বাংলাদেশি শিল্পীর ‘ও আরাকান’ যেভাবে রোহিঙ্গাদের প্রাণের গান হয়ে উঠল

‘ও আরাকান’ গানের গীতিকার ও সুরকার শাহীন আবরারছবি: সংগৃহীত

আশ্রয়শিবিরের গলির চা–দোকানে টেবিল চাপড়ে গান গাইছেন কয়েকজন তরুণ। ‘ও আরাকান, হান্দে যে দিলহান, হতদিন তোয়ার ন দেখি মুখহান’(ও আরাকান কাঁদে যে হৃদয়, কত দিন তোমার মুখখানা দেখি না)। গান শুনে থমকে দাঁড়াতে হয়। ছেড়ে আসা স্বদেশের জন্য এমন আবেগ জড়ানো গান খুব বেশি শোনা হয়নি। সম্প্রতি রোহিঙ্গা শিবিরে গেলেই গানটি শোনার অভিজ্ঞতা হচ্ছে। বলা যায়, গানটি এখন এই জনগোষ্ঠীর প্রাণের গানে পরিণত হয়েছে। অথচ এটি কোনো রোহিঙ্গার রচিত নয়। এক বাংলাদেশি তরুণ গানটি রচনা ও সুরারোপ করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এই গানের গীতিকার ও সুরকার কক্সবাজারের উপজেলা কুতুবদিয়ার এক তরুণ সংগীতশিল্পী। নাম শাহীন আবরার (২৮)। এই গান রোহিঙ্গাদের কাছে কতটা জনপ্রিয়, সেটা বোঝা যায় ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা গণহত্যা দিবসের দিনের অনুষ্ঠান সূচির দিকে তাকালে। রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো নির্মম গণহত্যার ৯ বছর পূর্তির ওই বিশেষ দিনে আশ্রয়শিবিরগুলোতে গাওয়া হয়েছিল শাহীন আবরারের ‘ও আরাকান…’ গানটি। রোহিঙ্গা ও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত এই গান দ্রুতই মানুষের মন জয় করে নিয়েছে। সমানতালে শুনছেন বাংলাদেশিরাও। কীভাবে রচিত হলো এই গান, সে কথা শাহীন নিজের মুখেই বললেন।

পেছনের কথা

কুতুবদিয়ার আজম কলোনি গ্রামের সন্তান শাহীন আবরার। ছোটবেলায় গানের তালিম নেন স্থানীয় দুই সংগীতশিক্ষক সমীর পাল ও সিরাজুল ইসলামের কাছে। চার ভাই দুই বোনের মধ্যে পঞ্চম শাহীন আবরার বলেন, ‘মাস্টার্স শেষ করে ২০২২ সালে আমি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কোস্ট ফাউন্ডেশনে চাকরি পাই। ক্যাম্পের বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত থাকার সুবাদে তখন থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মেলামেশা শুরু। রোহিঙ্গাদের দৈনন্দিন জীবন, তাদের চোখের জল, জন্মভূমির টান, দুঃখ-বেদনা কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। এই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আমার মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। একজন সংবেদনশীল শিল্পী হিসেবে উপলব্ধি করি, সংগীতের কাজ কেবল বিনোদন দেওয়া নয়, বরং সমাজের সমসাময়িক সংকট ও মানুষের মানবিক ট্র্যাজেডিকে তুলে ধরা।’

২০২৫ সালের আগস্ট মাস। রোহিঙ্গারা ২৫ আগস্ট ‘গণহত্যা দিবস’ উদ্‌যাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ভাবলেন, সেই দিন সামনে রেখে এমন একটি গান রচনা করা দরকার, যে গান শুনে রোহিঙ্গারা জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার তাগিদ অনুভব করবে। গানটি রোহিঙ্গাদের মনের কথা বলবে। সেই ইচ্ছারই প্রতিফলন ‘ও আরাকান’ গানটি। গানটি রচনায় তিনি সহায়তা নিয়েছিলেন রোহিঙ্গা শিল্পী রোহেল খানের। গানটিতে মূলত রোহিঙ্গা ভাষা ও আঞ্চলিক চাটগাঁইয়া বুলির মিশ্রণ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

শাহীন আবরার এই গান রচনা করেই ক্ষান্ত হননি। তিনি এই গানে কয়েকজন রোহিঙ্গা তরুণকেও সম্পৃক্ত করেছেন। তাঁদের মধ্য থেকেই ক্যাম্পে ক্যাম্পে ছড়ায় এই গান। গত এক বছরে এই গানই রোহিঙ্গাদের প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছে।

গিটার হাতে শিল্পী শাহীন আবরার, পেছনে চার রোহিঙ্গা শিল্পী। সবার কণ্ঠে ‘ও আরাকান গান’। গত ২৪ আগস্ট দুপুরে উখিয়ার একটি পাহাড়ে
ছবি: প্রথম আলো

