সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে নিহত: আত্রাইয়ে একসঙ্গে সাতজনের জানাজা
সৌদি আরবে কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৬ বাংলাদেশির মধ্যে পরিচয় শনাক্ত হওয়া আটজনের মরদেহ নিজ নিজ এলাকায় দাফন করা হয়েছে। এর মধ্যে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার সাতজনের জানাজা আজ শুক্রবার সকালে একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়।
এ ছাড়া রাজশাহীর বাগমারার শ্যামল উদ্দিন মাঝির (৪৬) জানাজা শেষে বেলা পৌনে ১১টার দিকে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। আর নাটোরের নলডাঙ্গার রবিউল ইসলামের (২৮) জানাজা সকাল ১০টার দিকে উপজেলার মহিষডাঙ্গা ভাটোপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। পরে স্থানীয় কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ
আজ শুক্রবার সকাল ১০টায় আত্রাই উপজেলা সদরের মোল্লা আজাদ মেমোরিয়াল সরকারি কলেজ মাঠে সাতজনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, স্বজনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
নিহত সাতজন হলেন আত্রাই উপজেলার উদনপৈ গ্রামের মো. ফরিদ, গণ্ডগোহালী গ্রামের রুবেল প্রামাণিক, কলিমউদ্দিন ইসলাম, মোহন আলী ও তাঁর ছোট ভাই সুমন আলী, ডুবাই গ্রামের সোহেল রানা এবং পারকাসুন্দা গ্রামের আবদুল জলিল সরকার।
জানাজায় উপস্থিত ছিলেন নওগাঁ-৬ (আত্রাই ও রানীনগর) আসনের সংসদ সদস্য শেখ রেজাউল ইসলাম, নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিরুজ্জামানসহ অনেকে।
আমার দুই ছেলে একসঙ্গে চলে গেছে। এটাই হয়তো আল্লাহর ফয়সালা। আপনারা সবাই দোয়া করবেন, তাঁদের ক্ষমা করে দেবেন।গুফফার প্রামাণিক, গণ্ডগোহালী গ্রামের নিহত সহোদর মোহন আলী ও সুমন আলীর বাবা
জানাজার আগে একে একে নিহত সাতজনের খাটিয়া পাশাপাশি রাখা হয়। এ সময় গণ্ডগোহালী গ্রামের নিহত সহোদর মোহন আলী ও সুমন আলীর বাবা গুফফার প্রামাণিক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার দুই ছেলে একসঙ্গে চলে গেছে। এটাই হয়তো আল্লাহর ফয়সালা। আপনারা সবাই দোয়া করবেন, তাঁদের ক্ষমা করে দেবেন।’
গুফফার প্রামাণিকের এই আকুতি ও উপস্থিত মানুষের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। জানাজা শেষে মরদেহগুলো নিজ নিজ গ্রামে নিয়ে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে পরিচয় শনাক্ত হওয়া নয়জনের মরদেহ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। তাঁদের মধ্যে আত্রাইয়ের সাতজন ছাড়াও নাটোরের নলডাঙ্গার রবিউল ইসলাম ও রাজশাহীর বাগমারার শ্যামল উদ্দিনের মরদেহ ছিল।
৯ আগস্ট রিয়াদের মানফুয়া এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত হন। পরে সৌদি কর্তৃপক্ষ ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙুলের ছাপ পরীক্ষার মাধ্যমে নয়জনের পরিচয় শনাক্ত করে।
তবে এখনো সাতজনের পরিচয় শনাক্ত হয়নি। তাঁদের মরদেহ দ্রুত শনাক্ত করে দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্বজনেরা।
আত্রাই উপজেলার মধ্যবোয়ালী গ্রামের নিহত মিনহাজের মা পারুল বিবি বলেন, ‘হামার ছাওয়ালের লাশ নাকি শনাক্ত হয়নি। এ জন্য পরে আসবে। সরকারের কাছে হামার আবদার, হামার ছেলের লাশ যেন দ্রুত নিয়ে আসে। হামার তো সব শেষ হয়ে গেছে। এখন শেষবারের মতো ছেলেটাক একনজর দেখতে মনটাকে আর স্থির রাখতে পারোছি না।’
নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, অগ্নিকাণ্ডে নিহত নওগাঁর বাকি ছয় বাসিন্দার পরিচয় শনাক্ত ও তাঁদের মরদেহ দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়াও চলছে। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হচ্ছে।
বাগমারায় শ্যামলের বাড়িতে মাতম
