সুনামগঞ্জের পাঁচ আসন: বিএনপির ‘বিকল্প’ ও ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীরা কি ভোটের মাঠ ছাড়বেন
সুনামগঞ্জের পাঁচটি সংসদীয় আসনে বিএনপির এক ডজন নেতা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে দল ঘোষিত পাঁচ প্রার্থীর বাইরে দুটি আসনে শেষ মুহূর্তে আরও দুজন দলীয় চিঠি পেয়েছেন। এই দুজনকে অনেকেই ‘বিকল্প প্রার্থী’ হিসেবে উল্লেখ করছেন। বাকি তিন আসনে দলের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হিসেবে আরও পাঁচজন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া বিএনপির পাঁচ ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর মধ্যে তিনজন স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তাঁরা ভোটের মাঠ ছাড়বেন না।
নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার পাঁচটি আসনে মোট ৩৯ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির দলীয় প্রার্থী পাঁচজন, দলের ‘বিকল্প’ প্রার্থী দুজন, স্বতন্ত্র হিসেবে বিএনপির পাঁচজন, জামায়াতে ইসলামীর পাঁচজন, খেলাফত মজলিসের চারজন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের তিনজন, জাতীয় পার্টির দুজন, ইসলামী আন্দোলনের দুজন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির একজন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের একজন, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি) একজন, এলডিপির একজন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির একজন, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির একজন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আরও পাঁচজন রয়েছেন।
সুনামগঞ্জ-১
সুনামগঞ্জ-১ আসনে (ধর্মপাশা, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, মধ্যনগর) ছয়জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। বিএনপির দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ও তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আনিসুল হক।
এই আসনে বিএনপির আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন কামরুজ্জামান কামরুল। গত রোববার রাতে তিনি দাবি করেন, তাঁকেও কেন্দ্র থেকে দলের মনোনয়নের চিঠি দেওয়া হয়েছে। সোমবার তিনি দলীয় পরিচয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেন। অনেকেই তাঁকে ‘বিকল্প’ প্রার্থী বলছেন। তবে বিষয়টি মানতে নারাজ জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল। তিনি বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত আমাকেই এখানে দলীয় প্রার্থী করা হয়েছে। এটা দল থেকেই দ্রুত পরিষ্কার করা হবে।’
আনিসুল হক বলেন, ‘আমি এ বিষয় নিয়ে তর্ক করতে চাই না। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও এভাবে আমাকে সংযুক্তি চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দলের প্রার্থী ছিলেন প্রয়াত নেতা নজির হোসেন।’
এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন দলটির জেলা আমির তোফায়েল আহমদ।
সুনামগঞ্জ-২
সুনামগঞ্জ-২ আসনে (দিরাই-শাল্লা) সাতজন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এখানে বিএনপির দলীয় প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. নাছির চৌধুরী।
রোববার বিকেলে এই আসনে বিএনপির আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তাহির রায়হান চৌধুরী দাবি করেন, তিনিও দলের প্রার্থিতার চিঠি পেয়েছেন। সোমবার তিনি দলীয় পরিচয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেন।
তাহির রায়হান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাকে দল চিঠি দিয়েছে। দলের সিদ্ধান্তে আমি মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি। আমি দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাব না।’
এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হয়েছেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।
সুনামগঞ্জ-৩
সুনামগঞ্জ-৩ আসনে (জগন্নাথপুর-শান্তিগঞ্জ) ৯ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। বিএনপির প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ।
মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি মো. আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘তিনি মাঠে আছেন, মাঠে থাকবেন।’
এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ ইয়াসীন খান। পাশাপাশি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য শাহীনুর পাশা চৌধুরী।
সুনামগঞ্জ-৪
সুনামগঞ্জ-৪ আসনে (সদর-বিশ্বম্ভরপুর) ৯ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। বিএনপির প্রার্থী হলেন জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির অন্যতম সদস্য নূরুল ইসলাম।
মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির দুই সদস্য দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন ও আবিদুল হক।
নূরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সবাইকে নিয়েই এখানে ধানের শীষের জয় নিশ্চিত করব।’
আবিদুল হক বলেন, ‘দলীয় মনোনয়ন এখনো চূড়ান্ত হয়নি। প্রতীক বরাদ্দের আগে পর্যন্ত সময় আছে।’ দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন জানান, তিনি স্বতন্ত্র হিসেবেই নির্বাচন করবেন।
এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন দলের জেলা কমিটির নায়েবে আমির মো. শামস উদ্দীন।
সুনামগঞ্জ-৫
সুনামগঞ্জ-৫ আসনে (দোয়ারাবাজার–ছাতক সদর-বিশ্বম্ভরপুর) আটজন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। বিএনপির দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কলিম উদ্দিন আহমদ (মিলন)।
দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মিজানুর রহমান চৌধুরী মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এ ছাড়া যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মোশাহিদ আলী তালুকদারও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
মিজানুর রহমান চৌধুরী বলেন, দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের উৎসাহ ও দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নেতা-কর্মীরা তাঁর সঙ্গে আছেন।
মো. মোশাহিদ আলী তালুকদার বলেন, তিনি দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
অন্যদিকে কলিম উদ্দিন আহমদ আশা প্রকাশ করে বলেন, সবাই ধানের শীষের পক্ষে কাজ করবেন এবং ধানের শীষের জয় নিশ্চিত করবেন।
এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন আবু তাহির মুহাম্মদ আব্দুস সালাম।