কক্সবাজারের রামুর খুটাখালীতে মৃত অবস্থায় পাওয়া মা হাতিটির চোখের ওপরে ছিল গভীর ক্ষত। বন বিভাগের চিকিৎসকেরা ময়নাতদন্ত করতে গিয়ে সেখানে খুঁজে পান ৬১ গ্রাম ওজনের একটি গুলি। ধারণা করা হচ্ছে, অন্তত এক মাস আগে হাতিটিকে গুলি করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন যন্ত্রণায় ভুগে দুর্বল হয়ে পড়ে প্রাণীটি। শেষ পর্যন্ত ১৬ মে মারা যায়।
এ ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে গত এক দশকে মারা গেছে অন্তত ১২৬টি হাতি। এর মধ্যে ২৪টি হাতির মৃত্যু হয়েছে বৈদ্যুতিক শকে। গুলি করে হত্যা করা হয়েছে ৯টিকে। মাইন বিস্ফোরণে মারা গেছে দুটি। অবৈধ শিকারে মারা গেছে আরও দুটি। বাকি হাতিগুলো মারা গেছে অসুস্থতা, খাদ্যসংকট, দুর্ঘটনাসহ নানা কারণে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি হাতির মৃত্যু হয়েছে কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগে, ৩৫টি। এরপর চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগে ৩২টি এবং কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগে ২৫টি। সবচেয়ে কম মৃত্যু হয়েছে বান্দরবান বন বিভাগে, একটি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাতিরা এখন বন হারাচ্ছে, হারাচ্ছে চলাচলের পথও। ফলে খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। আর সেখান থেকেই বাড়ছে সংঘাত।
হাতির এই ধারাবাহিক মৃত্যু ঠেকাতে বন মন্ত্রণালয় গত বছর প্রায় ৩৯ কোটি টাকার ‘হাতি সংরক্ষণ প্রকল্প’ হাতে নিয়েছে। ২০২৮ সাল পর্যন্ত চলবে প্রকল্পটি। এর ডিপিপিতে উঠে এসেছে বাংলাদেশের হাতির আবাসের সংকট, করিডর দখল, মানুষ-হাতি সংঘাত এবং সংরক্ষণব্যবস্থার নানা দুর্বলতার চিত্র। জানতে চাইলে হাতি সংরক্ষণ প্রকল্পের পরিচালক ও বন অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় অঞ্চলের বন সংরক্ষক এ এস এম জহির উদ্দিন আকন প্রথম আলোকে বলেন, এটি একেবারেই নতুন প্রকল্প। চলতি বছরের মার্চে অর্থ ছাড় হয়েছে। এখন মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম শুরু হচ্ছে।
বন বিভাগ ও আইইউসিএনের জরিপ অনুযায়ী, দেশে ২১০ থেকে ৩৩০টি স্থায়ী বন্য হাতি রয়েছে। আর আন্তসীমান্ত চলাচলকারী হাতির সংখ্যা ৮০ থেকে ১০০। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শেরপুর-জামালপুর সীমান্ত এলাকায় ২০ থেকে ২৫টি হাতির একটি দল প্রায় সারা বছর অবস্থান করছে।
একসময় সারা দেশেই ছিল হাতি
একসময় মধুপুরগড় থেকে গারো পাহাড়, সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলে হাতির অবাধ বিচরণ ছিল। এখন সেই বিস্তৃতি অনেকটাই কমে এসেছে। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ হাতি টিকে আছে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সীমিত কিছু বনাঞ্চলে। চুনতি, টেকনাফ, ফাঁসিয়াখালী ও পাবলাখালী অভয়ারণ্য, কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান এবং বাঁকখালী, রেজু, ফুলছড়ি, ঈদগড় ও মরিসার বনাঞ্চল এখন তাদের প্রধান আশ্রয়স্থল।
এ ছাড়া ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে প্রতিবছর কিছু হাতি বাংলাদেশে আসে। বন বিভাগ ও আইইউসিএনের জরিপ অনুযায়ী, দেশে ২১০ থেকে ৩৩০টি স্থায়ী বন্য হাতি রয়েছে। আর আন্তসীমান্ত চলাচলকারী হাতির সংখ্যা ৮০ থেকে ১০০। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শেরপুর-জামালপুর সীমান্ত এলাকায় ২০ থেকে ২৫টি হাতির একটি দল প্রায় সারা বছর অবস্থান করছে।
কিন্তু গত কয়েক দশকে বনাঞ্চলের ভেতরে বসতি, কৃষিজমি, সড়ক, রেললাইন ও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে ওঠায় হাতির আবাসস্থল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংকুচিত হয়ে গেছে তাদের চলাচলের পথও। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত মানুষ-হাতি সংঘাতে মারা গেছেন ৬৫ জন মানুষ। আহত হয়েছেন ৫২২ জন।
গবেষণায় উঠে এসেছে যে সংকট
