের ফলন ও আন্তর্জাতিক বাজার নিয়ে তাঁরা নানা অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।

গাছ থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে হিমসাগর আম। ১৩ জুন সকালে মেহেরপুর সদর উপজেলার ঝাউবাড়িয়া গ্রামে
ছবি: প্রথম আলো

সদর উপজেলার ঝাউবাড়িয়া গ্রামের বাগানমালিক মিলন বিশ্বাস ও শাহিনুজ্জামান জানান, তাঁরা কয়েক বছর ধরে ইউরোপের বাজারে আম পাঠাচ্ছেন। এবার মৌসুম শুরু হওয়ার প্রায় এক মাস আগে বিদেশি ক্রেতারা সরাসরি তাঁদের বাগানে এসে আম উৎপাদন, মাটির গুণ এবং ফ্রুট ব্যাগিংয়ের প্রক্রিয়া দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। চলতি মৌসুমে তাঁদের বাগান থেকে ৫ থেকে ৭ টন করে হিমসাগর আম যুক্তরাজ্যে রপ্তানি করার চুক্তি কৃষি বিভাগের সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে। তবে তাঁরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পচনশীল এই পণ্য ঢাকায় পাঠানোর পর বিমানবন্দরে দীর্ঘ সময় আটকে থাকে। কাস্টমস ও কার্গো জটিলতায় আম নষ্ট হলে পুরো লোকসান চাষিদের ঘাড়ে আসে। সরকার যদি বিমানবন্দরে আমের জন্য আলাদা ‘গ্রিন চ্যানেল’ বা অগ্রাধিকার সুবিধা দিত, তবে রপ্তানির পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে যেত।

একই এলাকার বাগানমালিক নিসাব হায়দার বলেন, ফ্রুট ব্যাগিং করায় এবার আমের ফলন নিখুঁত ও বিষমুক্ত হয়েছে। এতে সাধারণ আমের চেয়ে কেজিতে ২০-৩০ টাকা বেশি দামে এই আম দেশি-বিদেশি বাজারে বিক্রি হচ্ছে। সুবিদপুর গ্রামের আমচাষি আবদুল জলিল বলেন, এলাকায় কোনো হিমাগার না থাকায় আম পেড়েই সরাসরি ট্রাকে করে দূরদূরান্তে পাঠাতে হচ্ছে। এলাকায় একটি হিমাগার স্থাপন করা জরুরি।

আমের বাজার ও বিপণনব্যবস্থা নিয়ে আমঝুপি বাজারের আম ব্যবসায়ী ও আড়তদার ফয়সাল মিয়া বলেন, হিমসাগর আমের সুনাম দেশজুড়ে থাকায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট থেকে বড় বড় পাইকারেরা এসে আস্ত বাগান কিনে নিচ্ছেন। ফ্রুট ব্যাগিংয়ের কারণে এবার আমের মান অনেক ভালো হলেও ব্যবসার বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবহন খরচ। তেলের দাম বাড়ায় ঢাকা পর্যন্ত ট্রাকভাড়া অনেক বেশি পড়ছে। তার ওপর রাস্তায় নানা ধরনের হয়রানি ও চাঁদাবাজির মুখে পড়তে হয়। যদি নির্বিঘ্নে আম পরিবহনের ব্যবস্থা করা যায় এবং বড় কোম্পানিগুলো সরাসরি মাঠ থেকে আরও বেশি আম কিনে, তবে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন। সেই সঙ্গে তিনি সরকারিভাবে মেহেরপুরে একটি স্থায়ী ‘আম প্রসেসিং জোন’ তৈরির দাবি জানান।

রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধি ফোয়াদ রেহমান বলেন, হিমসাগরের পাল্প বা শাঁসের ভেতরের অংশ ঘন, আঁশহীন ও সুগন্ধ অতুলনীয়, যার চাহিদা রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে। তবে বিদেশি ক্রেতারা রোগমুক্ত আমের বিষয়ে কোনো আপস করেন না। মেহেরপুরের চাষিরা উত্তম কৃষিপদ্ধতি (গ্যাপ) সনদ পাওয়ায় এই বাজার দিন দিন বড় হচ্ছে। সরকার যদি আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর সঙ্গে চুক্তি করে আম পরিবহনের জন্য বিশেষ বিমান বা জায়গা বরাদ্দ দেয়, তবে প্রতিবছর মেহেরপুর থেকেই শতকোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।

গাছ থেকে আম সংগ্রহের পর আড়তে এনে রাখা হয়েছে। ১৩ জুন দুপুরে মেহেরপুর সদর উপজেলার ঝাউবাড়িয়া গ্রামে
ছবি: প্রথম আলো

মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক ও কৃষিপণ্য রপ্তানি কার্যক্রমের সমন্বয়ক শায়খুল ইসলাম বলেন, মেহেরপুর থেকে বাণিজ্যিকভাবে বিদেশে আম রপ্তানির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০১৫ সাল থেকে। ওই বছর মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক’-এর যৌথ উদ্যোগে জেলার ১৫টি আমবাগানকে রপ্তানি উপযোগী হিসেবে নির্বাচন করা হয়। ২০১৬ সালে মেহেরপুর থেকে প্রথমবারের মতো প্রায় ১২ মেট্রিক টন হিমসাগর আম ইউরোপের বাজারে পাঠানো হয়। কৃষি বিভাগের তত্ত্বাবধানে শতভাগ নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করে প্রতিবছর মে-জুন মাস থেকে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসে এই আম রপ্তানি করা হচ্ছে। তবে চলতি মৌসুমে এই আম শুধু যুক্তরাজ্যে রপ্তানি করা হচ্ছে। কৃষি বিভাগ ২০ মেট্রিক টন আম রপ্তানির আবেদন করেছিল। কিন্তু তারা মাত্র ৫-৭ মেট্রিক টন নিচ্ছে।

মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সঞ্জীব মৃধা বলেন, নিরাপদ আম উৎপাদনে কৃষি বিভাগ চাষিদের কারিগরি প্রশিক্ষণ ও গ্যাপ বাস্তবায়নে সার্বিক সহযোগিতা দিচ্ছে। চাষিদের রপ্তানি বৃদ্ধির দাবিকে যৌক্তিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোল্ড চেইন লজিস্টিকস, বিমানবন্দরে দ্রুত শুল্কায়ন ও কার্গো স্পেস সহজলভ্য করা গেলে হিমসাগর আম রপ্তানি বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব। এ বিষয়ে ইতিমধ্যেই সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে।