চট্টগ্রাম জেলা
২১টি সরকারি স্কুলে শিক্ষার্থী ৫০ বা তার কম, শিক্ষার্থী না থাকায় একটি বিলুপ্ত ঘোষণা
২ হাজার ২৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮২৪টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য।
একসময় টিফিনের ঘণ্টা বাজলেই মুখর হয়ে উঠত চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার উত্তর পশ্চিম গাটিয়া চেংগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এখন সেই কোলাহল নেই। বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী মাত্র ২০ জন। ছয়জন শিক্ষকের পদ থাকলেও কর্মরত আছেন তিনজন। জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে কম শিক্ষার্থীসংখ্যার বিদ্যালয়।
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে এলাকায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসা বেড়েছে। ফলে অনেক অভিভাবক সরকারি বিদ্যালয়ের বদলে সন্তানদের সেখানে ভর্তি করাচ্ছেন। কয়েক বছর আগেও বিদ্যালয়টিতে ৫০-এর বেশি শিক্ষার্থী ছিল। এখন প্রতিবছরই সংখ্যা কমছে।
শুধু এই বিদ্যালয় নয়, চট্টগ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে কয়েক বছর ধরে শিক্ষার্থী কমছে। শিক্ষাশুমারি ও জেলা শিক্ষা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ছিল ৪ লাখ ৮৭ হাজার ৬৭০ জন। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৩১ হাজার ৯৫১ জনে এবং ২০২৪ সালে ৪ লাখ ১৩ হাজার ৯৫১ জনে। ২০২৫ সালে শিক্ষার্থী বেড়ে ৪ লাখ ৫০ হাজার হলেও চলতি বছর আবার কমে হয়েছে ৪ লাখ ৪৩ হাজার ৪৪৭ জন।
শিক্ষক, অভিভাবক ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিক্ষক ও প্রশাসনিক জনবলের সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, মাদ্রাসা ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিস্তার, শিক্ষা উপকরণের ঘাটতিসহ নানা কারণে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমছে। এতে শিক্ষার্থী ধরে রাখা, মানসম্মত পাঠদান ও বিদ্যালয় পরিচালনায় জটিলতা বাড়ছে।
* ১০০-এর কম শিক্ষার্থী ৫০০ বিদ্যালয়ে। * ১৮টি বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ সুবিধাও নেই। * ৫০০টিতে খেলার মাঠ নেই। * এমন বিদ্যালয় বেশি নগর এলাকায়। * ইন্টারনেট সংযোগ নেই ১,১৬৬টিতে।
১০০-এর কম শিক্ষার্থী ৫০০ বিদ্যালয়ে
সমন্বিত প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা তথ্যব্যবস্থার (আইপিইএমআইএস) তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম জেলার ২ হাজার ২৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫০০টিতে শিক্ষার্থী ১০০-এর কম। এর মধ্যে ২২৮টিতে শিক্ষার্থী ৭০ বা তার কম এবং ২১টিতে ৫০ বা তার কম। নগরের বন্দর থানার লালদিয়ার চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে কোনো শিক্ষার্থী নেই। বিদ্যালয়টি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফটিকছড়ির ২২৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৬৮টিতে শিক্ষার্থী ৫১ থেকে ৯৮ জন। মিরসরাইয়ের ১৯১টি বিদ্যালয়ের ৬৪টিতে শিক্ষার্থী ৩৯ থেকে ৯৯ জন। সাতকানিয়ার ১৪৯টি বিদ্যালয়ের ৩৯টিতে শিক্ষার্থী ১০০-এর কম। এর মধ্যে চারটিতে শিক্ষার্থী ৩০ জনের কম।
সন্দ্বীপ, মিরসরাই ও নগরের কয়েকজন প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার অন্যতম
কারণ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসাভিত্তিক শিক্ষার বিস্তার।
তবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত দুর্বলতাকেও বড় কারণ মনে করছেন অভিভাবকেরা। তাঁদের ভাষ্য, অনেক মাদ্রাসায় ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ বিষয় পড়ানো হয়। কোথাও বিনা খরচে পড়াশোনার পাশাপাশি আবাসন ও খাবারের সুবিধাও রয়েছে। এসব কারণে অনেক পরিবার সন্তানদের মাদ্রাসায় ভর্তি করাচ্ছে।
চট্টগ্রাম নগরের বহদ্দারহাট এলাকার অভিভাবক নাসিমা বেগম বলেন, ‘প্রাক্-প্রাথমিকে আমার মেয়ে সরকারি স্কুলে ছিল। সেখানে ঠিকমতো পড়ালেখা হয় না। স্কুলটাতে পানিও ওঠে। পরে বাসার পাশের মাদ্রাসায় দিয়েছি। সেখানে খরচ নেই বললেই চলে। আমাদের মতো নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য এটা সুবিধা।’
নেই বিদ্যুৎ, খেলার মাঠ, ভবন
আইপিইএমআইএসের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ৫০০টিতে খেলার মাঠ নেই। এমন বিদ্যালয় নগর নগরে বেশি। এ ছাড়া ১৮টি বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ-সুবিধা নেই, ১ হাজার ১৬৬টিতে ইন্টারনেট সংযোগ এবং ৯৪টিতে লাইব্রেরি নেই। খেলার মাঠ, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট ও লাইব্রেরি—চারটি সুবিধাই রয়েছে মাত্র ৮৩৯টি বিদ্যালয়ে।