রাজশাহীর বাগমারার ঝিকড়া ইউনিয়নের মরুগ্রাম ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে আজ ভোরে পৌঁছায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত শ্যামল উদ্দিন মাঝির মরদেহ। বাড়ির বারান্দায় চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে ছিলেন তাঁর স্ত্রী রশিদা খাতুন। পাশে থাকা নারীরা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
রশিদা খাতুনের নিজের ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও এখন দুশ্চিন্তা। তিন মেয়ের বাবা শ্যামল সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে আট বছর আগে ধারদেনা করে সৌদি আরবে পাড়ি দিয়েছিলেন।
আজ সকালে শ্যামলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ঘরের ভেতরে কফিন রাখা হয়েছে। আশপাশের লোকজন সেটি ঘিরে আছেন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশের উপস্থিতিতে কফিন খোলা হলে পোড়া মুখ দেখে স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। শ্যামলের স্ত্রী রশিদা খাতুন অচেতন হয়ে পড়েন। ছোট মেয়ে বাবার মরদেহের কাছে যেতেই পারেনি; ঘরের ভেতরেই বসে ছিল।
শ্যামলের শাশুড়ি মোমেনা বেগম লাঠিতে ভর করে মরদেহের পাশে ঘোরাফেরা করছিলেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা লেকালেকি কইরা তাড়াতাড়ি লাশ আইনা দিলেন, সরকার হামার জামাইক দেশেত কবর দেওয়ার সুযোগ কইরা দিলো।’
শ্যামলের বড় বোন হালিমা খাতুন (৪৯) ভাইয়ের কফিন ধরে কান্না করছিলেন। ভাইয়ের রেখে যাওয়া সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং তাঁর ঋণের টাকা কীভাবে পরিশোধ হবে, তা নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন।
ঝিকড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা সাইদুজ্জামান বলেন, অল্প সময়ের মধ্যে শ্যামলের মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা করায় তাঁরা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ। একই সঙ্গে তিনি পরিবারের জন্য সরকারি আর্থিক সহায়তার দাবি জানান।
ঋণ পরিশোধ নিয়ে রবিউলের পরিবারে দুশ্চিন্তা
একই দুর্ঘটনায় নিহত রবিউল ইসলামের (২৮) জানাজা আজ সকাল ১০টার দিকে নলডাঙ্গা উপজেলার খাজুরা ইউনিয়নের মহিষডাঙ্গা ভাটোপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। পরে স্থানীয় কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
জানাজায় নলডাঙ্গা উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীম হোসেন, উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুল ইসলাম, খাজুরা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান সোহরাব হোসেন, খাজুরা ইউনিয়ন বিএনপি নেতা আবদুর রহিম, সাবেক চেয়ারম্যান জহুরুল ইসলাম ভুট্টুসহ স্থানীয় শত শত মুসল্লি অংশ নেন।
রবিউলের বাবা আশরাফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, পাঁচ বছর আগে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ করে ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন। দালাল চক্রের মাধ্যমে সৌদি যাওয়ার পর প্রথম তিন বছর রবিউল আকামা পাননি। এ কারণে নিয়মিত কাজ করতে পারেননি এবং তেমন আয়ও করতে পারেননি। তাঁর পাঠানো টাকা দিয়ে কিছু ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে। বাকি ঋণও পরিশোধ করে দেশে ফিরে ঘরবাড়ি করার ইচ্ছা ছিল রবিউলের।
ছেলেকে হারিয়ে এখন বাকি ঋণ কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন আশরাফুল ইসলাম।
ভারপ্রাপ্ত ইউএনও শামীম হোসেন বলেন, রবিউল ছাড়াও একই ঘটনায় খাজুরা ইউনিয়নের দীঘিরপাড় গ্রামের জাকির আলীর ছেলে শামীম হোসেন (৩৫) এবং শ্রীপুরপাড়ার গোলাম রব্বানীর ছেলে সাব্বির হোসেন মারা গেছেন। তাঁদের মরদেহ এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে তাঁদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা যায়নি।