দেশের হাতি নিয়ে দেশে-বিদেশে একাধিক গবেষণা হয়েছে। গবেষকেরা বলছেন, হাতির বর্তমান সংকটের মূল কারণ আবাসস্থল ধ্বংস ও করিডর সংকুচিত হয়ে যাওয়া। ২০১৭ সালে প্রকাশিত ‘সীমান্তের বেড়া, হাতির চলাচল ও উত্তরাঞ্চলের মানুষ-হাতি সংঘাত: হাতি সংরক্ষণে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার গুরুত্ব’ শীর্ষক এক গবেষণায় বলা হয়, হাতিরা আর স্বাভাবিক পথে চলাচল করতে পারছে না। সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া, নতুন সড়ক, রেললাইন ও বিভিন্ন অবকাঠামো তাদের পথ আটকে দিচ্ছে। ফলে হাতির দল বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। খাবারের সন্ধানে তারা লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। তখনই শুরু হচ্ছে সংঘাত।
গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, ২০০০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে শুধু উত্তরাঞ্চলেই মানুষ-হাতি সংঘাতে অন্তত ১৯টি হাতি ও ৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। গবেষকেরা মনে করেন, হাতিরা মূলত তাদের হারিয়ে যাওয়া চলাচলের পথ ফিরে পেতে চায়। কিন্তু সেই পথ এখন দখল হয়ে গেছে বসতি, কৃষিজমি ও বিভিন্ন স্থাপনায়।
যেসব এলাকায় আগে হাতির করিডর ছিল, সেখানে এখন রোহিঙ্গা বসতি, স্থানীয় জনবসতি, বাজার ও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এতে হাতির চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। খাবারের সংকট দেখা দিলে হাতি লোকালয়ে চলে আসছে
অন্যদিকে ২০২৩ সালে ফ্রন্টিয়ার্স ইন কনজারভেশন সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় টেকনাফ বন্য প্রাণী অভয়ারণ্যে মানুষ-হাতি সংঘাতের ধরন বিশ্লেষণ করা হয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আমির হোসেন ও নরওয়ের জীববিজ্ঞানী আইভিন রোস্কাফট পরিচালিত ওই গবেষণায় ২০১৮ সালের আগস্ট থেকে ২০১৯ সালের জুলাই পর্যন্ত সংঘটিত ৯০৩টি সংঘাতের ঘটনা বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি সংঘাত হয়েছে ধানখেত, সবজিখেত ও পানের বরজ এলাকায়। বেশির ভাগ ঘটনাই ঘটেছে রাতে। বন দখল, মানুষের অনুপ্রবেশ ও দুর্বল বন ব্যবস্থাপনার কারণে হাতিরা ক্রমেই লোকালয়ের দিকে চলে আসছে।
হাতির পথে বসতি, সড়ক, রেললাইন
ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) গবেষণার ভিত্তিতে দেশে ১২টি হাতি করিডর গেজেট আকারে ঘোষণা করা হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল হাতির স্বাভাবিক চলাচলের পথ রক্ষা করা। কিন্তু বাস্তবে সেই করিডরের অনেক অংশ এখন বসতি, বাজার, সড়ক ও বিভিন্ন স্থাপনায় দখল হয়ে গেছে।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের চুনতি-সাতগড় করিডর এখন সবচেয়ে ঝুঁকিতে। দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণের পর এ পথে হাতির চলাচল অনেক কমে গেছে। ফলে চুনতির হাতি চুনতিতে এবং বাঁশখালীর হাতি বাঁশখালী এলাকায় কার্যত আটকা পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকলে একই গোষ্ঠীর মধ্যে প্রজনন বাড়ে। এতে জিনগত বৈচিত্র্য কমে যায় এবং দুর্বল শাবকের জন্ম হয়।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো প্রথম আলোকে বলেন, ‘যেসব এলাকায় আগে হাতির করিডর ছিল, সেখানে এখন রোহিঙ্গা বসতি, স্থানীয় জনবসতি, বাজার ও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এতে হাতির চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। খাবারের সংকট দেখা দিলে হাতি লোকালয়ে চলে আসছে।’
বড় মৃত্যুফাঁদ বিদ্যুতের তার
হাতি সংরক্ষণ প্রকল্পের ডিপিপিতে সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বৈদ্যুতিক ফাঁদ ও মানুষ-হাতি সংঘাতকে। কৃষিজমি রক্ষার নামে অনেক এলাকায় অবৈধভাবে বিদ্যুতায়িত তার টানানো হচ্ছে। কোথাও বসানো হচ্ছে বৈদ্যুতিক বেড়া। খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে ঢোকা হাতিরা এসব ফাঁদে পড়ে মারা যাচ্ছে।
বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে হাতি মৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণ এখন বিদ্যুতের শক। পাশাপাশি বাড়ছে গুলি করে হাতি হত্যার ঘটনাও। উখিয়া, রামু ও টেকনাফ এলাকায় একাধিক হাতির শরীরে গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে হাতি হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে ৩৩টি। কিন্তু বেশির ভাগ মামলাই এখনো বিচারাধীন।
চলতি বছরের ২৫ মার্চ কক্সবাজারের চকরিয়ায় একটি বন্য হাতির কঙ্কাল উদ্ধার করে বন বিভাগ। দুর্বৃত্তরা হাতিটিকে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে হত্যার পর মাটিচাপা দিয়েছিল। প্রায় এক মাস পর দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে বন বিভাগ সেখানে গিয়ে হাতিটির দেহাবশেষ উদ্ধার করে। বন বিভাগের ধারণা, আবাদি জমির ফসল নষ্ট করায় হাতিটিকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে পিবিআই তদন্ত করছে।
আরেকটি ঘটনা সারা দেশে আলোড়ন তোলে গত ২৬ এপ্রিল। রাঙামাটির লংগদু উপজেলার ভাসান্যাদাম ইউনিয়নের পকসাপাড়ায় উদ্ধার করা হয় প্রায় ৬০ বছর বয়সী একটি পুরুষ হাতির মরদেহ। ঘটনাস্থলে গিয়ে বন বিভাগের কর্মকর্তারা দেখেন, মৃত হাতিটির পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটি স্ত্রী হাতি। দীর্ঘ সময় ধরে সেটি মৃত সঙ্গীর দেহ পাহারা দেয় এবং কাউকে কাছে ঘেঁষতে দেয়নি।
স্থানীয় লোকজন জানান, স্ত্রী হাতিটি সরে যাওয়ার পর রাতের অন্ধকারে দুর্বৃত্তরা মৃত হাতিটির শুঁড় এবং পেছনের পায়ের বড় একটি অংশ কেটে নিয়ে যায়। পরে এ ঘটনার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়।
বন বিভাগ জানায়, ওই এলাকার একমাত্র প্রজননক্ষম পুরুষ হাতি ছিল এটি। দুই বছর আগেও একদল দুর্বৃত্ত হাতিটিকে গুলি করেছিল। ধারালো বর্শা দিয়েও আঘাত করা হয়েছিল। পরে চিকিৎসার মাধ্যমে হাতিটিকে সুস্থ করা গেলেও শরীরে সংক্রমণ থেকে যায়। বন বিভাগের ধারণা, সেই পুরোনো সংক্রমণ থেকেই শেষ পর্যন্ত হাতিটির মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। তবে কাউকে এখনো গ্রেপ্তার বা শনাক্ত করা যায়নি।
জানতে চাইলে বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ চট্টগ্রামের উপ–বন সংরক্ষক আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াছিন নেওয়াজ প্রথম আলোকে বলেন, এক দশকে মাত্র একটি মামলায় একজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বাকি মামলাগুলো এখনো বিচারাধীন।
‘শুধু প্রকল্প নিলেই হবে না’
হাতি সংরক্ষণ প্রকল্পের ডিপিপিতে স্বীকার করা হয়েছে, দেশে হাতি সংরক্ষণে দীর্ঘদিন সমন্বিত কোনো উদ্যোগ ছিল না। জনবল, সরঞ্জাম ও কারিগরি সক্ষমতার ঘাটতির কারণে মানুষ-হাতি সংঘাত মোকাবিলা, আহত হাতি উদ্ধার কিংবা চিকিৎসা—সব ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
নতুন প্রকল্পে হাতির জন্য বিশেষ অভয়ারণ্য গঠন; সংঘাতপ্রবণ এলাকায় মানুষ-হাতি সংঘাত প্রতিরোধ দল ও উদ্ধার দল গঠন; করিডর পুনরুদ্ধার; খাদ্য ও পানির উৎস তৈরি এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে বন্য প্রাণী গবেষকদের মতে, শুধু প্রকল্প নিলেই হবে না, বাস্তবায়নই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আল আমীন প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশে হাতি মৃত্যুর বেশির ভাগ ঘটনাই প্রতিরোধযোগ্য ছিল। কিন্তু বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়হীনতা, দুর্বল নজরদারি এবং ঘটনার পর কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। বিদ্যুতের ফাঁদ কারা বসাচ্ছে, কারা গুলি করছে কিংবা কারা করিডর দখল করছে—এসবের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা খুব কমই দেখা যায়। তাই সরকারকে হাতি রক্ষায় সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।