চকরিয়ায় পাহাড় কেটে সড়ক
বন বিভাগের হিসাবে সড়কটির প্রায় ৪ কিলোমিটার গেজেটভুক্ত সংরক্ষিত বনের মধ্যে।
কাজ বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার পাঁচ দিন পরও পাহাড় কাটছিল ঠিকাদারের লোকজন।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের উত্তর হারবাং ফরেস্ট অফিসের পাশ থেকে পূর্ব দিকে ঢুকে গেছে সরু একটি পথ। কিছু দূর ইট বিছানো, তারপর কাঁচা। দুই পাশে গর্জনগাছ। কোথাও ধানখেত, কোথাও পথের গা ঘেঁষে পাহাড়। যত সামনে যাওয়া যায়, ততই চোখে পড়ে পাহাড়-টিলা কাটার চিহ্ন।
গত রোববার বিকেলে পথটির শুরুতেই দেখা গেল উত্তর পাশের একটি টিলা কেটে সড়কের সঙ্গে সমান করা হয়েছে। আধা কিলোমিটার এগিয়ে উত্তর করমুহুরীপাড়ায় আবার কাটা পাহাড়। সাবানঘাটা সেতুর পর প্রায় ৬০০ ফুটজুড়ে পাহাড় কেটে চওড়া করা হয়েছে পথ। কোথাও ৫ ফুট, কোথাও ৯ ফুট উঁচু পাহাড় কাটা হয়েছে। কাটা অংশ ১০ থেকে ১২ ফুট চওড়া। কাটা পড়েছে কয়েকটি গাছও।
এই পথ কক্সবাজারের চকরিয়ার প্রায় শতবর্ষী হারবাং সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে গেছে। সরু পথটিই এখন প্রায় ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পাকা সড়কে রূপ নিচ্ছে। প্রায় ২৫ কোটি ৩ লাখ টাকা ব্যয়ে সড়কটি করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। অর্থায়ন করছে বাংলাদেশ সরকার ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)।
আইন অনুযায়ী বনে সড়ক নির্মাণের সুযোগ নেই। প্রতিটি সংস্থার এ আইন মেনে চলা উচিত। বনে সড়ক হলে জবরদখলসহ নানা সমস্যা তৈরি হয়।শেখ ফরিদুল ইসলাম, প্রতিমন্ত্রী, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়
বন বিভাগের হিসাবে সড়কটির প্রায় ৪ কিলোমিটার গেজেটভুক্ত সংরক্ষিত বনের মধ্যে। এই বনে বন্য হাতি চলাচল করে। সড়কের পাশে রয়েছে গর্জনগাছ ও প্রায় ৫০ একরের সুফল বনায়ন। প্রকল্প নেওয়ার আগে বন বিভাগের অনুমতি নেওয়া হয়নি। কাজ বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার পাঁচ দিন পরও পাহাড় কাটছিল ঠিকাদারের লোকজন।
যোগাযোগ করা হলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আইন অনুযায়ী বনের ভেতর সড়ক নির্মাণের সুযোগ নেই। প্রতিটি সংস্থার এ আইন মেনে চলা উচিত। বনের ভেতর সড়ক হলে জবরদখলসহ নানা সমস্যা তৈরি হয়। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানান তিনি।
নিষেধের পরও চলছিল কাজ
হারবাং ফরেস্ট অফিস থেকে কোরবানিয়াঘোনা পর্যন্ত পুরোনো পথটির কিছু অংশ কাঁচা, কিছু অংশ ইট বিছানো। স্থানীয় বাসিন্দাদের হিসাবে পথটি ৬ থেকে ৮ ফুট চওড়া।
পাকা সড়ক হলে বনের ভেতর জবরদখল বাড়বে। বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ঝুঁকিতে পড়বে এবং হাতির চলাচলেও বাধা তৈরি হবে।
