মাছ ধরতে গিয়ে নৌকা উল্টে মৃত্যু, ঈদ আনন্দে নেমে এল বিষাদ

লাশপ্রতীকী ছবি

কয়েক দিন ধরেই আকাশ ভারী ছিল। মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়া আর দমকা হাওয়ার মধ্যে যেন লুকিয়ে ছিল অদৃশ্য এক অশনিসংকেত। গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে ভোলার আকাশ আরও ঘন মেঘে ঢেকে যায়। দুপুরে নামে মুষলধারে বৃষ্টি, আর বিকেলজুড়ে চলতে থাকে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি। দক্ষিণে সাগরমোহনায় তখন তীব্র ঢেউয়ের গর্জন, প্রকৃতি যেন আগাম সতর্কতা জানাচ্ছিল।

জীবিকার তাগিদ বড় নির্মম। তাই তো সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে চরফ্যাশন উপজেলার চর মানিকা ইউনিয়নের জেলে নুরে আলম (৫৫) ছোট্ট নৌকায় দুই ছেলে শাহিন ও শাকিলকে নিয়ে পাড়ি জমান সাগরমোহনায়। তাঁদের স্বপ্ন ছিল মাছভর্তি জাল নিয়ে ঘরে ফেরা, আর সেই মাছ বিক্রি করে ঈদের বাজার করা। কিন্তু সন্ধ্যার আগেই সেই স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। দক্ষিণের সাগরমোহনায় হঠাৎ শুরু হয় প্রবল ঝড়। মুহূর্তেই উত্তাল হয়ে ওঠে নদী। বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ে নৌকার ওপর—এক নিমেষেই ডুবে যায় সবকিছু। নৌকার নিচে চাপা পড়েন তিনজনই। প্রাণপণ চেষ্টা করে পানির ওপর ভেসে উঠলেও তলিয়ে যায় নৌকা, জাল ও জীবিকার সব সম্বল।

জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পড়ে যান তাঁরা। দুই ছেলে অর্ধমৃত বাবাকে নিয়ে সাঁতরে তীরে ফেরার চেষ্টা করে। উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করতে করতে তারা বাবাকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু প্রকৃতির নির্মমতার কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানেন নুরে আলম। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিস্তেজ হয়ে পড়েন তিনি।

তবু থামেনি সন্তানেরা। বুকভরা কান্না আর অদম্য শক্তি নিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা সাঁতরে তারা তীরে পৌঁছায়—বাবাকে ফেলে নয়, বুকে আগলে নিয়েই। তবে জীবিত নয়, লাশ হয়ে ঘরে ফেরেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি।

আজ শনিবার ভোরে চর ফারুকী গ্রামের বাড়িতে যখন নুরে আলমের মরদেহ পৌঁছায়, তখন পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। ঈদের আনন্দের দিনে যখন মানুষ নতুন পোশাকে নামাজের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন সেই বাড়িতে চলছিল আহাজারি। নামাজ শেষে জানাজা আদায় করেন গ্রামবাসী।

স্থানীয় মানুষেরা জানান, নুরে আলমের পরিবারটি অত্যন্ত অসহায়। মার্চ-এপ্রিল দুই মাস সাগরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকলেও ঈদের আগে ঘরে খাবার না থাকায় বাধ্য হয়েই গোপনে মাছ ধরতে যান তিনি।

নিহতের ছেলে শাহিন জানান, বিকেলে হঠাৎ ঝড় শুরু হলে তাদের ট্রলার উল্টে যায়। ভাই শাকিল জালের বয়া ধরে বেঁচে যান। পরে বাবাকে নিয়ে সাঁতরে তীরে উঠলেও ততক্ষণে সব শেষ।

দক্ষিণ আইচা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আহসান কবির জানান, কোনো অভিযোগ না থাকায় মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার বলেন, জেলে নিবন্ধিত থাকলে পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হবে। স্থানীয় মানুষেরা পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।