ঘটকালি নিয়ে কথা তুলতেই লিটন ফকিরের হাসি মিলিয়ে যায়। কিছুটা বিষণ্ন হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। ১৮ বছর ধরে তিনি ঘটকের কাজ করছেন। এত বছরে ২০০টির বেশি বিয়ের ব্যবস্থা করেছেন। আগে এতে আয়রোজগার বেশ ভালো ছিল। বছর দশেক আগে বাড়ির কিছু জমিজমা বিক্রি করে কিস্তিতে দুটি ট্রাক কিনেছিলেন প্রায় ২৫ লাখ টাকায়। এই দিয়ে মাসে ২০ হাজার টাকা কিস্তি দিয়ে সংসার বেশ সচ্ছলভাবে চালাতেন। কিন্তু বছর পাঁচেক আগে আইনি জটিলতায় তাঁর দুটি ট্রাকই খোয়া যায়। এতে নিঃস্ব হন লিটন ফকির। পরিবার নিয়ে চরম দুর্দশায় পড়েন। হাতে কোনো কাজও ছিল না। এ জন্য পৈতৃক জমিজমার বাকিটুকু বিক্রি করেন এবং হাতে জমানো টাকা ভেঙে সংসার চালান। কিন্তু এখন আর সেটিও নেই, তাই ব্যাংকের বুথে এই চাকরি নিয়েছেন। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘বেতন কম, বাঁচতে অইলে উপায় কী?’

বরিশালের উজিরপুর উপজেলার রাজশ্রী গ্রাম থেকে লিটন বছর কুড়ি আগে জীবিকার তাগিদে বরিশাল শহরে আসেন। পরিবার নিয়ে ছিলেন নগরের গগন গলির এক ভাড়া বাসায়। ভাড়া বাড়ির পাশের এক প্রতিবেশীর দুই মেয়ের জন্য ভালো পাত্র দেখে একে একে বিয়ে দেন তিনি। সেই থেকে ঘটকের কাজ শুরু। এরপর গত ২০ বছরে ২০০ বেশি পাত্র–পাত্রীর চার হাত এক করেছেন। লিটন আক্ষেপ করে বলেন, ‘আগে পরতেক মাসেই তিন-চাইরটা করে বিয়াশাদি থাকত, এহন আর নাই।’

বিয়ে সম্পন্ন হলে পাত্র-পাত্রী উভয় পক্ষ থেকেই ভালো সম্মানী (এনাম) পেতেন। কিন্তু এখন বছরে পাঁচটা বিয়ের ঘটকালি করারও সুযোগ হয় না। ধনী পরিবার ছাড়া ভালো সম্মানীও দেয় না। এ জন্য এ পেশায় আর পেট চলে না।

আগে বেশির ভাগই পারিবারিক বিয়ের আয়োজন হতো। ঘটকেরা পাত্র-পাত্রীর খোঁজ দিতেন। এরপর অভিভাবকদের মধ্যে আলোচনার পর বিয়ের আয়োজন হতো। আগের দিনে বাড়ি বাড়ি ঘুরে পাত্র-পাত্রীর সন্ধান করতে বেশ পরিশ্রম হতো। কিন্তু এখন সুবিধা হচ্ছে মুঠোফোনের মাধ্যমে খোঁজখবর পাওয়া যাচ্ছে। তাই পরিশ্রম কমেছে। কিন্তু আয় কমেছে। আবার পারিবারিক বিয়েও অনেক কম। এখন বেশির ভাগ বিয়েই হচ্ছে পাত্র-পাত্রীর নিজেদের পছন্দে। তাই ঘটকদের দুর্দিন।

লিটনের কাছে ৫০ জনের বেশি পাত্রীর বিয়ের জন্য পাত্রের সন্ধান চেয়েছেন অভিভাবকেরা। নিজের মুঠোফোনে পাত্রীদের ছবি দেখান। অভিভাবকেরা অনবরত তাঁকে ফোন করেন ভালো পাত্র পাওয়া গেছে কি না, জানতে চান। কিন্তু তাঁদের চাহিদা ও পছন্দ অনুযায়ী পাত্র পাচ্ছেন না। সবাই সরকারি চাকরিজীবী পাত্র চায়। আবার সরকারি চাকরিজীবী পাত্ররা চান আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের ফরসা-সুন্দরী পাত্রী। তাই ব্যাটে-বলে মেলাতে ভীষণ পরিশ্রম করতে হয় তাঁকে। কিন্তু সে অনুযায়ী পারিশ্রমিক দিতে চান না কেউই।

নগরের ভাটিখানা এলাকায় চার হাজার টাকা বাসা ভাড়া নিয়ে পরিবারসহ কোনো রকম মাথা গুঁজেছেন লিটন। বলেন, গত বছর ২০টি ঘটকালি করে ২০ হাজার আয় হয়েছিল। কিন্তু করোনার দুই বছরে তা–ও হয়নি। তাই বাচ্চাদের খাবারে টান পড়েছে। বাড়িভাড়া পরিশোধের পর সামান্য কয়টা টাকা হাতে থাকে, তা দিয়ে সংসার চালাতে হয়। এতে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা। ভালোমন্দ খাবার তো দূরে থাক, বাচ্চাদের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিতেই কষ্ট হচ্ছে। দুর্দশার কথা বলতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হয়ে আসে। তিনি বলেন, ‘এই দুর্মূল্যের বাজারে বাঁচনটা যে কী কষ্টের, হেইয়্যা বুঝাইতে পারমু না।’