ওই ঘটনার প্রায় ১০ মাস পর গত সোমবার বিকেলে ওই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে রীতিমতো চলছে আনন্দ ও সম্প্রীতির বন্ধন। গ্রামে নেই আতঙ্ক, ঘরবাড়ি পুড়ে যাওয়ার নেই কোনো চিহ্ন। যে যাঁর মতো গ্রামে-মাঠে কাজ করছেন, বসে গল্প করছেন। জেলেরা অনেকে মাছ ধরে বাড়িতে ফিরছেন। চকচক করছে গ্রামের রঙিন টিনের ছাউনি দেওয়া পাকা বসতবাড়িগুলো।

সরেজমিনে দেখা গেল, পাশের বটেরহাট থেকে শুরু করে বিভিন্ন দোকানে ও গ্রামের ভেতরে সম্প্রীতির সুবন্ধন। হিন্দু–মুসলমান একই সঙ্গে বসে চা পান করছেন, আড্ডা দিচ্ছেন এবং বাজার করছেন।

বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে ওই গ্রামের ননী গোপাল (৬০) তাঁর নতুন বসতঘরের বারান্দায় শুয়ে ছিলেন। এই প্রতিবেদকদের দেখে উঠে বসেন। কেমন আছেন, জানতে চাইলে বলেন, ‘ভগবানের আশীর্বাদে এখন খুব ভালো আছি। দালানের নয়া ঘর পাছি, অনুদান পাছি। অ্যালা হিন্দু–মুসলমান সবায় একসঙ্গে খাওচি-দাওচি-ঘোরোচি কোনো সমস্যা নাই।’ তবে কথা বলতে বলতেই কিছুটা আনমনা হয়ে যান ননী গোপাল।

এরপরে ওই রাতের ভয়াল চিত্র উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রাইতোত খায়াদায়া ছইল-পইল নিয়া ঘুমাছি। হঠাৎ শোরগোল। ঘুম ভাঙ্গিয়া ঘর থাকি বের হয়া দেখি আগুন আর আগুন। হাজার অচেনা মানুষ। লুটপাট, হুমকি–ধমকি কত–কী! জেবন বাঁচাতে কোনরকমে বাড়ি থাকি বের হয়া ধানখেতের মাঝোত নুকিয়া রক্ষা পাছি। পরের দিন সকালে পুলিশের সহযোগিতায় গ্রামোত আসিয়া দেখি, সুখের সংসার পুড়ি শ্যাষ। আশীর্বাদ করেন, এমতোন ভয়ের রাইত যেন আর না আইসে।’

নিজের পাকা ঘরের মেঝেতে ঝাড় দিতে ব্যস্ত ছিলেন সুমতি রানী। পাশে স্বামী দেবেন্দ্রনাথ বস্তায় ভুট্টা ভরছেন। গালভরা হাসি নিয়ে তিনি বলেন, ‘দাদারা কেমন আছেন? ওই যে গেইছেন আর তো আইসেন নাই।’

সুমতির এমন চেনাজানা ও প্রত্যাশার কারণ হচ্ছে, তাঁদের জীবনের সেই ভয়াল রাতের ভোর থেকে টানা ১০ দিন সেখানে অবস্থান করেছিলেন প্রথম আলোর এই প্রতিবেদকদ্বয়। এ সময় গ্রামে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা এবং পরে তাঁদের আতঙ্ক ও দুঃখ–কষ্টের কাহিনি পত্রিকায় তুলে ধরেছিলেন তাঁরা।

কেমন আছেন জানতে চাইতেই সুমতি রানী বলেন, ‘খুব ভালো আছি। সরকারসহ সবায় হামাক সহযোগিতা করছে। অ্যালা সবায় মিলিমিশিয়া চলোচি। কোনো সমস্যা নাই।’
ঘরের বারান্দায় মরিচ শুকাতে ব্যস্ত শ্যামল দাসের স্ত্রী শিল্পী রানী। পরনের কাপড় ছাড়া সবকিছু উত্তেজিত জনতার অগ্নিসংযোগে পুড়েছিল তাঁদের। শিল্পী রানী (৩০) বলেন, ‘সরকার, সাংবাদিকেরা, সব ধর্মের মানুষ হামার পাশে দাঁড়াইছিল বলিয়া হামরা ঘুরিয়া দাঁড়াছি।’

মাঝিপাড়া গ্রামের পাশে বটেরহাট বাজারে মুদিখানা ও চায়ের দোকানগুলোতে দেখা গেল মানুষের আড্ডা। বাজারের রাসেল মিয়ার চায়ের দোকানে মজনু মিয়া, রিপন ইসলাম ও আবদুল কাইয়ুমের সঙ্গে বসে চা–পানসহ খোশগল্পে মেতেছিলেন মাঝিপাড়া বড়করিমপুর গ্রামের নির্যাতিত জেলে ক্ষুধা রাম, দেবদাস, প্রভাত দাস ও সাগর রায়। প্রসঙ্গ তুলতেই প্রভাত দাস বলেন, ‘অ্যালা সউগ আগের মতোন হয়া গেইছে।’

সেই ভয়াল রাতের ঘটনা বর্ণনা করে মজনু মিয়া বলেন, ‘রাতের অন্ধকারে জেলেদের গ্রামে কিছু বহিরাগত অচেনা লোক হঠাৎ হামলা চালিয়ে লুটপাট ও বসতবাড়িতে আগুন ধরিয়েছিল। তখন জেলেদের চিৎকার–আর্তনাদে আমরাও খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। এখন সেই কষ্ট ও ভেদাভেদ ভুলে আমরা আবারও এক হয়েছি। আর কখনো কেউ হামলা করতে আসলে একসঙ্গে তা প্রতিহত করার জন্য সজাগ হয়ে আছি।’

ওই বাজারে রিকশা–ভ্যান নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মাঝিপাড়া বড়করিমপুর গ্রামের স্বপন চন্দ্র (২৫) বলেন, ‘ভুল–বোঝাবুঝি যা ছিল, সউগ মিটি গেইছে। কোনো সমস্যা নাই।’
পীরগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মিজানুর রহমান বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্তদের টিনের ছাউনিসহ ৪৪টি পাকা ঘর তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত জেলেরা সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তি পর্যায়ে আর্থিক অনেক সহযোগিতা পেয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। এখন এলাকায় হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে সম্প্রীতির সুবাতাস বইছে।’

বটের হাটবাজারের জামে মসজিদের সামনে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্পে বসে ছিলেন কয়েকজন পুলিশ সদস্য। ওই গ্রামের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মামুনুর রশিদ বলেন, ‘গ্রামে হামলার ঘটনার পর থেকে এখানে পুলিশি পাহারা চলছে। আমি দুই মাস থেকে এখানে পাহারার দায়িত্বে আছি। হিন্দু-মুসলমানরা এখন কাঁধে কাঁধ রেখে চলাচল করছে। কেউ কোনো দিন কোনো অভিযোগ করেনি।’

পীরগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাহাবুবুর রহমান বলেন, ওই দিন রাতের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে পীরগঞ্জ থানায় পৃথক চারটি মামলা দায়ের করে। এর মধ্যে তিনটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়। ওই চার মামলায় মোট ১৫০ জনের নামে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। দায়ের করা চার মামলার দুটি সিআইডি এবং দুটি মামলা পীরগঞ্জ থানা–পুলিশ তদন্ত করছে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন