গুদামঘরের বারান্দাই শেষ আশ্রয় বৃদ্ধ শাহাবানুর
পাবনার বেড়া বাজারের নাজিমবাজার এলাকা। স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর গুদামঘরের বারান্দায় কাঠের একটি চৌকি। তার ওপর কাঁথা-বালিশ। সেটিই এখন প্রায় ৭৫ বছর বয়সী শাহাবানু খাতুনের বিছানা। আর গুদামঘরের ওই বারান্দাই তাঁর ঘর, তাঁর আশ্রয়। এলাকায় অবশ্য শাহাবানু নামে তাঁকে খুব কম মানুষই চেনেন। সবার কাছে তিনি ‘শকেরের মা’।
বারান্দার এক পাশে বসে থাকেন শাহাবানু। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে। ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না। দুর্বল হয়ে পড়েছে স্মৃতিও। অনেক পুরোনো কথা মনে করতে পারেন, আবার অনেক কিছুই ভুলে যান। বৃষ্টি এলে বারান্দার ফাঁক দিয়ে ছিটকে আসা পানিতে ভিজে যায় তাঁর বিছানা। শীতের রাতে ঠান্ডা বাতাস ঢোকে অবাধে। তবু এই বারান্দাটুকুই এখন তাঁর জীবনের শেষ ঠিকানা।
শাহাবানুর স্বামী মারা গেছেন প্রায় ৩৫ বছর আগে। বেড়া বাজারে কুলির কাজ করতেন তিনি। স্বামীর মৃত্যুর পর অন্যের বাড়ি ও দোকানে কাজ করে দুই ছেলেকে বড় করেছেন শাহাবানু। তখন তাঁর নিজেরও সংসার ছিল, কাজ করার শক্তি ছিল। অভাব ছিল, কিন্তু মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজের সামর্থ্য হারান তিনি। কখনো মানুষের কাছে চেয়ে খাবার জুটত, কখনো ভিক্ষা করে দিন চলত। একসময় দুই ছেলেও সংসার আলাদা করেন। বড় ছেলে শকের হোসেন (৫২) শ্রমিকের কাজ করতেন। সাত-আট বছর আগে তিনি মারা যান। ছোট ছেলে শুকুর আলী (৪০) রিকশা চালান। পাশের সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অন্যের জায়গায় ঘর তুলে থাকেন। নিজের সংসারই চলে কষ্টে। মায়ের জন্য আলাদা করে থাকার ব্যবস্থা করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি।
শুকুর আলী বলেন, ‘রিকশা চালায়ে যা আয় হয়, তা দিয়্যা কোনোরকমে নিজের সংসার চালাই। নিজেরই থাকার ভালো ব্যবস্থা নাই। মাকে আমার কাছে রাখার মতো অবস্থাও নাই। তবে মাঝেমধ্যে আইস্যা মাকে দেইখ্যা যাই।’
বৃষ্টিতে ভিজে যায় বিছানা
যে বারান্দায় শাহাবানু থাকেন, সেটির মালিক স্থানীয় ব্যবসায়ী শহীদুল ইসলাম। মানবিক কারণে তিনি তাঁকে সেখানে থাকতে দিয়েছেন। আগে বারান্দার স্যাঁতসেঁতে মেঝেতেই রাত কাটাতেন শাহাবানু। তাঁর কষ্ট দেখে স্থানীয় স্কুলশিক্ষক অমিয় রাহা একটি কাঠের চৌকি কিনে দেন। স্থানীয় কয়েকজন কাঁথা-বালিশও দিয়েছেন। এর পর থেকে চৌকিটিই তাঁর বিছানা।
অমিয় রাহা বলেন, ‘শাহাবানু খাতুনের জীবনের শেষ সম্বল এখন এই বারান্দাটুকুই। বৃষ্টি এলে তাঁর বিছানা ভিজে যায়, শীত এলে সেখানে হিমেল বাতাস ঢোকে। তাঁর চাওয়া খুব বেশি নয়—মাথা গোঁজার একটি নিরাপদ জায়গা আর নিয়মিত দুবেলা খাবার। আমিসহ এলাকার লোকজন যত দূর পারি তাঁর পাশে থাকার চেষ্টা করি।’
শাহাবানুর দিন কাটে মানুষের সাহায্যের ওপর। শরীর ভালো থাকায় আগে বিভিন্ন বাড়ি ও দোকানে গিয়ে চেয়ে খাবার জোগাড় করতেন। এখন হাঁটতেই পারেন না। কোনো কোনো দিন খাবারও জোটে না। স্থানীয় কেউ খাবার দিলে খান, না দিলে না খেয়েই থাকতে হয়। শাহাবানু বলেন, ‘আমার থাকার জায়গা নাই। এইখানেই থাকি। বৃষ্টি আলি বিছানা ভিইজ্যা যায়। শরীরও ভালো না। মানুষ খাবার দিলে খাই, না দিলে কোনো কোনো দিন না খায়াই থাকি।’
তারপর কিছুক্ষণ চুপ থাকেন শাহাবানু। স্মৃতি থেকে পুরোনো দিনের কথা মনে করে বলেন, ‘আগে স্বামী-সন্তান নিয়্যা সংসার ছিল। অভাব ছিল, কিন্তু তখন একা ছিল্যাম না।’
বন্ধ হয়ে গেছে বয়স্ক ভাতাও
স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, একসময় শাহাবানু বয়স্ক ভাতা পেতেন। কিন্তু প্রায় দুই বছর ধরে সেই ভাতা আর পাচ্ছেন না। মুঠোফোন নম্বরের জটিলতা বা অন্য কোনো কারণে ভাতা বন্ধ হয়ে থাকতে পারে বলে স্থানীয় লোকজনের ধারণা। শাহাবানু নিজেও ঠিক বলতে পারেন না, কী কারণে তাঁর ভাতা বন্ধ হয়েছে।
গুদামঘরের মালিক শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘বছর দুয়েক আগেও আমি তাঁকে বয়স্ক ভাতা পেতে দেখেছি। এখন আর পান না। বিষয়টি কেন বন্ধ হয়েছে, তা জানি না। বৃদ্ধ মানুষটি কোথায় যাবেন? নিজের কোনো জায়গা নেই। তাই এখানে থাকতে দিয়েছি। যতটা পারি খোঁজখবর রাখি। তাঁর একটা স্থায়ী আশ্রয় দরকার।’
স্থানীয় লোকজনের দাবি, সমাজসেবা কার্যালয় থেকে শাহাবানুর বিষয়ে খোঁজ নেওয়া দরকার। আগে ভাতা পেয়ে থাকলে কেন বন্ধ হয়েছে, তা যাচাই করে দ্রুত আবার চালু করা উচিত।
আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার আশ্বাস
বেড়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে জানান, শাহাবানুর বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না। তিনি আগে বয়স্ক ভাতা পেয়ে থাকলে কী কারণে তা বন্ধ হয়েছে, তা যাচাই করা হবে। আর ভাতা না হয়ে থাকলে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সমাজসেবা কার্যালয়ের আওতায় আশ্রয়হীন বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য পাবনায় একটি বৃদ্ধনিবাস রয়েছে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, প্রয়োজনে সেখানে তাঁর থাকার ব্যবস্থাও করা হবে। এ বিষয়ে সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।