ফটিকছড়ির ১১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখনো বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। এর একটি ঘরকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী ৮১ জন, শিক্ষক মাত্র দুজন। সেখানে বিদ্যুৎ, মুঠোফোন নেটওয়ার্ক ও উন্নত যাতায়াতব্যবস্থা নেই। সোলার বিদ্যুতের মাধ্যমে শিক্ষকদের কক্ষে দুটি ফ্যান চালানো হয়।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, পাহাড়ি এলাকায় হওয়ায় এখনো বিদ্যুৎ–সংযোগ পাওয়া যায়নি। বিদ্যালয়ে যাওয়ার সড়কও খুব খারাপ। বর্ষায় কাদার কারণে চলাচল আরও কঠিন হয়ে পড়ে। বিষয়গুলো একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও সমাধান হয়নি।
নগরের কোতোয়ালি থানার ৩০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৯টিতে খেলার মাঠ নেই। এর মধ্যে ১০টির নিজস্ব ভবনও নেই। বেশ কয়েকটি বিদ্যালয় সিটি করপোরেশনের উচ্চবিদ্যালয়ের প্রভাতি শাখায় পরিচালিত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা মাঠ ব্যবহারের সুযোগও সীমিতভাবে পায়। ডবলমুরিং থানার ১৮টি বিদ্যালয়েও খেলার মাঠ নেই।
ভবনসংকটও প্রকট। ২০১৮ সাল থেকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কায়সার-নিলুফার কলেজ ভবনে চলছে বলুয়ারদীঘি ও লামাবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণি কার্যক্রম। জরাজীর্ণ ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার পর থেকেই নিজস্ব ভবন ছাড়া চলছে বিদ্যালয় দুটি।
জরাজীর্ণ ভবনের কারণে নগরের চান্দগাঁও থানার সানোয়ারা ও আয়েশা মঞ্জু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দুই থেকে তিন বছর ধরে পাশের বিদ্যালয়ে ক্লাস করছে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের কারণে বন্দর থানার ইসমাইল সুকানি ও হাজী জাকারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে টিনশেড কক্ষে পাঠদান চলছে।
উত্তর মধ্য হালিশহরের ফাতেমা বেগম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনও ঝুঁকিপূর্ণ। ২০১৩ সালে জাতীয়করণ হলেও চান্দগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এখনো নিজস্ব ভবন পায়নি। শুরু থেকেই টিনশেড ঘরে পাঠদান চলছে। এ ছাড়া নগরের আরও অন্তত ১০টি বিদ্যালয়ের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ ও জরাজীর্ণ বলে ঘোষণা করেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
৮২৪ বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান
শিক্ষকসংকটও সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার বড় সমস্যা। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ২ হাজার ২৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের অনুমোদিত পদ রয়েছে। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন ১ হাজার ৪৫৫ জন। ফলে ৮২৪টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। এসব বিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকেরা ভারপ্রাপ্ত বা চলতি দায়িত্বে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন।
সহকারী শিক্ষকের ১৪ হাজার ২৮৭টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ১ হাজার ১০৮টি শূন্য। ফলে অনেক বিদ্যালয়ে প্রয়োজনের তুলনায় কম শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চালাতে হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি শিক্ষকসংকট ফটিকছড়িতে। উপজেলার ২২৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৩৯টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। এর মধ্যে ৫২টি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকেরা চলতি দায়িত্ব পালন করছেন।
ফটিকছড়ি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রব বলেন, দীর্ঘদিন নতুন শিক্ষক নিয়োগ না হওয়া এবং নিয়োগ-সংক্রান্ত মামলার কারণে শূন্য পদ পূরণ করা যাচ্ছে না। শিক্ষকসংকটের পাশাপাশি উপজেলার কয়েকটি বিদ্যালয়ে ভবনসংকটও রয়েছে। এতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফিরোজ আহাম্মদ বলেন, শিক্ষকসংকট প্রাথমিক শিক্ষার জন্য বড় সমস্যা। বর্তমানে ৫২৬ জন সহকারী শিক্ষক নিয়োগের অপেক্ষায় রয়েছেন। দ্রুত এ সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করা হচ্ছে। শিক্ষা কর্মকর্তাদের শূন্য পদ পূরণের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিদ্যালয়ের ভবনসংকট সমাধানেরও চেষ্টা চলছে।
প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার না দিলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মুহম্মদ আমির উদ্দিন। তিনি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির সরঞ্জাম দেওয়া হলেও সেগুলোর কার্যকর ব্যবহার ও তদারকির অভাব রয়েছে। পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, দক্ষ শিক্ষক ও উন্নত অবকাঠামো নিশ্চিত না করলে মানসম্মত শিক্ষার্থী গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এ জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।