ধর্ম নিয়ে টানাটানির জেরে হিমঘরে লাশ, আট দিন পর আদালতের নির্দেশে দাফন

উচ্চ আদালতের নির্দেশে নারায়ণগঞ্জ শহরের মাসদাইর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে রোববার রাতে শুভ চন্দ্র দাস ওরফে বিল্লালের মরদেহ দাফন করা হয়। এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনেরাছবি: প্রথম আলো

নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত শুভ চন্দ্র দাস ওরফে মো. বিল্লালকে (৩২) অবশেষে আট দিন পর দাফন করা হয়েছে। তাঁর ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে মা–বাবার মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হওয়ায় মৃত্যুর পরও মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে পড়ে ছিল।

মা, স্ত্রী ও ভাই চেয়েছিলেন ইসলামি রীতিতে দাফন করতে, আর বাবা চেয়েছিলেন হিন্দুধর্মীয় রীতিতে সৎকার করতে। এ নিয়ে বিরোধ গড়ায় উচ্চ আদালত পর্যন্ত। উচ্চ আদালতের নির্দেশে রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাতে সেই বিরোধের অবসান হয়েছে। ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জে এনে জানাজা শেষে শুভর মরদেহ দাফন করা হয়েছে নারায়ণগঞ্জ শহরের মাসদাইর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে।

রাত সাড়ে ১০টার দিকে শুভর দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে তাঁর মরদেহ নারায়ণগঞ্জে নিয়ে আসেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপপরিদর্শক (এসআই) মফিজুল ইসলামসহ পুলিশের একটি দল। পরে মরদেহ তাঁর স্ত্রী জ্যোতি আক্তারসহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

শুভর শেষবিদায়ের সময় উপস্থিত ছিলেন তাঁর মা আয়েশা আক্তার, স্ত্রী জ্যোতি আক্তার, দুই বছর বয়সী মেয়ে সুমাইয়া সোহানা, ভাই ইব্রাহিম, বোনজামাই মো. সেলিমসহ আত্মীয়স্বজনেরা। জানাজা ও দাফনের স্থানে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও ডিবি পুলিশের সদস্য উপস্থিত ছিলেন। তবে শুভর বাবা হরি চন্দ্র দাসকে দেখা যায়নি, তাঁর মুঠোফোনও বন্ধ পাওয়া গেছে।

মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের পর শুরু হয় কান্নাকাটি। মাকে কাঁদতে দেখে ছোট্ট সুমাইয়াও বাবার জন্য কাঁদছিল। বাবাকে হারানোর অর্থ বোঝার বয়স হয়নি তার। তবে মায়ের কান্না দেখে স্বজনদের সঙ্গে কাঁদছিল শিশুটিও।

নিহত শুভ চন্দ্র দাস ওরফে মো. বিল্লাল
ছবি: সংগৃহীত

শুভর স্ত্রী জ্যোতি আক্তার বলেন, ‘আমার স্বামী মুসলমান, সে নিয়মিত নামাজ পড়ত। আমার সন্তান মুসলমান। তাকে হিন্দু বানিয়ে সৎকার করার চেষ্টা করেছে আমার শ্বশুর। উচ্চ আদালতের নির্দেশে আজ রাতে জানাজা শেষে মাসদাইর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, তাঁর স্বামীকে সবাই ভালোবাসাতেন। কিন্তু ঘাতকেরা তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। তিনি ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

৫ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত সোয়া একটার দিকে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া হকার্স মার্কেটের পেছনের সড়কে শুভকে গুলি করে হত্যা করা হয়। শুভর মা পার্বতী রানী দাস ও বাবা হরি চন্দ্র দাসের সংসারে দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। ২০০৩ সালে তিন সন্তানকে (দুই ছেলে ও এক মেয়ে) নিয়ে পার্বতী রানী হিন্দুধর্ম থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এরপর তাঁর নাম হয় আয়েশা বেগম। দুই ছেলের নামও পরিবর্তন করা হয়। শুভর নতুন নাম রাখা হয় মো. বিল্লাল এবং তাঁর ছোট ভাই সুজনের নাম হয় ইব্রাহিম। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) শুভ চন্দ্র দাস নাম পরিবর্তন করা হয়নি।

শুভ মুসলিম পরিচয়েই বড় হয়েছেন বলে দাবি পরিবারের। প্রায় আট বছর আগে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি মুসলিম তরুণী জ্যোতি আক্তারকে বিয়ে করেন। কাবিননামার মাধ্যমে তাঁদের বিয়ে হয়। তাঁদের সংসারে সুমাইয়া আক্তার নামে দুই বছর বয়সী একটি মেয়ে আছে। তাঁরা নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার ভূঁইগড় এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করেন।

পরিবারের তথ্যমতে, মরদেহ নিয়ে বিরোধ শুরু হওয়ার পর প্রথমে শুভর মরদেহ নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় অ্যাম্বুলেন্সের ফ্রিজে রাখা হয়। পরে আদালতের নির্দেশে মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে পাঠানো হয়।

হত্যাকাণ্ডের পর শুভর বাবা হরি চন্দ্র দাস বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানায় জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। অস্ত্র উদ্ধার করে।

জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অপরাধ ও অপারেশন তারেক আল মেহেদী প্রথম আলোকে বলেন, হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্য ব্যক্তিদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে পৃথক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন