নেত্রকোনা শহর বাইপাস: দেড় বছরের কাজ শেষ হয়নি সাত বছরেও
১৩ দশমিক ২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বাইপাস সড়কের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ২৯৪ কোটি টাকা।
নেত্রকোনা শহরের যানজট কমাতে সাত বছর আগে ১৩ দশমিক ২ কিলোমিটার বাইপাস সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৯৪ কোটি টাকা। কথা ছিল, কাজটি দেড় বছরের মধ্যে শেষ হবে। কিন্তু সাত বছর পরও কাজটি শেষ হয়নি।
এর মধ্যে সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে তিন দফা। প্রকল্পের কাজ চারটি প্যাকেজে (ভাগে) হচ্ছে। এর মধ্যে দুটির কাজ প্রায় শেষ হলেও অন্য দুটির অগ্রগতি সামান্য।
ঠিকাদারদের নিয়মিত বিল দেওয়া হচ্ছে। কাজের গতি বাড়াতে তাঁদের অন্তত ১২ বার চিঠি দিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। তৃতীয় প্যাকেজের কাজ নিয়ে ঠিকাদার সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছেন।মো. ইলিয়াস হোসেন, নির্বাহী প্রকৌশলী, সওজ, নেত্রকোনা
বাইপাস সড়কটি চালু হলে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরি, বারহাট্টা, সদর ও কলমাকান্দার পাশাপাশি সুনামগঞ্জের তাহিরপুর, মধ্যনগর ও ধর্মপাশার যানবাহন নেত্রকোনা শহরের ভেতর দিয়ে না গিয়ে বিকল্প পথে চলাচল করতে পারবে। বর্তমানে শহরের প্রধান সড়ক ব্যবহারে এসব যানবাহন চলাচল করায় গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে প্রায়ই যানজট হচ্ছে।
কলমাকান্দার ঘনিচা গ্রামের বাসিন্দা ফরিদ তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাইপাস সড়কটি হলে শহরের যানজট অনেকটাই কমত। কিন্তু বছরের পর বছর কাজ চললেও শেষ হচ্ছে না। আমাদের দুর্ভোগও কমছে না।’
সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) সূত্রে জানা গেছে, নেত্রকোনা সদর উপজেলার চল্লিশা-কুনিয়া-মেদনী-বাংলা বাজার বাইপাস সড়ক নির্মাণ প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায় ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে। ২০২১ সালের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল।
চারটি প্যাকেজের এই প্রকল্পে মোট বরাদ্দ ২১১ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এটি চার ভাগ করে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। প্রথম প্যাকেজে প্রায় ৩ কিলোমিটার সড়কের কাজ ৩৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকায় পায় রানা বিল্ডার্স অ্যান্ড তাহের ব্রাদার্স। দ্বিতীয় প্যাকেজে সাড়ে ৪ কিলোমিটার সড়কের কাজের ব্যয় ধরা হয় ৯৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এই কাজ পায় তাহের ব্রাদার্স। তৃতীয় প্যাকেজে সাড়ে ৪ কিলোমিটার সড়কের কাজ ৫৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকায় পায় জামিল ইকবাল। আর চতুর্থ প্যাকেজে ১ দশমিক ৯ কিলোমিটার সড়কের কাজ ২৬ কোটি ৮০ লাখ টাকায় পায় মোস্তফা জামান ট্রেডার্স লিমিটেড।
সওজের সর্বশেষ অগ্রগতি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ও দ্বিতীয় প্যাকেজের কাজের অগ্রগতি ৯২ শতাংশ করে। তৃতীয় প্যাকেজের কাজ হয়েছে ৪৬ শতাংশ এবং চতুর্থ প্যাকেজের অগ্রগতি মাত্র ২৮ শতাংশ। অবশ্য চতুর্থ প্যাকেজের কার্যাদেশ অন্যগুলোর চেয়ে বেশ কিছুদিন পর দেওয়া হয়। তৃতীয় দফায় মেয়াদ বাড়ানোর পর গত ৩০ জুন প্রকল্পের কাজ শেষ করার সময়সীমা ছিল। এরপরও কাজ শেষ না হওয়ায় চতুর্থ দফায় মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে।
সরেজমিন যা দেখা গেল