পাহাড় কাটার বিষয়টি বন বিভাগের নজরে আসে গত ১৭ সেপ্টেম্বর। এর ৫ দিন পর এলজিইডিকে চিঠি দিয়ে সংরক্ষিত বনের ভেতর কাজ বন্ধ করতে বলেন চুনতি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আবীর হাসান। তবে চিঠির পরও কাজ থামেনি।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সরু পথ পাকা ও প্রশস্ত হলে বনের ভেতরে গাড়ি ও মানুষের প্রবেশ সহজ হবে। এতে গাছ চুরি, বন্য প্রাণী শিকার ও নতুন করে বনভূমি দখলের সুযোগ বাড়বে। যানবাহন বাড়লে বন্য হাতির চলাচলেও বাধা তৈরি হতে পারে। আবাসস্থল ও চলাচলের পথ সংকুচিত হলে হাতি লোকালয়ে ঢুকে পড়ার ঝুঁকিও বাড়বে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সোহেল রানা বলেন, পাকা সড়ক হলে বনের ভেতর জবরদখল বাড়বে। বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ঝুঁকিতে পড়বে এবং হাতির চলাচলেও বাধা তৈরি হবে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেবে বন বিভাগ।
অন্য বনেও সড়ক
হারবাং ছাড়াও চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের আরও তিনটি সংরক্ষিত বন এলাকায় সড়ক নির্মাণ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে বন বিভাগ। এগুলো হলো চকরিয়ার মধুশিয়া গর্জনবন, সাতকানিয়ার বৈতরণি সংরক্ষিত বন এবং মহেশখালীর শাপলাপুর সংরক্ষিত বন।
চকরিয়ার মধুশিয়া গর্জনবনের ভেতর দিয়ে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পাকা সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বনটি খুঁটাখালী-মেধাকচ্ছপিয়া হাতি করিডরের অংশ। বনের ভেতরের অংশে সড়ক নির্মাণের জন্য অনাপত্তি চাওয়া হলেও বন বিভাগ তা দেয়নি।
মহেশখালীর শাপলাপুরে সংরক্ষিত বনের ভেতর সাড়ে চার কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করছে এলজিইডি। জাইকার অর্থায়নে সড়কটির ব্যয় ২২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। সংরক্ষিত বনের ভেতরের ৩ দশমিক ৭০ কিলোমিটার অংশে নির্মাণকাজের ওপর গত ৬ আগস্ট দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। এরপরও সেখানে কাজ চলার তথ্য পাওয়া যায়।
হারবাংসহ এসব সড়ক এলজিইডির ‘দক্ষিণ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্পের’ আওতায় নেওয়া হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পের আওতায় সরাসরি বিভিন্ন কাজ বাস্তবায়নে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। সংরক্ষিত বনের মধ্যে সড়ক চলে আসার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছিল ২০২০ সালে। ভুল হইতেই পারে। আমরা এই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে চাচ্ছি না। আমরা চাচ্ছি, যেদিকে রিজার্ভ ফরেস্ট আছে, এখানে আমরা কাজ করব না বা করা উচিত হবে না।’
হারবাংয়ের বিষয়ে বন বিভাগের চিঠি পাওয়ার পর কাজ বন্ধ রাখতে বলেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ রকম হলে কাজ করব না। রিজার্ভ ফরেস্টের মধ্যে কাজ করা আমাদের ম্যান্ডেটও নয়।’
অন্যদিকে সাতকানিয়ার বৈতরণি সংরক্ষিত বনের ভেতরেও দুটি সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ রয়েছে। একটি ৫৭০ মিটার দীর্ঘ বড়ুয়াপাড়া সড়ক, যার পুরোটাই সংরক্ষিত বনের মধ্যে বলে বন বিভাগের দাবি। আর সুয়ালক সেতু থেকে সিদ্দিক খামার পর্যন্ত ৬০০ মিটার সড়কের প্রায় ১৭০ মিটার পড়েছে সংরক্ষিত বনে।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণ হলে বন খণ্ডিত হবে। বাড়বে অবৈধ প্রবেশ, জবরদখল ও গাছ কাটা। এতে জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।