ফরিদপুর-৩: জামায়াত জিততে পারেনি, তবে বেগ পেতে হয়েছে বিএনপিকে

নায়াব ইউসুফ (বাঁয়ে) ও আবদুত তাওয়াবছবি: সংগৃহীত

সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত ফরিদপুর-৩ সংসদীয় আসনটি দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে শহরের ঐতিহ্যবাহী ময়েজ মঞ্জিল পরিবারের কেউ প্রার্থী হলে এ আসনে বিএনপির অবস্থান আরও মজবুত হয়। এবারের নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ও ময়েজ মঞ্জিল—দুটি উপাদানই ছিল বিএনপির পক্ষে। তারপরও জয় পেতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে দলটির প্রার্থী নায়াব ইউসুফকে।

নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত বিএনপি প্রার্থী জয়ী হলেও জামায়াতের প্রার্থীর অস্বাভাবিক ভোটবৃদ্ধি বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিস্মিত করেছে। যে আসনে অতীতে দলীয় বা জোটগতভাবে জামায়াত ৩০ হাজারের বেশি ভোট পায়নি, সেখানে এবার দলটির প্রার্থী আবদুত তাওয়াব পেয়েছেন ১ লাখ ২৪ হাজার ১১৫ ভোট। বিজয়ী বিএনপি প্রার্থী নায়াব ইউসুফের চেয়ে তিনি পিছিয়ে ছিলেন ২৪ হাজার ৪৩০ ভোটে।

১৯৯১ সাল থেকে এ আসনে জামায়াতের প্রাপ্ত ভোট ১৬ থেকে ৩০ হাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ওই সময়গুলোতে দলটির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন দলটির তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী ও ময়েজ মঞ্জিল পরিবারের সন্তান, দলটির ভাইস চেয়ারম্যান চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ ৬২ হাজার ৪৩২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। জামায়াত প্রার্থী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ পান ১৬ হাজার ৫০২ ভোট। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে কামাল ইবনে ইউসুফ ৬০ হাজার ৭৭৯ ভোট পেয়ে পুনর্নির্বাচিত হন। সে সময় মুজাহিদ পান ১২ হাজার ৩৩৪ ভোট। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট গঠিত হলে এ আসনে জোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন কামাল ইবনে ইউসুফ।

২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটের প্রার্থী ছিলেন আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। তবে কামাল ইবনে ইউসুফ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী খন্দকার মোশাররফ হোসেন ১ লাখ ২২ হাজার ৪৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। কামাল ইবনে ইউসুফ পান ৭৬ হাজার ৪৭৮ ভোট এবং জোটের প্রার্থী মুজাহিদ পান ৩০ হাজার ৮২১ ভোট।

নায়াব ইউসুফ একটি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। তাঁর দাদা ইউসুফ আলী চৌধুরীকে স্থানীয় রাজনীতিতে ‘কিং মেকার’ বলা হয়। বাবা কামাল ইবনে ইউসুফ ফরিদপুরে বিএনপির সংগঠন গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং এ আসন থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

এ প্রেক্ষাপটে জামায়াতের প্রার্থীর ভোটবৃদ্ধিকে বিস্ময়কর বলছেন নায়াব ইউসুফ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘জামায়াত প্রার্থী এত ভোট কীভাবে পেল, মাথায় আসছে না। হিসাব মেলাতে পারছি না।’ যেসব কেন্দ্রে জামায়াত বেশি ভোট পেয়েছে, সেগুলোর তালিকা করে কারণ অনুসন্ধানে নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

জেলা বিএনপির সদস্যসচিব এ কে এম কিবরিয়া স্বপন বলেন, ‘যত ভালো ফল করার কথা ছিল, আমরা তেমনটি করতে পারিনি। দ্রুত কেন্দ্রভিত্তিক ভোট বিশ্লেষণ করা হবে। কোথায় দুর্বলতা ছিল, তা চিহ্নিত করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা ও মধুখালী উপজেলা নিয়ে গঠিত ফরিদপুর-১ এবং সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত ফরিদপুর-৩—এই দুটি আসনকে টার্গেট করেছিল জামায়াত। এর মধ্যে ফরিদপুর-১ আসনে দলটির প্রার্থী বিজয়ী হলেও ফরিদপুর-৩-এ জয় অধরাই থেকে যায়।

১১–দলীয় জোটের পক্ষ থেকে এই দুই আসনে একক প্রার্থী ছিল জামায়াতের। দলটির আমির শফিকুর রহমান সারা দেশে সব আসনে না গেলেও ফরিদপুর-১ ও ফরিদপুর-৩-এ পৃথক জনসভা করেন। ৪ ফেব্রুয়ারি সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ মাঠে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের জনসভার দুই দিন পর একই স্থানে জামায়াতের জনসভা অনুষ্ঠিত হয়।

ফরিদপুর-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী আবদুত তাওয়াব কেন্দ্রীয় শুরা কমিটির সদস্য এবং কলেজশিক্ষক হিসেবেও পরিচিত। আজ শনিবার সকালে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতের পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়। প্রার্থীর ব্যক্তি ইমেজ বড় ভূমিকা রেখেছে। অতীতে “আওয়ামী লীগ ঠেকাও” স্লোগানে অনেক সমর্থক বিএনপির প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন। এবার সে পরিস্থিতি ছিল না। ফলে ভোটাররা নিজেদের পছন্দমতো ভোট দিয়েছেন।’

পরাজয়ের কারণ ব্যাখ্যা করে জামায়াতের এই প্রার্থী বলেন, ‘আওয়ামী লীগের একটি অংশ বিএনপির সঙ্গে একাত্ম হয়। ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী মহলের সমর্থন নায়াব ইউসুফের পক্ষে যায়। সংখ্যালঘু ভোটও প্রত্যাশিত হারে পাইনি।’