বৃহস্পতিবার বিকেলের কথা। যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা বাজারে একটি দোকানে বসে শিঙাড়া-পুরি খাচ্ছিলেন ১২ জন কৃষক। খেতে খেতে চলছিল নির্বাচনী আলাপ।
একজন বললেন, ‘এই আসনে যে–ই জিতুক, তাঁর আওয়ামী লীগের ভোট লাগবেই।’ পাশের বৃদ্ধ এক কৃষক আলোচনা ঢুকে বললেন, ‘এখানে সাধারণত আওয়ামী লীগ জেতে। এবার আওয়ামী লীগ নাই। বিএনপি শক্তিশালী। জামায়াতেরও ভোট বেড়েছে। আওয়ামী লীগের ভোট জয়-পরাজয় ঠিক করবে।’
বালিয়াডাঙ্গা বাজার থেকে দুই কিলোমিটার দূরে ধলগ্রাম ইউনিয়নের ভুলবাড়িয়া গ্রাম। গ্রামের তিন পাশে বিল। গ্রামের সবাই হিন্দু। গ্রামের চায়ের দোকানে বসে ছিলেন ছয়জন। তাঁরা নির্বাচন নিয়ে কথাবার্তা বলছিলেন। জানালেন, নিরাপত্তা দিলে তাঁরা ভোট দিতে যাবেন। ভোটের পরে যাতে নির্যাতনের শিকার না হতে হয়, এ জন্য তাঁরা প্রার্থী ও দলের কাছে প্রতিশ্রুতি চান।
যশোর-৪ (অভয়নগর-বাঘারপাড়া-সদরের বসুন্দিয়া ইউনিয়ন) আসনে ১৯৯১ সালের পর ২০০১ সালের নির্বাচন বাদে প্রতিটি নির্বাচনে জয় পেয়েছে আওয়ামী লীগ। কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির অনুপস্থিতিতে এ আসনে এবার বিএনপি ও জামায়াতের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। জয় পেতে দুই দলই আওয়ামী লীগের ভোটের আশা করছে। বিশেষ করে এ আসনে সংখ্যালঘু ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৭১ হাজার। তাঁরা আওয়ামী লীগের ‘ভোটব্যাংক’ বলে প্রচার আছে। তাঁদের ভোটেই নির্ধারিত হবে প্রার্থীর জয়-পরাজয়।
চার লাখ ৫৩ হাজার ৬৩৪ ভোটারের আসনটিতে এবারের নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন আটজন। তবে ভোটের মাঠে আলোচনা বিএনপির প্রার্থী মতিয়ার রহমান ফারাজী ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. গোলাম রছুলকে ঘিরে।
প্রচারণায় মুখর এ আসনের গুরুত্বপূর্ণ স্থান, হাটবাজার ও মোড়ে মোড়ে টানানো হয়েছে প্রার্থীদের ব্যানার। চলছে মাইকিং। পথসভা ও এলাকায় এলাকায় গিয়ে প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকেরা ভোট চাইছেন। সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও ভোটের তুমুল আলোচনা। চলছে নানা বিশ্লেষণ। কোন প্রার্থীর অবস্থান কোথায় কেমন, আওয়ামী লীগের ভোট, হিন্দুদের ভোট কোন প্রার্থী পাবেন—এসব নিয়ে আলোচনা সর্বত্র।
সন্ধ্যায় অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া বাজারে কথা হয় একজন হিন্দু ব্যবসায়ীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা ভোট দিতে গেলেও দোষ হবে, আবার না গেলেও দোষ হবে। এ জন্য ভোট দিতে যাব। কিন্তু যে দল হারবে, সেই দল ভোটের পরে এসে “তোরা আমাদের ভোট দিসনি ক্যান” বলে হামলা করবে কি না, এই ভয়ে আছি।’
অভয়নগরের শ্রীধরপুর ইউনিয়নের শংকরপাশা গ্রামের চৌরাস্তার মোড়ের একটি চায়ের দোকানে রোববার রাতে চা পান করতে করতে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করছিলেন ছয় ব্যক্তি। একজন বললেন, ‘৫ আগস্টের পর বিএনপি যা করেছে, তাতে স্থানীয় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ আছে। ভোটে এর প্রভাব পড়বে।’ পাশে একজন বললেন, ‘বিএনপি যা করেছে তাতে ক্ষোভ থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু ভোটের জন্য অন্য যাঁরা এখন ভালো ভালো কথা বলছেন, তাঁরা আসলে আগে কতটা ভালো কাজ করেছেন? ভোট দেওয়ার সময় সবকিছু মাথায় রেখে ভোট দিতে হবে।’
যশোর-৪ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সম্পাদক টি এস আইয়ূব। তবে ঋণখেলাপি হওয়ায় তাঁর মনোনয়ন বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন। পরে এ আসনে অভয়নগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মতিয়ার রহমান ফারাজীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এ কারণে দলের একাংশের নেতা-কর্মীরা এখনো ঠিকমতো প্রচারে নামেননি।
প্রচারে ভালো সাড়া পাওয়ার কথা জানিয়ে বিএনপির প্রার্থী মতিয়ার রহমান ফারাজী প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভোটারদের অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছি। এই আসনে ৭১ হাজারেরও বেশি হিন্দু ভোটার আছে। স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হিসেবে তাদের বেশির ভাগ আমাকে ভোট দেবেন। ইনশা আল্লাহ আমি জয়লাভ করব।’
জামায়াতের প্রার্থী মো. গোলাম রছুল প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রচারণায় পথে পথে মানুষের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। সব জায়গায় সব শ্রেণির মানুষ বলছেন, তাঁরা এবার দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেবেন। ইনশা আল্লাহ দাঁড়িপাল্লা জিতবে।’