৭ অক্টোবর সরেজমিন দেখা যায়, সড়কের বিভিন্ন অংশে নির্মাণকাজ বন্ধ আছে। চল্লিশা থেকে কুনিয়া পর্যন্ত অংশের কাজ প্রায় শেষ। তবে শালজান, পূর্বপুকুরিয়া, গজিনপুর, মেদনী, কৃষ্টপুর ও বাংলা বাজার অংশে কাজের অগ্রগতি সামান্য। প্রায় ছয় কিলোমিটার অংশে কোথাও ম্যাকাডাম (পাথর ও খোয়া ফেলা) করা হয়েছে, কোথাও বালু-পাথর ফেলা হয়েছে, আবার কোথাও এখনো মাটি ফেলে রাখা হয়েছে।
পূর্বপুকুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা রমজান মিয়া বলেন, ‘ঠিকাদারের লোকজন ঢিলেঢালাভাবে কাজ করতাছে। সড়কের উচ্চতা ঠিকভাবে করা হইতাছে না। সেতু-কালভার্ট নিচু করে নির্মাণ করা হইতাছে। আমরা বাধা দিলেও কোনো লাভ হয় নাই।’
সড়কের কাজটি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। আমরা রীতিমতো অতিষ্ঠ। সড়ক চালু হলে দূরপাল্লার ও পণ্যবাহী যানবাহন শহরের ভেতরে ঢুকবে না। এতে শহরের প্রধান সড়কে যানবাহনের চাপ কমবে, যানজটও কমবে।
মেদনী নয়াপাড়া গ্রামের কৃষক হাসেম উদ্দিন বলেন, প্রায় আট মাস আগে ঠিকাদারের লোকজন কিছু মাটি ফেলে যাওয়ার পর আর কাজ করেননি। এ এলাকার অনেক মানুষ এখনো অধিগ্রহণের টাকা পুরোপুরি পাননি বলেও জানান তিনি।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের জন্য ৬১ একর জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া ২০১৯ সালের জুনে শুরু করে জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা। অধিগ্রহণ বাবদ ৮২ কোটি টাকা বরাদ্দ আছে। এরই মধ্যে অধিকাংশ জমির টাকা বিতরণ করা হয়েছে। কিছু জমির কাগজপত্রে জটিলতা থাকায় সেগুলোর টাকা এখনো দেওয়া সম্ভব হয়নি।
নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বাইপাস সড়কের জমি অধিগ্রহণের টাকা বিতরণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। কিছু জায়গায় কাগজপত্রে সমস্যা আছে। সেগুলো সমাধান হলে জমির মালিকদের টাকা দেওয়া হবে। এত দিনেও সড়কের নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ার বিষয়টি আগামী উন্নয়ন সমন্বয় সভায় আলোচনা করা হবে বলে তিনি জানান।
ঠিকাদারকে ১২ বার সতর্ক
নেত্রকোনা সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইলিয়াস হোসেন জানান, সড়কটির কাজ দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে। ঠিকাদারদের নিয়মিত বিল দেওয়া হচ্ছে। কাজের গতি বাড়াতে অন্তত ১২ বার চিঠি দিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। তৃতীয় প্যাকেজের কাজ নিয়ে ঠিকাদার সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছেন বলে অভিযোগ তাঁর। কাজটি বাতিল করার জন্য প্রস্তুতি চলছে বলে তিনি জানান।
এ বিষয়ে তৃতীয় প্যাকেজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জামিল ইকবালের কারও সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। চতুর্থ প্যাকেজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মোস্তফা জামান ট্রেডার্সের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরিফ হোসেন বলেন, তাঁদের প্যাকেজের কাজ কিছুদিনের মধ্যেই শুরু হবে। বর্ষার কারণে কাজ করতে সমস্যা হচ্ছিল। এ ছাড়া প্রকল্পের
২৪ শতাংশ অর্থ এখনো তাঁরা পাননি বলে অভিযোগ করেন।
বাইপাস সড়কটি দীর্ঘ সময়েও তৈরি না হওয়ায় ভোগান্তির কথা জানান নেত্রকোনা শহরের উকিলপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. আবু বক্কর। তিনি বলেন, ‘সড়কের কাজটি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। আমরা রীতিমতো অতিষ্ঠ। সড়ক চালু হলে দূরপাল্লার ও পণ্যবাহী যানবাহন শহরের ভেতরে ঢুকবে না। এতে শহরের প্রধান সড়কে যানবাহনের চাপ কমবে, যানজটও কমবে। শহরের মানুষের চলাচল নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক হবে।’