শাহীন বলেন, একজন বাংলাদেশি শিল্পীর আন্তরিক ও সহমর্মিতাপূর্ণ উদ্যোগ রোহিঙ্গাদের মনে গভীর রেখাপাত করেছে। আসলে, শিল্পের কোনো ভৌগোলিক সীমানা বা দেয়াল নেই। আশ্রয়শিবিরে গেলেই রোহিঙ্গা শিশু-কিশোরেরা শিল্পী শাহীন আবরারকে ঘিরে ধরে—গেয়ে ওঠেন, ‘ও আরাকান. . ।’ বয়স্করাও অনুরোধ করেন গানটির কয়েকটা লাইন গেয়ে শোনাতে। শাহীন আবরার তাতে না করেন না।

শাহীন আবরার প্রথম আলোকে বলেন, উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে বর্তমানে ১৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে হয়তো একদিন সবাই আরাকানে (রাখাইন) ফিরে যাবে। ফিরে যাওয়ার এই আশাকে উজ্জীবিত করতে তিনি রোহিঙ্গা ভাষায় ‘একদিন আরাকান শহরত ফিরে যাইয়্যুম’ এবং নিজ ভূমিতে ফিরতে রোহিঙ্গা তরুণদের উৎসাহিত করতে ‘মুম-মিখ্যা চল’ এমন দুটি গান রচনা করেছেন। এই গান দুটিও রোহিঙ্গাদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তবে ‘ও আরাকান’ সবার শীর্ষে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এই গানের গীতিকার ও সুরকার কক্সবাজারের উপজেলা কুতুবদিয়ার এক তরুণ সংগীতশিল্পী। নাম শাহীন আবরার (২৮)। এই গান রোহিঙ্গাদের কাছে কতটা জনপ্রিয়, সেটা বোঝা যায় ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা গণহত্যা দিবসের দিনের অনুষ্ঠান সূচির দিকে তাকালে। রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো নির্মম গণহত্যার ৯ বছর পূর্তির ওই বিশেষ দিনে আশ্রয়শিবিরগুলোতে গাওয়া হয়েছিল শাহীন আবরারের ‘ও আরাকান…’ গানটি। রোহিঙ্গা ও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত এই গান দ্রুতই মানুষের মন জয় করে নিয়েছে।

২৪ আগস্ট শাহীন আরববার প্রথম আলোর জন্য ‘ও আরাকান’ গানটি গেয়ে শোনান উখিয়ার একটি পাহাড়ি এলাকায়। পাহাড়ের পেছনে ছিল রাখাইন রাজ্য। গানের সঙ্গে সুর মেলান সেই চার রোহিঙ্গা তরুণ—তোফায়েল, আরাফাত বিন চৌধুরী, মো. জমিল ও সাইফুল।

তোফায়েল ও জমিল বলেন, ‘লাখো রোহিঙ্গার জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার আকুতি শাহীন ভাইয়ের “ও আরাকান” গান। এই গান প্রমাণ করে, জন্মভূমির মাটি মানুষের কাছে কতটা পবিত্র ও প্রিয়। ঘরহারা মানুষের এই কান্না ও আকুতি আমাদের নিজেদের শিকড়ের প্রতি আরও দায়িত্বশীল হতে শেখায়।’

ফেরার আকুতি

আরাকানের বর্তমান নাম রাখাইন। নাম বদলে যাওয়া, ছেড়ে আসা সেই স্বদেশের সীমারেখা রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকেই দেখা যায়।  টেকনাফ, উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ির বিপরীতে রোহিঙ্গাদের ওই স্বদেশেরই  ২৭১ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত। সেই সীমান্তের দিকে তাকিয়ে রোহিঙ্গাদের অনেকেই চোখের জল ফেলেন। ‘ও আরাকান’ গানটি সেই অনুভূতিরই অনুবাদ।

উখিয়ার লম্বাশিয়া আশ্রয়শিবিরের ঝুপড়িতে বসে ‘ও আরাকান’ গান শুনছিলেন রোহিঙ্গা সব্বির আহমদ। তখন তাঁর চোখ টলমল, দৃশ্যপটে ভেসে ওঠে ফেলে আসা আরাকানের সবুজ পাহাড় আর ধানের খেত, কাঠের বাড়ি।  সব্বির আহমদ (৫৫) বলেন, ‘ফেসবুক-ইউটিউবে এই গান বাজে, তখন চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না। দেশ ছাড়ছি কত বছর হলো, এই ক্যাম্পের ত্রিপলের ছাউনির নিচে থাকলেও মন পড়ে থাকে সেই আরাকানে। বাংলাদেশের এক ভাই (শাহীন আবরার) আমাদের মনের কষ্ট গানে তুলে ধরেছেন। গণহত্যা দিবস, কিংবা বিশেষ কোনো মুহূর্তে এই গান রোহিঙ্গাদের বুকের ভেতর আগুন জ্বালিয়ে দেয়।’